পলাতক জঙ্গিদের হাতে ৫৫ থেকে ৬০ অস্ত্র

0
31
পলাতক জঙ্গি

নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকস্ফীয়ার সদস্যদের হাতে থাকা অস্ত্রের উৎস নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। সংগঠনটির সামরিক কমান্ডার মাসুকুর রহমান মাসুদ ওরফে রনবীর কাছ থেকে পাওয়া ইলেকট্রনিক ডিভাইসে পাহাড়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ভিডিও এবং আস্তানা থেকে উদ্ধার নথিপত্র থেকে অস্ত্র-গুলিসহ রসদের বিষয় পরিস্কারভাবে সামনে আসে। এখন পর্যন্ত যে তথ্যপ্রমাণ গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে, তা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে তিন দফায় এসব অস্ত্র কিনেছেন নতুন জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। তাঁরা নানা ধরনের ৫৫-৬০টি অস্ত্র কিনেছেন। এ ছাড়া তাঁরা একে-৪৭ রাইফেলের গুলিও সংগ্রহ করেছেন। কেএনএফের কাছে একাধিক একে-৪৭ রাইফেল রয়েছে। আরও অত্যাধুনিক অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ওপর একযুগের বেশি নজর রাখেন এমন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, কুকি-চিনের কাছে জঙ্গিরা অস্ত্র পেয়েছে। টাকার বিনিময়ে অস্ত্র হাতবদল হয়। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সরাসরি যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০১৯ সালে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) ও আনসার আল ইসলামের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকস্ফীয়া গঠন করেন। এরপর কেএনএফের সঙ্গে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে চুক্তি করেন তাঁরা। চুক্তি অনুযায়ী রুমার গহিন বনাঞ্চলে কেএনএফের ক্যাম্পে উগ্রপন্থিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সীমান্তের দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ভেতরে আছে কেএনএফ ট্রেনিং সেন্টার (কেটিএস)। প্রথম দফায় সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল ১২ তরুণ। এরপর দ্বিতীয় দফায় ৩১ জন ও তৃতীয় দফায় আরও ১২ জনকে পৃথক ট্রেনিং সেন্টারে রাখা হয়।

র‌্যাব বলছে, কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা নাথান বমের সঙ্গে ২০২১ সালে জামাতুল আনসারের আমিরের সমঝোতা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে কেএনএফের ছত্রছায়ায় জামাতুল আনসার সদস্যদের ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তাঁদের মধ্যে চুক্তিও হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি কেএনএফ সদস্যদের খাবার খরচ বহন করে জামাতুল আনসার।

জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, পাহাড়ে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছিল পুরোপুরি সামরিক কায়দায়। প্রশিক্ষণের সময় কেএনএফের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকার অস্ত্র কেনা হয়। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে- কাটা রাইফেল, শটগান, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বন্দুক ও বিপুল পরিমাণ গুলি। সব মিলিয়ে তাদের হেফাজতে ভারী অস্ত্র রয়েছে ১৫-১৬টি। আর দেশীয় অস্ত্র রয়েছে অন্তত ৪০টি। কেএনএফ কোন সূত্র থেকে অস্ত্র এনে টাকার বিনিময়ে জঙ্গিদের হাতে তুলে দিয়েছে, সে ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ গোয়েন্দারা পেয়েছেন।

পাহাড়ের আস্তানা থেকে পাওয়া নথিপত্র দেখে গোয়েন্দারা বলছেন, প্রশিক্ষণের সময় অস্ত্র চালানো ছাড়াও বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল শেখানো হতো। শারীরিকভাবে ফিট থাকতে অনেকে শিখতেন কারাতে। এ ছাড়া কেএনএফ জঙ্গি সদস্যদের অ্যাম্বুশে নিয়ে যেত। হাতে-কলমে কঠিন সময়ে কীভাবে শত্রুকে মোকাবিলা করতে হবে, এটা শেখানোর জন্য অ্যাম্বুশে নেওয়া হতো জঙ্গিদের। পাহাড়ে জঙ্গি আস্তানায় গিয়ে এখন পর্যন্ত দু’জন মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন কুমিল্লার আমিনুল ইসলাম ও নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর জোহায়ের বিন রহমান। জেএসএস সদস্যদের সঙ্গে কুকি-চিনদের গোলাগুলিতে মারা যান জোহায়ের। জানা গেছে, বম সম্প্রদায়ের কয়েকজনের দায়িত্ব ছিল জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার। উগ্রপন্থিদের প্রশিক্ষণকালে সেকেন্ড ইন কমান্ডার ছিলেন সিলেটের তরুণ শিব্বির আহমেদ।

আরেকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, প্রশিক্ষণ শেষে জঙ্গিদের ব্যবহূত অস্ত্র সমতলে পাঠানোর কথা ছিল। সমতলে আনার পর কার কার কাছে অস্ত্র থাকবে, তা ঠিকঠাক করা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এখনও প্রশিক্ষণে ব্যবহূত অস্ত্র সমতল পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, কেএনএফের সঙ্গে জঙ্গিদের অর্থ কেনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মোশাররফ হোসেন রাকিব। তিনি নতুন জঙ্গি সংগঠনের অর্থ শাখার প্রধান ও শূরা সদস্য। রাকিবের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়। দীর্ঘদিন তিনি কাতারে ছিলেন। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। এর পর অনলাইনে জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হওয়ার দাওয়াত পান। সোহান নামে একজন নেপথ্যে থেকে রাকিবকে নতুন জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

সোমবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হন নতুন জঙ্গি সংগঠনের সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান মাসুদ ওরফে রনবীর ও বোমা বিশেষজ্ঞ আবুল বাশার মৃধা। এর পর তাঁদের মোবাইল ফোন থেকে পাহাড়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ভিডিও জব্দ করা হয়। নতুন জঙ্গি সংগঠনটি নিষিদ্ধ করতে উদ্যোগ নিচ্ছে প্রশাসন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নথি যাওয়ার পরে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়া কয়েকজন তরুণের বিষয়ে খোঁজ করতে গিয়ে নতুন জঙ্গি সংগঠনের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় র‌্যাব। কর্মকর্তারা বলছেন, উগ্রবাদে সম্পৃক্ত হয়ে গত দুই বছরে বাড়িছাড়া ৫৫ তরুণের খোঁজ তাঁরা পেয়েছেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.