দায় কে নেবে ?

0
496

এক ভয়ানক হত্যাকাণ্ডের সংবাদ আমার সমস্ত চেতনাকে যেন অসাড় করে দিয়েছে। দেশের অত্যন্ত, বোধহয় সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বিদ্যাপীঠ বুয়েটের কয়েকজন ছাত্র আবরার ফাহাদ বলে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। তাকে কয়েক ঘণ্টা ধরে এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে যে, শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। যারা এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের বেশ নেতৃস্থানীয় সদস্য।

তথ্য অনুযায়ী, আবরার তার ফেসবুকে কিছু মন্তব্য দেওয়াতে একজন নয়, দুইজন নয় এবং হঠাৎ করে রাগের মাথায় নয়, ছাত্রলীগের এগারোজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ূয়া যুবক ঠাণ্ডা মাথায় একজন সহপাঠীকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলল। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা যে আবরারকে নির্যাতন করা হচ্ছে, সেই খবরটি জানতেন না তেমন কথা বিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই। কারণ হত্যাকাণ্ডটি ঘটার কোনো এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে সাধারণ পুলিশ নয়, দাঙ্গা পুলিশকে তলব করা হয়েছিল। সেটা তাদের অজান্তে হয়েছে- এ কথা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।

আবরারকে মেরে ফেলার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সেই এগারোজনকে বহিস্কার করে তাদের দায় মিটিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রশ্নের মুখে ছাত্রলীগের নেতারা গৎবাঁধা বুলি আওড়িয়েছে যে, ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ কখনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। এক ফাঁকে এক নেতা এটাও বলার চেষ্টা করেছে যে, আবরারের বন্ধুরা আহত আবরারের সাহায্যের আকুতিতে সাড়া দেয়নি বলে তার মৃত্যু হয়েছে। এই ছেলেরা আমারই দেশের ছেলে তা ভাবতেই লজ্জা হচ্ছে। এমন সন্তান জন্ম দিয়েছি আমরা! দিনের পর দিন এদের অন্যায়, অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিজেদের স্বার্থে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে এই অমানুষগুলোকে আমরাই তৈরি করলাম! আবরার ফেসবুকে দেশের কিছু সম্পদের ব্যবহার সম্পর্কে তার মতামত লিখেছিল, যা ওই ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তদের মতের সঙ্গে মিল হয়নি। তাই তারা আবরারকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে। তাদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ব্যাপ্তি তো আমরা বিভিন্ন আন্দোলন থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটার মধ্যেও দেখেছি। মতের অমিল হলেই তাকে ‘পথে আনার’ স্ব-আরোপিত দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে এরা। এবং শুধু আবরার হত্যাকাণ্ড নয়, যেমনটা জানতে পারি- নানা সময়ে নানা সংবাদমাধ্যমে যে প্রায় প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সরকারি দলের ছেলেরা সাধারণ ছাত্রদের নিয়মিত নির্যাতন করে থাকে; হল কর্তৃপক্ষ সেটা জেনেও কোনো প্রতিকার করার চেষ্টা করে না। অত্যাচারের পরিধি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত পৌঁছলে কোনো ব্যবস্থা হয়তো নেওয়া হয়, কিন্তু দু-একটি ঘটনা ব্যতীত এসবের কোনো বিচার না হওয়াটাই নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অভিযুক্তদের বহিষ্কারেই তা সীমাবদ্ধ। ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হিসেবে তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি, যেমনটি ঘটল আবরার হত্যাকাণ্ডের বেলায়ও। আবরারের শোকাহত বাবাকেই মামলা করার দায়িত্ব নিতে হলো। এই যে নষ্ট রাজনীতির কারণে যুব সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এমন ভয়ানক এবং ঘৃণ্য অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ছে এবং ভয়ঙ্করভাবে এর বিস্তৃতি ঘটেই চলেছে, এর দায় কে নেবে? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ এমনকি অভিভাবকরা পর্যন্ত এ ব্যাপারে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছেন।

অভিযুক্তরা সরকারি দলের আশ্রয়ে একের পর এক জঘন্য অপরাধ ঘটিয়েই চলেছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডার ছিনতাই, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল করা হেন অপকর্ম নেই, যা করে তারা দলীয় পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে না। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন, যা চলমান আছে। আমরা সেই উদ্যোগকে আন্তরিক সমর্থন জানাই। কিন্তু অভিযানটিকে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে সার্বিক দুর্নীতি দমনে কতটা ফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। এখনও পর্যন্ত এসব অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত যাদের নাম, তারা সকলেই কিন্তু দাবি করেন তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক।

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধুর কোন আদর্শের পরিচয় রাখছে অপরাধীরা জাতির কাছে? সংশ্নিষ্ট নেতারা জবাব দিয়ে থাকেন- এরা অন্য দল বা রাজনীতির লোক, ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এ সমস্ত কুকীর্তি করছে। আবারও প্রশ্ন করি, অপরাধ করার জন্য ছাত্রলীগ নাম নিতে হয় কেন এদের? তার মানে ছাত্রলীগের সদস্যদের জন্য এসবের অনুমোদন আছে। এর উত্তর কে দেবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.