পণ্যমূল্য কমানোর উদ্যোগ নেই

0
36
পণ্য মূল্যস্ফীতি

আন্তর্জাতিক প্রায় সব পর্যবেক্ষণই বলছে, এ বছরও অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এ কারণে দেশে দেশে নেওয়া হচ্ছে নানা কৌশল। বাংলাদেশও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে। তবে কয়েক মাসের মধ্যে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার, যা জিনিসপত্রের দাম বাড়ার প্রবণতাকে আরও উস্কে দিচ্ছে। সরকার গত আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। আর ওই মাসেই গত এক যুগের মধ্যে সর্বাধিক মূল্যস্ফীতি হয়। এর পর এই জানুয়ারিতে বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়ছে গ্যাসের দাম। মুখে নিয়ন্ত্রণের কথা বললেও সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার ফলে থেকেই যাচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি।

মূল্যস্ফীতির চাপ বজায় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনেক দিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকায় তা আরও বাড়বে এমন শঙ্কা মানুষের মধ্যে তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রভাব তো রয়েছেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে এলেও স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।

জানুয়ারিতেই ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দর ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোর পর শিল্পে গ্যাসের দাম আড়াই গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এসেছে। অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা বলছেন, এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। জ্বালানির বাড়তি দাম পণ্যে স্থানান্তর হবে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত বাজারেই পড়বে। যদিও ব্যবসার খরচ বাড়বে এমন যুক্তিতে শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ঋণে সুদহারের সীমা ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অথচ ভোক্তা ঋণে সুদহার বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে।

আমন ও বোরোর ভালো ফলন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে আসার কারণে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে অন্তত ছয় মাস ধরে বলা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এখনও ডলার সংকটের কারণে নিত্যপণ্য আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বেড়ে যাওয়া ডলারের দর পণ্যমূল্য বাড়াচ্ছে। এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার হার বাড়ছে। এখন গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ শতাংশ। অথচ আমানতের গড় সুদহার ৪ শতাংশের একটু বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে গত ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কয়েক মাস ধরে এ হার ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম গত আগস্টে গড়ে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছায়, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বাধিক। আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, খাদ্যের তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখন বেশি। গত মাসে খাদ্য সূচকে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। অথচ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এর মানে পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ বেশিরভাগ খাদ্যবহির্ভূত সূচকে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে।

সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে অনেক দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির উদাহরণ দিচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কোনো কোনো বক্তব্যে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ যাদের অবস্থা বেশি খারাপ, তাদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে এমন দেশের উদাহরণও রয়েছে। ভারতে গত মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ভিয়েতনামে ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ছিল সাড়ে ৫ শতাংশ।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দর বাড়লে দেশে বাড়ানো হয়। অথচ কমলে সহজে সমন্বয় হয় না। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে বাইরে দর কমলে দেশেও কমাতে হবে। তিনি বলেন, এমনিতেই এখন উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি। এর মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুতের দর বাড়ার ফলে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। এতে মূল্যস্ম্ফীতি আরও বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, সবাই জানে- বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তবে ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই। মূল্যস্ফীতি বাড়বে ধরে নিয়েই সরকার এই অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা দুই দফা সংশোধন করে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে। জীবনযাত্রার খরচের ওপর গত শনিবার প্রকাশিত সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত বছর ঢাকায় নিত্যপণ্য ও সেবার দাম ১১ শতাংশ বেড়েছে। ক্যাব বলেছে, এরই মধ্যে জানুয়ারিতে বাসা ভাড়া বেড়েছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম বাড়বে। ফলে আগামী দিনে মূল্যস্ম্ফীতি আরও বাড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি যে কোনো সরকারের জন্য বিব্রতকর। কারণ মূল্যস্ম্ফীতি প্রায় সবার জীবনযাপনকে প্রভাবিত করে। কোনো সরকারই চাইবে না, দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি বজায় থাকুক। এটি ঠিক, জিডিপির অনুপাতে সরকারের আয় খুবই কম এবং এ মুহূর্তে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। ফলে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দরকার হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো- দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যাকে অতীতে কেন সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলো না; কেন সরকার জ্বালানির দাম ধীরে ধীরে সমন্বয় না করে একবারে অনেক বাড়াল। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম তো কমেছে। তাহলে দেশের বাজারে কেন কমানো হচ্ছে না। ফলে সরকার তার নীতি কতটুকু স্বাধীনভাবে বা কতটুকু দক্ষতার সঙ্গে নিতে পারছে কিংবা বিভিন্ন বিকল্প অনুসন্ধান করছে কিনা- তা পর্যালোচনার দরকার রয়েছে।

সেলিম রায়হান মনে করেন, বড় বড় নীতি সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার নিরিখে নেওয়া হচ্ছে না কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে নেওয়া হচ্ছে। যেমন- প্রায় সব দেশ মূল্যস্ম্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়াচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার ধরে রেখেছে। যদিও সম্প্রতি ভোক্তা ঋণে সুদহারের সীমা বাড়ানো হয়েছে। তবে ঋণের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ অংশের ক্ষেত্রে সীমা আরোপ রয়ে গেছে। বিনিময় হারেও এক প্রকার নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার কথা সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। তবে ইচ্ছা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দর কমছে। আবার দেশেও উৎপাদন বাড়ছে। দুইয়ে মিলে মূল্যস্ম্ফীতি এখন যে পর্যায়ে আছে, সেখানে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে করণীয় জানতে চাইলে সেলিম রায়হান বলেন, আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে বেড়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে তেমন কিছু করার থাকে না। তবে আমদানিনির্ভর নয় এমন পণ্যের দর যতটুকু বাড়ছে, তার যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখতে হবে। ব্যবসায়ীদের অনেকে নানাভাবে সুযোগ নেয়। এই জায়গায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। বাজারে প্রতিযোগিতা উৎসাহিত হচ্ছে কিনা, পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে কিনা- এসব জায়গায় জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমদানি করা পণ্যের দামও বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কিনা, কর ছাড় দিয়ে যতটুকু সুবিধা পাওয়ার কথা তা পাওয়া যাচ্ছে কিনা- এসব ক্ষেত্রেও তদারকি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম দামে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা চালু কিংবা প্রয়োজনে জোগান বাড়াতে হবে। তাঁর মতে, অর্থ পাচার বন্ধ করা গেলে কিংবা কমানো গেলে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানো বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকানো যাবে এবং পণ্য আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়জনিত খরচ কমবে।

জাকির হোসেন ও ওবায়দুল্লাহ রনি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.