ধানের দামে কচ্ছপগতি, চালে খরগোশের

0
167

ধানে কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিতে সরকার ছয় লাখ টন ধান কেনার কাজ শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে চাল রপ্তানির সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু এতে হাটে-বাজারে ধানের দাম খুব একটা বাড়েনি। কোথাও কোথাও বাড়লেও তা এগোচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। কিন্তু চালের দামের চিত্র তার উল্টো। দেশের বেশির ভাগ হাট ও মোকামে চালের দাম খরগোশের গতিতে এগোচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে তিন থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাঝারি ও সরু চালের দাম গত এক মাসে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

চালকল মালিক, সরেজমিন বাজার ঘুরে এবং টিসিবির বাজার দরের হিসাব থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব উৎস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ধানের দাম খুব একটা না বাড়লেও চালের দাম দ্রুত গতিতে বেড়েই চলেছে।

যে ঘটনাগুলো ঘটলে বাজারে চালের দাম বাড়ে তার কোনটি এখনো ঘটেনি। উল্টো চালের দাম কমার মতো ঘটনাই বেশি ঘটছে। গত বোরোতে যে ধান উঠেছিল তার বড় অংশ এখনো বিক্রি হয়নি। এখন আমন ওঠা শুরু করেছে। হাটে-বাজারে আমন ধান ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের নির্ধারণ করা সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে প্রতি কেজি ধানে কৃষক সাত থেকে ১০ টাকা কম পাচ্ছে।

চালের বাজারে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি গুদামে ধান-চালের মজুত কমে গেলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেন। ২০১৭ সালের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে রেকর্ড পরিমাণে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার এটি একটি বড় কারণ ছিল। দেশে এখন সেই পরিস্থিতিও নেই। সরকারি গুদামে ১১ লাখ ১২ হাজার টন চাল ও ৩ লাখ ৩৬ হাজার টন গম মজুত আছে। সরকারের নানা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ ও বিক্রিও চলছে। কিন্তু তারপরে চালের দাম বাড়ছে।

২০ শতাংশ প্রণোদনা পেয়েও রপ্তানিতে ব্যর্থ

সরকার গত জুন মাসে বেসরকারি উদ্যোগে চাল রপ্তানির অনুমোদন দেয়। রপ্তানি মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ প্রণোদনা সহায়তাও ঘোষণা করে। অর্থাৎ একজন ব্যবসায়ী ১০০ টাকার চাল রপ্তানি করলে ২০ টাকা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা হিসেবে সহায়তা পাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চাল রপ্তানি শুরু করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। গত দুই মাস ধরে আফ্রিকার বাজারে দুই লাখ টন চাল রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত ও থাইল্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমিয়ে দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে বিশ্বের চালের বাজারে সবচেয়ে প্রভাবশালী ওই দুটি দেশের চালের দাম এক থেকে দুই শতাংশ কমে গেছে।

এ ব্যাপারে দেশের অন্যতম বড় চাল ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারক বেলাল হোসেন বলেন, মনে হয় না বিদেশে চাল রপ্তানি করা যাবে। যেভাবে বিশ্ববাজারে চালের দাম কমছে তাতে আমাদের মতো হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা দেশের কাছ থেকে কেউ চাল কিনতে চাইবে না। সরকার যদি বেশি করে ধান-চাল কেনে তাহলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

অন্যদিকে সরকার গত ২০ নভেম্বর থেকে ছয় লাখ টন ধান কেনার কাজ শুরু করেছে। আজ রোববার পর্যন্ত ৫৮ হাজার টন ধান কেনা হয়েছে। আর চাল কেনা শুরু হবে পয়লা ডিসেম্বর থেকে। সরকার প্রতি মন ধান ১০৪০ টাকা দরে কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাজারে প্রতি মন মোটা স্বর্ণা ধান ৬৫০ থেকে ৭২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে দেশের প্রধান ধানের বাজার নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও দিনাজপুর থেকে জানা গেছে।

ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পোষানোর দাবি

ব্যবসায়ীরা চালের দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আগের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, গত এক বছর ধরে ধান-চালের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম ছিল। সরকার আমনের সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা দেওয়া ও সংগ্রহ শুরু করার বাজারে প্রথমে চালের দাম বেড়েছে। এর পরে ধানের দাম বাড়বে। এতে চালের দাম সামনে আরও কিছুটা বাড়তে পারে বলে দেশের তিনজন শীর্ষ চালকল মালিক জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রসিদ বলেন, গত এক বছর ধরে কৃষক ও চালকল মালিকেরা সবাই লোকসান গুনেছে। সরু চালে কেজিতে চার-পাঁচ টাকা বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের ক্ষতি কিছুটা পোষাতে শুরু করেছে। সামনের দিনে চালের দাম আরও বাড়বে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চালের দাম যদি না বাড়ে তাহলে ধানের দাম বাড়বে না। ফলে আমনে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে না। এর আগে বোরোতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল একই পরিস্থিতি আমনেও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৃষি বিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ বাংলাদেশের ধান-চালের উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত ৩ নভেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চলতি বছর তিন কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টন চাল উৎপাদিত হবে। যা এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ টন বেশি। আর গত অক্টোবর মাসে মাঝারি মানের চালের যা দর ছিল তা এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম।

অন্যদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবে, গত এক মাসে প্রতিকেজি চাল ৪৬ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা হয়ে গেছে। এক মাসের ব্যবধানে যার দাম বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। আর গত এক বছরের সঙ্গে তুলনা করলে দাম দুই শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএস এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নাজনীন আহমেদ  বলেন, আমন ধান কাটার এই সময়টাতে চালের দাম স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বাড়ে। এখন কী কারণে ও কীভাবে দাম বাড়ছে তা খুঁজতে গিয়ে আমরা যদি কাউকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা করি তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। চালের বাজারে বড় কৃষক থেকে শুরু করে চালকল মালিক ও পাইকারি এবং খুচরা ব্যবসায়ীসহ অনেকেই নিজেদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে চাল মজুত করে। চালের বাজারে শত্রু খোঁজার চেষ্টা না করে সরকারের উচিত গরিব মানুষের জন্য নিয়মিত স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রির ব্যবস্থা করা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.