সেই ওসি ওবাইদুল হকের দুর্নীতিই, পাবনায় রীতি

0
406
পাবনায় গৃহবধূ গণধর্ষণ মামলার চার নম্বর আসামি শরিফুল ইসলাম মন্টুর সঙ্গে সদর থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি ওবাইদুল হক।

দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন- এটা পুলিশের ব্রত হলেও পাবনা সদর থানার প্রত্যাহারকৃত ওসি ওবাইদুল হকের বেলায় তা ছিল উল্টো। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন পাবনার ‘দুষ্টচক্রের রক্ষক’।

রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাবনার ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা করে নিতেন ওসি ওবাইদুল।

এ ছাড়াও সদর উপজেলার একটি বালুমহাল নিয়ন্ত্রক ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা, মহেন্দ্রপুর এলাকার মাদক ব্যবসায়ী সম্রাটসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা তুলতেন ওসি। রাজশাহীর উপশহরে ওসি ওবাইদুলের ছয়তলা প্রাসাদোপম অট্টালিকা রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ২৬ লাখ টাকা দিয়ে পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি প্রাইভেটকারও কিনেছেন ওসি। তিনি ৮৪ হাজার টাকা দামের হাতঘড়ি, ৪২ হাজার টাকা মূল্যের চশমার ফ্রেমও ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত স্মার্টনেসের দম্ভ করতে এসব নিয়ে প্রকাশ্যে বলে বেড়াতেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, সব সময় ওসি ওবাইদুল অন্যায়কারীর পক্ষ নিয়ে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি পাবনার সুজানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। পরে তার ‘দক্ষতা’র কারণে পাবনা সদর থানার ওসি করা হয় তাকে।

সূত্র জানায়, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তাদের মাধ্যমে অর্থবিত্তের পাহাড় গড়াই ছিল ওসি ওবাইদুল হকের নেশা। তার প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা একের পর এক অপরাধ করলেও বরাবরই তারা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। খুন, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা কিংবা যে অপরাধই হোক না কেন, সন্ত্রাসীদের মধ্যস্থতায় টাকার বিনিময়ে সব কিছুরই সমাধান দিতেন তিনি।

সম্প্রতি পাবনায় তিন সন্তানের জননী এক গৃহবধূর দায়ের করা গণধর্ষণের অভিযোগ থেকে শরিফুল ইসলাম ঘন্টু নামের এক আসামিকে বাঁচাতেই সদর থানা চত্বরে বিয়ের আয়োজন করেন ওসি ওবাইদুল হক। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘন্টু সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। সদর থানায় ওসি হিসেবে ওবাইদুল হক যোগদানের পর থেকেই এলাকায় দাপট বেড়ে যায় তার। সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সালিশ বাণিজ্য করলেও তাকে থামাতে পারেননি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও। ওসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি এলাকায় ওপেন সিক্রেট হওয়ায় নির্যাতিত হয়েও ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ দিতে সাহস করেনি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- ঘন্টুর মাধ্যমে ওসি ওবাইদুল হক নিয়মিত মাসোয়ারা নিতেন। তাদের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, দাপুনিয়া এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিংসহ জেলা পুলিশের যে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বও পড়ত তার কাঁধেই। বুধবার গণধর্ষণ মামলায় ঘন্টু গ্রেফতার হলে তার সঙ্গে ওসি ওবাইদুল হকের একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

জানা যায়, গত ২৯ আগস্ট রাতে অপহৃত হওয়ার পর টানা কয়েকদিন টেবুনিয়া সিড গোডাউন এলাকায় ঘন্টুর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে গণধর্ষণের শিকার হন এক নারী। পরে ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ওই নারী ঘন্টুসহ পাঁচজনকে আসামি করে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। বিষয়টি জানাজানি হলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে ওসি ওবাইদুল হককে ফোন করলে তিনি অভিযোগ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

পরে মামলা নথিভুক্ত না করে থানায় অভিযুক্ত এক ধর্ষক রাসেলের সঙ্গে ওই নারীকে জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় বৃহস্পতিবার ওসি ওবাইদুল হককে পুলিশ লাইন রিজার্ভ অফিসে প্রত্যাহার করা হয়।

দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর খান বলেন, ‘দল ক্ষমতায় আসার পর শরিফুল ইসলাম ঘন্টু ৪-৫ বছর আগে সৌদি আরব থেকে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। অল্প দিনের মধ্যেই নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেন। কেউ ঘন্টু বাহিনীর অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই তাকে ওসির মাধ্যমে মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করা হতো। অনেক বলেও তাকে সংশোধন করতে পারিনি আমরা।’

সরেজমিন ওই এলাকায় ঘুরে ঘন্টু বাহিনীর অপকর্মের সত্যতাও মিলেছে। তবে ভয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য না দিলেও ওসি ওবাইদুল হকের সঙ্গে ঘন্টুর বিশেষ সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করেন।

অভিযোগ রয়েছে শুধু ঘন্টুই নয়, সদর থানার বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামি ও মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য ছিল ওসি ওবাইদুল হকের। এসব সন্ত্রাসী নিয়মিত তাদের ফেসবুক পেজে ওসির সঙ্গে আন্তরিক মুহূর্তের ছবিও পোস্ট করতে। থানায় বিয়ের ঘটনায় ওসি বেকায়দায় পড়লে তারা ওসিকে নির্দোষ দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। অনেকে গণমাধ্যমকর্মীদের ফোন দিয়ে ভয়ভীতিও প্রদর্শন করে।

এসব অপকর্মের বিষয়ে তদন্ত চলছে জানিয়ে পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম পিপিএম বলেন, ‘ওসি ওবাইদুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান। প্রত্যাহার প্রথম ধাপ। এর পর আরও অনেক ধাপ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপাতত তাকে পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিসে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’ তদন্ত রিপোর্ট পেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে