স্প্যানিশ ফ্লু থেকে করোনার শিক্ষা

0
106
স্প্যানিশ ফ্লু

বিশ্বজুড়ে এখন চলছে করোনাভাইরাস মহামারি। লকডাউনে থাকা মানুষের দিন কাটছে উদ্বেগে। এমন এক মহামারি হয়েছিল ১৯১৮ সালেও। স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। করোনাভাইরাস ও ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির মধ্যে খুব বেশি সামঞ্জস্য খোঁজা বিপজ্জনক। তবু করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা সেই মহামারির সঙ্গে তুলনা টেনে আনছে। বার্তা সংস্থা এএফপি আজ শুক্রবার এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

মৃতের সংখ্যার হিসাবে আধুনিক যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি হচ্ছে ১৯১৮ সালে ধরা পড়া স্প্যানিশ ফ্লুর প্রাদুর্ভাব। প্রথম মহাযুদ্ধে যেখানে পাঁচ বছরে ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, সেখানে স্প্যানিশ ফ্লুতে মাত্র দুই বছরে মারা যায় ২ কোটি মানুষ।

স্প্যানিশ ফ্লুর কারণ ছিল এইচ১এন১ ভাইরাস। স্প্যানিশ ফ্লু যখন মহামারিতে রূপ নেয়, তখন বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম সেই সংবাদ প্রচারে বিধি-নিষেধ আরোপ করলেও স্পেনের মিডিয়া ফলাও করে এই ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের কথা প্রচার করে। তাই এই মহামারির নাম হয়ে যায় স্প্যানিশ ফ্লু, যদিও এর প্রভাব ছিল পুরো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাজুড়েই।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, কোভিড-১৯ পুরোপুরি নতুন একটি রোগ, যাতে বয়স্ক মানুষের সংক্রমণের হার বেশি। এটি ইনফ্লুয়েঞ্জার মারাত্মক স্ট্রেইন, যা ১৯১৮ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছিল। এতে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। তবে সংক্রমণের বিস্তার রোধে সরকার ও ব্যক্তিদের দ্বারা গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে মিল দেখতে পাওয়া যায়।

বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী স্প্যানিশ ফ্লুকে কোভিড-১৯ সম্পর্কে পর্যালোচনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য বিভাগ করোনাভাইরাস সম্পর্কে প্রাথমিক প্রতিরোধ পরিকল্পনা আঁকতে স্প্যানিশ ফ্লু প্রাদুর্ভাব নিয়ে গবেষণা করে। এতে দেখা যায়, ১৯১৮ সালের শরৎকালে এই রোগের দ্বিতীয় তরঙ্গ প্রথমটির চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক বলে প্রমাণিত হয়।

রয়্যাল সোসাইটি অব মেডিসিনের স্যার আর্থার নিউশোলমের ১৯৯১-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোগটি জনাকীর্ণ পরিবহন, কারখানা, বাস ও ট্রেন থেকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

১৯১৮ সালের জুলাইয়ে আর্থার জনসমক্ষে ব্যবহারের একটি স্মারকলিপি লিখেছিলেন, যাতে লোকজনকে অসুস্থ হলে ঘরে বসে থাকতে এবং বড় বড় সমাবেশ এড়াতে পরামর্শ ছিল। সরকার তা চেপে রেখেছিল।

স্যার আর্থার যুক্তি দিয়েছিলেন যে এসব বিধি মেনে চললে অনেকের জীবন বাঁচানো যেত, তবে তিনি আরও যোগ করেছেন জাতীয় পরিস্থিতি এমন ছিল, যেখানে স্বাস্থ্য ও জীবনের ঝুঁকি জড়িত থাকা সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়।

১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য কোনো চিকিৎসা এবং নিউমোনিয়ার মতো জটিলতার চিকিৎসার জন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ছিল না। হাসপাতালগুলো বেশ হকচকিয়ে গিয়েছিল।

সংক্রমণের বিস্তার রোধে কেন্দ্রীয়ভাবে জারি করা কোনো লকডাউন ছিল না, যদিও বেশ কয়েকটি থিয়েটার, নৃত্য হল, সিনেমা ও গির্জা কয়েক মাস ধরে বন্ধ ছিল। কিন্তু যুদ্ধকালে কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও খুলে রাখা হয়েছিল পানশালা। ফুটবল লিগ ও এফএ কাপ বাতিল হলেও অন্য ম্যাচে দর্শক সীমিত করার বা বন্ধ করার কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা চালু ছিল। আকর্ষণীয় ফুটবল চালু ছিল, যেখানে হাজার হাজার দর্শক যেত।

কিছু শহর ও নগরের রাস্তায় জীবাণুনাশক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং কিছু লোক তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে জীবাণুরোধী মাস্ক পরত।

ওই সময়ে জনস্বাস্থ্যের বার্তাগুলো ছিল বিভ্রান্তিকর। এখনকার মতোই ভুয়া খবর, ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। স্বাস্থ্যকর জীবনধারা সম্পর্কে সাধারণ স্তরের অজ্ঞতা কাটাতে যা কোনো কাজে আসেনি।

১৯১৮ সালের মহামারি থেকে কোনো দেশ বাদ যায়নি। যদিও এর প্রভাবে জনসংখ্যা রক্ষায় সরকারের প্রচেষ্টার মাত্রা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। ভাইরাসটি মারার প্রচেষ্টা কিছু সময়ের জন্য অব্যাহত ছিল এবং জনগণ মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার সম্ভাব্য মারাত্মক প্রকৃতির তুলনায় আরও সচেতন ছিল।

গবেষকেরা বলছেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারিতে ভ্যাকসিন অথবা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ, কোনোটাই আমাদের হাতে এসে এখনো পৌঁছায়নি। পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর সময়েও বিশেষভাবে কাজে এসেছিল সামাজিক দূরত্ব, মাস্কের ব্যবহার এবং আংশিক লকডাউনের মতো সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত পৃথিবীতে চিকিৎসাব্যবস্থা তখন ছিল অনেকটাই পিছিয়ে। অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভ্যাকসিন ছিল না।

১০০ বছরের বেশি আগের এই মহামারি আবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতে। অতীতের মতো তাই সামাজিক দূরত্ব, মাস্কের ব্যবহার, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই ঠেকিয়ে রাখতে পারে এই ভাইরাসের সংক্রমণ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে