‘বিচ্ছিন্ন’ ময়মনসিংহে আজ বিএনপির গণসমাবেশ

0
78
ময়মনসিংহ পলিটেকনিক মাঠে আজ বিএনপির গণসমাবেশ। শুক্রবার রাতেই সেখানে জড়ো হতে থাকে নেতাকর্মীরা

চট্টগ্রামে বড় জনসমাগম করে আলোচনায় আসার তিন দিন পর আজ শনিবার ময়মনসিংহে হবে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ। বড় সংঘাত না হলেও বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ হওয়ায় সড়কপথে ময়মনসিংহ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সার্কিট হাউস ময়দান না পেলেও নগরীর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউশন মাঠে সমাবেশের অনুমতি পেয়েছে বিএনপি।

গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত ময়মনসিংহ শান্তিপূর্ণ ছিল থাকলেও, আওয়ামী লীগও মাঠে থাকায় আজকের দিনটি শান্তিপূর্ণ থাকবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পাল্টাপাল্টি মহড়ায় উত্তেজনা রয়েছে। রাতে নগরীর বাতিরকল এলাকায় বিএনপি কর্মীরা জমায়েত হলে, সেখানে মোটরসাইকেলে মহড়া দেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং হাতাহাতি হয়। সংঘর্ষের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক ফারুক হোসেন। ককটেল বিস্ম্ফোরণের তথ্য নিশ্চিত করেনি পুলিশ।

আওয়ামী লীগের মহড়া ও পরিবহন বন্ধের বিষয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, সমাবেশে জনসমাগম ঠেকাতেই এগুলো করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি- এতে তাঁদের হাত নেই। পুলিশ বলছে, পরিবহন বন্ধের খবর জানা নেই। জেলা মোটর মালিক সমিতির মহাসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, নিরাপত্তার শঙ্কায় গণপরিবহন বন্ধ করা হয়েছে। শনিবার ময়মনসিংহে বাস, ট্রাক অটোরিকশা- কিছুই চলবে না।

তবে গতকালই বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ময়মনসিংহে এসেছে। রাতে মঞ্চ তৈরির সময় কয়েক হাজার নেতাকর্মী ছিল পলিটেকনিক মাঠে। বাস বন্ধ হওয়ায় ট্রেন ও নদীপথে অনেকে আসে।

পরিবহন বন্ধ হলেও গফরগাঁও ছাড়া অন্য কোথাও বিএনপি কর্মীদের সমাবেশে আসতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। গফরগাঁওয়ে শুক্রবার আওয়ামী লীগ মহড়া দিয়েছে। স্থানীয় এমপি ফাহমী গোলন্দাজ বাবেলের অনুসারীরা গ্রামে গ্রামে ‘পাহারা’ বসিয়েছে। বিএনপি কর্মীরা ভালুকা, শ্রীপুর গিয়ে জমায়েত হয়ে সেখান থেকে ময়মনসিংহে আসছে।

বাধা না দিলেও আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ সমাবেশ করে গতকাল ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করে। দুপুরে নতুনবাজারে বিএনপি কার্যালয়ের কাছে এবং রাতে সমাবেশস্থলের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও মহড়া দেয়।

খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, নির্বাচনকালীন সরকার, জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পুলিশের গুলিতে নেতাকর্মী হত্যা, হামলা এবং মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে আয়োজিত বিএনপির সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করবেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি নেতাদের দাবি- কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হবে।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে ময়মনসিংহে সমাবেশ করেছিল বিএনপি। তবে সেবার রাতের বেলায় কৃষ্ণচূড়া চত্বরের মতো ছোট স্থানে সমাবেশ হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, দলীয় কার্যালয়ে সামনে সমাবেশ করতে বলেছিল প্রশাসন। অবশেষে পলিটেকনিক মাঠে অনুমতি দিয়েছে। কর্দমাক্ত মাঠটি সংস্কার ও গণপরিবহন সচল রাখতে প্রশাসনকে অনুরোধ করেও লাভ হয়নি।

তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমরান সালেহ বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ শহরজুড়ে মহড়া দিয়ে উস্কানি দিচ্ছে। প্রশাসন লাঠি ও বাঁশ আনতে নিষেধ করেছে। কিন্তু বিএনপি কর্মীদের নিরাপত্তা কে দেবে?’ গতকাল রাতে দেখা গেছে, সমাবেশস্থলে লাঠি নিয়েই জমায়েত হয়েছে বিএনপি কর্মীরা।

সমাবেশস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নগরীর রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে আজ দিনভর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এহতেশামুল আলম বলেন, তাঁরা বিএনপির সমাবেশকে স্বাগত জানান। কিন্তু নৈরাজ্য হলে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।

দলটির জেলার সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল বলেন, শনিবার মিছিল, সভা করবে না আওয়ামী লীগ। তবে মোড়ে মোড়ে থাকবে নেতাকর্মীরা। নৈরাজ্য হলে প্রতিবাদ করবে।

মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক শাহিনুর রহমান জানিয়েছেন, বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দিতে দলীয় নির্দেশ নেই। নেতাকর্মীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিএনপি জনগণ ও পুলিশের ওপর হামলা করলে প্রতিহত করা হবে।

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেছেন, গফরগাঁও থেকে বিএনপি কর্মীদের আসতে দেওয়া হচ্ছে না।

দুপুরে প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, যানবাহন বন্ধ করে দিলেও হেঁটেই জনস্রোত আসবে।

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুললেও পুলিশের বিরুদ্ধে বাধার অভিযোগ করেনি বিএনপি। ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মো. মাছুম আহাম্মদ ভুঁঞা বলেন, কাউকে লাঠি-বাঁশ নিয়ে আসতে দেওয়া হবে না। নিরাপত্তায় শহরজুড়ে পুলিশ থাকবে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলা থেকে ময়মনসিংহ অভিমুখী বাস চলছে না। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, তাঁদের নেতাকর্মীর বাসস্ট্যান্ডের দিকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়েছে।

সরেজমিন শহরের পারলা আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড, বনুয়াপাড়া ও রাজুরবাজার বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা ও ময়মনসিংহগামী বাস না চলায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। তাঁরা বাড়তি ভাড়ায় সিএনজি অটোরিকশায় গন্তব্যে যাচ্ছেন। নেত্রকোনা পৌর এলাকার চকপাড়ার নজরুল ইসলাম গাজীপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তিনি জানান, বাস না পাওয়ায় কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। তিনি গরিব মানুষ। তাঁর এক দিনের উপার্জন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

অপর এক বাসযাত্রী মানিক মিয়া জানান, ময়মনসিংহে যেতে পারেননি বাস বন্ধ থাকায়।

বাস শ্রমিক সাইদুল ইসলাম ও কামাল হোসেন বলেন, বিএনপির সভা; তাই বাস বন্ধ। সভা শেষ হলে বাস চলবে। তবে এ বিষয়ে জেলা বাস মালিক সমিতির সম্পাদক আরিফ খানের মন্তব্য জানতে পারেনি সমকাল।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. আনোয়ারুল হকে বলেন, বিএনপি কর্মীদের আটকাতেই বাস বন্ধ করা হয়েছে।

তবে পুলিশ সুপার মো. ফয়েজ আহমেদের দাবি, যানবাহন চলাচলে বাধা নেই। বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্টে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।

শেরপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল দুপুর থেকে ঢাকা ও ময়মনসিংহ রুটে বাস বন্ধ করে দিয়েছে জেলা বাস-কোচ মালিক সমিতি। নালিতাবাড়ী, নকলা, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা থেকেও দূরপাল্লার বাস বন্ধ। সমিতি জানিয়েছে, নিরাপত্তার শঙ্কায় শনিবার দুপুর পর্যন্ত বাস বন্ধ থাকবে। বিএনপি নেতারা বলেছেন, তাঁদের সমাবেশে লোকসমাগম ঠেকাতে সরকারের নির্দেশে পরিবহন বন্ধ করা হয়েছে।

জেলা বিএনপি সভাপতি মাহমুদুল হক রুবেল জানিয়েছেন, শুক্রবার বাস ও ট্রাক মালিকরা ভাড়ার টাকা ফেরত দিয়েছেন।

মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্টু ঘোষ বলেন, ‘আপনারা জানেন- কেন বন্ধ।’ তাঁর দাবি, নিরাপত্তায় শঙ্কায় মালিকরা বাস চালাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

ত্রিশাল (ময়মনিসংহ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ময়মনসিংহে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ভালুকা-ত্রিশাল-ময়মনসিংহ রুটে চলা শালবন পরিবহনের ৭০টি বাস বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে সমিতি। ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন বলেছেন, বাস-ট্রাক কিছুই ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনে হেঁটে ময়মনসিংহ যাবে কর্মীরা।

ত্রিশাল উপজেলা আওয়ামী লীগ ও মোটর মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম জানান, বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা নেই। সমিতি গাড়ি বন্ধ করেনি। কোনো মালিক গাড়ি ভাড়া দিলে তা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিএনপির তৎপর না থাকলেও সরব আওয়ামী লীগ। গফরগাঁও পৌরসভা ও ১৫ ইউনিয়নেই গতকাল শোডাউন করে আওয়ামী লীগ। উপজেলার সাধারণ সম্পাদক ও বারোবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম বলেন, বিএনপি সন্ত্রাসী দল। তারা সমাবেশের নামে যেন নৈরাজ্য করতে না পারে, সে জন্য আওয়ামী লীগ মাঠে রয়েছে।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সেখানে পরিস্থিতি ভিন্ন। শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ ফরিদ বলেন, বিএনপি সমাবেশ করবে। তাতে আওয়ামী লীগ কেন বাধা দেবে? আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক দল।

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আক্তারুল আলম বলেন, দলের সবাই অংশ নেবে সমাবেশে।

বিএনপি কর্মীদের আটকাতে গাজীপুর পুলিশেরও বাধা নেই। শ্রীপুর থানার পরিদর্শক আজিজুর রহমান বলেন, এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা নেই।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.