বদলে যাওয়া বেদেপল্লি

0
206
বদলে যাওয়া বেদেপল্লির স্কুল শিক্ষার্থীরা

বেদেপল্লি বা বেদে সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গ এলেই চোখের সামনে ভাসে তাঁবু কিংবা নৌকায় মানুষের বসবাসের চিত্র। যেখান থেকে তারা পাড়ায়-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে সাপের খেলা দেখান। ঝাড়ফুঁক দিয়ে এবং তাবিজ-কবচ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেন। এ দৃশ্য দেখে যাঁরা অভ্যস্ত, তাঁরা ঢাকার সাভারের বেদেপল্লি এলে বিস্মিত হবেন। আধুনিক ইমারত, পাকা, আধা পাকা ও টিনশেড বাসায় বসবাস করেন বেদেরা। অবশ্য কিছু বেদে তাঁবুর নিচেও বসবাস করছেন। এটি অবশ্য একদিনে হয়নি।

সাভারের বংশী নদীর পারে পোড়াবাড়ী, আমলপুর ও কাঞ্চনপুর—এই তিনটি গ্রামে বেদে সম্প্রদায়ের বসবাস। শতাধিক বছরের পুরোনো এই পল্লিতে এখন ২ হাজার ২০০ পরিবারে প্রায় ১৬ হাজার বেদে বাস করে। ঘর আছে প্রায় ৯০০টি। সমাজের মূলধারার সঙ্গে তারা মিশে গেছে। এই মহল্লাতে অনেকে দোকানপাট বসিয়ে আয়ের পথ খুলেছেন। কেউবা আবার আশপাশের কারখানায় চাকরি নিয়েছেন। অনেক বেদে ছেড়ে দিয়েছেন সাপ খেলা, সাপ ধরা, তাবিজ-কবচ ও যন্ত্রর-মন্তরের ব্যবসা। কেউ কেউ অবশ্য পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে সাপের খেলা দেখান। তবে তাঁদের সংখ্যা অনেক কম।

এমন দোতলা ও টিন শেড বাসায় থাকেন বেদেরা।

গত শনিবার দুপুরে সেই বেদেপল্লিতে গিয়ে চোখে পড়ল, কোনো কোনো বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া মুদির দোকান বা চায়ের দোকান ঘিরে মানুষের আনাগোনা। একটি রেস্তোরাঁর পাশে ক্যারম খেলে সময় পার করছেন তরুণ-যুবকেরা। কথা হলো মিলন, রাসেল ও আল আমিন নামে তিন কিশোরের সঙ্গে। আল আমিন জুতার কারখানায় চাকরি করে। রাসেল ও মিলন বছরে ছয় মাস সাপের খেলা দেখায়। বাকি ছয় মাস অন্য কাজ করে। মুদি দোকানে মালপত্র সাজাচ্ছিলেন তিন সন্তানের জননী জলকি। বললেন, পাঁচ মাস আগে দোকান দিয়েছেন। তাঁর তিন সন্তানই স্কুলে লেখাপড়া করে। স্বামী-স্ত্রী মিলেই চালান দোকানটি। তবে স্বামী মাঝেমধ্যে সাপ খেলা দেখিয়ে বাড়তি আয় করেন। সংসার আগের চেয়ে ভালো চলে।

বেদে সম্প্রদায়ের আবাসস্থলের একাংশ।

এখানকার শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের শিক্ষামুখী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। মৌসুমি ও নদী দুই বান্ধবী। বেদেপল্লিতে তাদের বেড়ে ওঠা। দুজনে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। তারা জানাল, তাদের বাবা-চাচারা এখন আর আগের মতো সাপ ও তাবিজ-কবচ নিয়ে পড়ে নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁরা এখন বেশ ভালো আছে। মৌসুমি ও নদীর সঙ্গে ছিল আরেক বেদেকন্যা বৃষ্টি। ১৪ বছরের এই কিশোরী বলে, পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে বছর খানেক আগে সে জুতার কারখানায় চাকরি নিয়েছে। মাসে তার বেতন পাঁচ হাজার টাকা। তপু নামে এক বেদে তরুণ বললেন, ‘আমরা ছাপ খেলা দেকাই না বাই। দোকান আছে দোকান করি।’ বেদেপল্লির পাশে জমি কিনে বাবা-চাচারা বাড়ি করেছেন বলে বেশ গর্বের সঙ্গেই জানালেন তপু।

বেদেপল্লির তিন কিশোর।

বেদেদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল তাঁদের পুনর্বাসন, সমাজের মূলধারার কাজে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি (উপমহাপরিদর্শক) হাবিবুর রহমান। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টা, সহযোগিতা ও সার্বিক নজরদারির কারণে এখানকার বেদেদের ভাগ্যবদল হয়েছে মনে করেন তাঁরা।

কোনো কোনো বেদে তাঁবুর নিচে বসবাস করেন।

ডিআইজি হাবিবুর রহমান শোনালেন বেদেপল্লির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা। ২০১৪ সালে তিনি ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের দায়িত্বে ছিলেন। তখন জানতে পারলেন সাভারের অদূরে একটি এলাকায় মাদকের প্রকোপ আছে। সে সময় ওই বেদেপল্লিতে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর সময় পুলিশের কাছে বেদেরা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। বেদেরা জানান, সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষ বেদেদের সহায়তা করে না। তাঁরা শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে। ফলে মাদকের ব্যবসা ছাড়া তাঁদের আর কোনো কিছু করার উপায় নেই।

হাবিবুর রহমান বলছিলেন, ‘বেদেদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য সহায়তার চেষ্টা করলাম। এরপর থেকে তাঁদের পুনর্বাসন, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন কাজ করেছি।’

বিভিন্ন দোকান দিয়ে অর্থ উপার্জন করছেন বেদেরা।

পাঁচ বছর আগে বেদে পেশা বদল করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানো শুরু করেন মো. জুয়েল মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আগে সাপ খেলা করতাম, এখন অটো চালাই। পুলিশ কর্মকর্তা ডিআইজি হাবিবুর রহমান স্যার আমাদের এলাকায় এসে অনেক উন্নয়ন করেছেন, গুচ্ছগ্রাম ও স্কুল করছেন, অনেকের কাজের ব্যবস্থা করেছেন। কারও কারও ভাতার ব্যবস্থা করেছেন। এখন আমরা সৎভাবে অর্থ উপার্জন করে যাচ্ছি, যা সাপ খেলায় নেই।’

গন্তব্যে ছুটছে বেদে নারী ও শিশু।

বেদে সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও সহায়তার জন্য ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে পোড়াবাড়ী সমাজকল্যাণ সংঘ নামে একটি সংগঠন। এর সাধারণ সম্পাদক রমজান আহমেদ বলেন, সরকারি খাসজমিতে বেদেরা যাঁর যাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরবাড়ি তুলেছেন। ফলে তাঁদের বাসা বা ঘরভাড়া দিতে হয় না। তিনি বলেন, বেদে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বেদেপল্লির পাশে উত্তরণ পোশাক কারখানায় ১০৩ নারীকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য কারখানায় চাকরি করেন অনেক তরুণ-তরুণী ও পূর্ণবয়স্ক বেদে, যা আর্থিক সচ্ছলতা এনেছে।

বেদেপল্লির খাবার রেস্তোরাঁ।

অবশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ রয়েছে, বেদে সম্প্রদায়ের কেউ কেউ মাদক ব্যবসায় জড়িত। এসব ব্যক্তির রাতারাতি আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। কেউ বেদেপল্লির পাশে জমি কিনে বড় বাড়ি পর্যন্ত করেছেন। এ অভিযোগের বিষয়ে ডিআইজি হাবিব বলেন, ‘এখনো কেউ কেউ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরাতে আমরা তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।

’ডিআইজি হাবিবুর রহমান, ঢাকা রেঞ্জ

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে