রুমায় কেএনএফ-শারক্বিয়া ভয়, এখনও গ্রামছাড়া ২৭ পরিবার

0
35
রুমায় কেএনএফ-শারক্বিয়া ভয়

পাহাড়ের কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার অত্যাচার, ভয়, নানামুখী চাপে পাড়া (গ্রাম) ছেড়ে পালিয়েছে বম সম্প্রদায়ের ২৭টি পরিবার। বান্দরবানের রুমা উপজেলা রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের লুয়াংমুয়াল পাড়া ও পাইনুয়াম পাড়ার সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে গেছেন। গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে পাড়া ছেড়ে অন্য জায়গায় পালায় পাড়ার লোকজন। এছাড়া রুমা উপজেলার তিনঢলপিপাড়া, চাইক্ষ্যংপাড়া, চিলপিপাড়াসহ আরও কয়েকটি পাড়ার বেশ কিছু পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন। কেএনএফ ও জঙ্গিদের অত্যাচারসহ নানামুখী চাপে পড়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারেও আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে।

র‌্যাব জানায়, দেশে নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার সদস্যদের অর্থের বিনিময়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। তথাকথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে যারা ঘরছাড়া হয়েছে তারাই (জঙ্গি) বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির গহীন পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ নিলয় নামে একজনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর র‌্যাব অভিযানে নামে।

গত বছর ১২ সেপ্টেম্বর থেকে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে যৌথভাবে অভিযান শুরু করে র‌্যাব ও সেনাবাহিনী। অভিযানে ২০ সেপ্টেম্বর কেএনএফের তিনজন ও জঙ্গি সাতজনকে আটক করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় র‌্যাব। অভিযান অব্যাহত থাকাতে কোনঠাসা হয়ে পড়ে জঙ্গি ও কেএনএফ সদস্যরা।

র‌্যাব আরও জানায়, অভিযান অব্যাহত থাকার ফলে চলতি মাসের ১১ জানুয়ারি আরও পাঁচ জঙ্গিকে আটক করা হয়। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার গহীন এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। আটক সন্দেহভাজন জঙ্গিদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের হয়ে আসে। পাড়ার নিরীহ লোকজনদের ভয়ভীতি, অত্যাচার করে কেএনএফ ও জঙ্গিরা বিভিন্ন কাজ আদায় করত।

রুমা উপজেলা রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিরা বম বলেন, ‘নানামুখী চাপে পড়ে লুয়াংমুয়ালপাড়া, পাইনুয়ামপাড়া, তিনঢলপিপাড়া, চাইক্ষ্যংপাড়া, চিলুপিপাড়াসহ আরও কয়েকটির পাড়ার বেশ কিছু পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। চাপে পড়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারেও আশ্রয় নিয়েছেন অনেকে। ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছেন পাইনুয়ামপাড়ার কারবারি (পাড়াপ্রধান) ডলকিম বম। থানচিতে আত্মীয়ের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন লুয়াংমুয়ালপাড়া কারবারি।’

কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ আমিনুল ইসলাম ওরফে আল আমিনকে (২৩) দাফন করা হয়েছে রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। গ্রেপ্তার হওয়া দুই জঙ্গিসহ আরও তিনজন তাঁকে কম্বল পেঁচিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলে। এ তথ্যের ভিত্তিতে গত রোববার রুমা উপজেলা রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কবর থেকে আমিনুলের লাশ উত্তোলনে হেলিকপ্টারে করে একটি টিম সেখানে যায়। ওই টিমে রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মামুন শিবলী, রুমা থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই) ও দুই পুলিশ সদস্য, র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈনসহ র‌্যাবের সদস্যরা ছিলেন। তাঁরা কবর থেকে আমিনুলের লাশ উত্তোলন করতে ঘটনাস্থলে যান।

ঘটনাস্থল সরজমিনে দেখে রুমার ইউএনও মোহাম্মদ মামুন শিবলী বলেন, ‘লুয়াংমুয়ালপাড়ার উপর দিয়ে আমিনুলের কবর দেওয়া স্থানে যেতে হয়। পাড়ায় ১৩টি ঘর ছিল। ঘরগুলোতে কোনো লোকজন ছিল না। ফাঁকা পড়ে আছে ঘরগুলো।’

র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর বরাত দিয়ে ইউএনও মোহাম্মদ মামুন শিবলী বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে শুনেছি, পাড়ার আশপাশে জঙ্গি ও কেএনএফের গোপন আস্তানা ছিল। তাদের কারণে হয়তো কোনো কিছু ঘটনা হয়েছে পাড়াবাসীর সঙ্গে। পাড়াবাসী গত বছর শেষের দিকে চলে গেছে।’

ওই টিমের সঙ্গে থাকা সাংবাদিক বুদ্ধজ্যোতি চাকমা বলেন, ‘জনমানবশূন্য বাড়িগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। ১৩টি পরিবারের প্রত্যেক বাড়িতে ধানের গোলা ও অন্যান্য জিনিসপত্র রয়েছে। পাশের তামলাওপাড়ার বাসিন্দাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, পাড়া এলাকায় কেএনএফ ও জঙ্গিরা গোপন আস্তানা করার পর থেকে লুয়াংমুয়ালপাড়া ও পাশের পাইনুয়ামপাড়া বাসিন্দারা চরম উৎপাতের মধ্যে ছিলেন। খাদ্য সরবরাহ করা, ছাগল, মুরগি ও গয়াল দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। নানামুখী চাপে ও অত্যাচারে দুই পাড়ার ২৭টি পরিবারের সবাই গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে পাড়া ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যায়।’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘র‌্যাবের জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত আছে। পাহাড়ে অভিযান চলছে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। কোনো পাহাড়ি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। ঘরছাড়া আল আমিনের লাশ কবরে মেলেনি। ধারণা করা হচ্ছে পুঁতে রাখা জায়গা থেকে লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। জঙ্গিরা না পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের লোকজন তার লাশ সরিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.