নারী গৃহকর্মী নিয়োগ বন্ধের ‘হুমকি’ সৌদি আরবের

0
214
ফাইল ছবি।

শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতি মাসেই সৌদি আরব থেকে ফেরত আসছেন বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরা। তাঁদের করা নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে আসছে। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে দেশটি। এমন প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার বাংলাদেশকে এসব অভিযোগ সুষ্ঠুভাবে সমাধান করতে বলেছে। তা না হলে নারী গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ একতরফাভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে বলে বাংলাদেশকে বলে দিয়েছে।

সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে ফিরে নারী কর্মীরা যেসব অভিযোগ করেন, সেগুলো যেমন সত্য, তেমনি নারী কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থাপনায় ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত সময়ের নোটিশে তলব করে সৌদি আরবের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, নারী কর্মীদের সৌদি আরবে পাঠানোর আগে আরবি ভাষা শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে না বাংলাদেশ। আবার দেশে ফিরে নানা অভিযোগ করছেন। অথচ ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশের নারী কর্মীরা এ রকম অভিযোগ করেন না। তাঁরা সৌদি আরবের পরিবেশ ও কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি বার্তাতেও এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

নারী কর্মী নিয়োগের জন্য ২০১৫ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে। এরপর থেকে গত জুলাই পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ নারী কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। দুই বছরের চুক্তিতে যাওয়া নারী গৃহকর্মীরা মাসে বেতন পান সৌদি মুদ্রায় ৮০০ রিয়াল (প্রায় ১৭ হাজার টাকা)। গৃহকর্মীরা বিনা খরচে সৌদি আরবে যেতে পারেন। অবশ্য নিয়মিত বেতন না পাওয়া, নির্যাতনের শিকার হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে গত সাড়ে আট মাসে দেশে ফিরেছেন ৮৫০ নারী। এর আগের বছর ফিরেছেন ১ হাজার ৩৫৩ জন নারী।

সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ গতকাল সোমবার বিকেলে মুঠোফোনে বলেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী কর্মী এ দেশে আসছেন, তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। এখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। এ কারণে সমস্যার তৈরি হচ্ছে। সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে আরও নারী কর্মী নিতে চায়। কিন্তু যে সমস্যাগুলো আছে, তা দূর করার ওপর দেশটি জোর দিচ্ছে।

রিয়াদের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টে সৌদি শ্রম ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মাজেদ আল রাশাউদি বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের নারী কর্মীরা সৌদি আরবের নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনছেন না। সৌদি আরবে এসেই ওই সব দেশের নারী কর্মীরা দেশে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠেন না। তিনি বলেন, দুই দেশ শান্তি ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হলে একতরফাভাবে সংকট মোকাবিলার ‘সৌদি নীতি’ অনুসরণ করবে তাঁর দেশ।

সৌদি প্রতিমন্ত্রী মূলত বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মী নিয়োগ বন্ধের আভাস দিয়েছেন বলে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ চৌধুরী গতকাল বলেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ অন্তত ৪০ বছর ধরে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠাচ্ছে। ফলে নারী কর্মী নিয়োগের একটি প্রক্রিয়া এর মধ্যেই দাঁড় করিয়ে ফেলেছে তারা। বাংলাদেশ মাত্র শুরু করেছে। প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু ব্যবস্থা নিলেও তা যথেষ্ট নয়। তাঁর দাবি, ‘সামান্য সমস্যা হলেই আমাদের কর্মীরা দেশে ফিরে আসেন। এ ধরনের সমস্যা দূর করার জন্য কর্মীদের পাঠানোর আগেই তাঁদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে আমাদের কর্মীদের গুণগত মানের দিকে তাকাতে হবে।’

কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ বারবার বাংলাদেশকে বলেছে, নারী কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় ঢাকায় বেশ কিছু সমস্যা আছে। যেগুলো দূর করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। বিশেষ করে সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়ার আগে সেখানকার পরিবেশ–পরিস্থিতি কেমন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে কাজ চালানোর মতো আরবি ভাষা, সৌদি আরবের সাংস্কৃতিক আচার এবং বিদেশে কাজ করতে গেলে অপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁদের প্রশিক্ষিত করা।

সার্বিক বিষয়ে অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তাসনীম সিদ্দিকী গতকাল  বলেন, নারীদের সৌদি আরবে পাঠানো হলেও কাজ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা দেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের বলা হচ্ছে না সৌদি আরবে গিয়ে কী ধরনের পরিস্থিতিতে তাঁরা পড়তে পারেন। এ কাজটা সরকারের পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে করতে হবে। যে সমস্যাগুলো আছে, তা দ্রুত দূর করতে হবে। তা না হলে শুধু নারী কর্মীই নন, সৌদি আরবের পুরো শ্রমবাজার ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে