ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরজুড়ে ব্যতিক্রম ছিল চসিক

0
181

ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে গিয়ে ঢাকার দুই মেয়র বেকায়দায় পড়লেও বছরজুড়ে ব্যতিক্রম ছিল চট্টগ্রাম। এখানে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যেমন কম, তেমনি কম ছিল মৃতের সংখ্যাও। সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা লাখের ঘর ছাড়ালেও চট্টগ্রামে এ সংখ্যা ছিল মাত্র দেড় হাজার। সরকারি হিসাব বলছে, নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২৯ জনের। কিন্তু চট্টগ্রামে মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত মাত্র তিন। সারাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও চার কারণে চট্টগ্রামে বছরজুড়ে নিয়ন্ত্রণে ছিল ডেঙ্গু। মশা নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কার্যকর ওষুধের ব্যবহার, দ্রুত ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা, নালা-নর্দমা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর কারণে চট্টগ্রামে ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি ডেঙ্গু।

ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চসিক দুই কোটি টাকার ২৫ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড ও ১০ হাজার লিটার লার্ভিসাইড ওষুধ কিনেছেন। ১১০টি জার্মানির ফগার মেশিন ও ৩৫০টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিনও ব্যবহার করেছেন তারা। নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে ১৬১ জন শ্রমিককে দিয়ে নিয়মিত ছিটিয়েছেন ওষুধও। ছিটানো ওষুধের গুণগতমানও পরীক্ষা করেছেন তারা। মশা নিধনে এগুলো কার্যকর নিশ্চিত হওয়ার পর গ্রহণ করেছেন বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রামও। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিসও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সোচ্চার ছিল বছরজুড়ে। মহানগরের বাইরে ডেঙ্গু রোগী কমাতে কাজ করেছেন তারা। বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং করেছেন কার্যক্রম। জনসচেতনতা বাড়াতে চালিয়েছেন ব্যাপক প্রচারও। চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও নিয়েছে কার্যকরী উদ্যোগ। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলাদা একটি সেল গঠন করেছেন তারা। যাদের অবস্থা খারাপ ছিল তাদের বিশেষ এ সেলে এনে নিবিড়ভাবে চিকিৎসা দিয়েছেন তারা। সিটি করপোরেশনসহ নানা দিক থেকে সমন্বিত এমন উদ্যোগের ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সফলতা এসেছে চট্টগ্রামে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুরু থেকেই সতর্ক ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। প্রতিদিন ১৬১ কর্মী দিয়ে স্প্রে করানো হয়েছে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে। নালা-নর্দমা পরিস্কার রাখা হয়েছে। কার্যকর ওষুধ ছিটানো হয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। ডাবের খোসা কিংবা বদ্ধ ঝোপঝাড়ে যাতে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে না পারে সে জন্যও চালানো হয়েছে ব্যাপক প্রচার। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, জেনারেল হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রেও আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন সবাই। এ জন্য চট্টগ্রামে বছরজুড়ে নিয়ন্ত্রণে ছিল ডেঙ্গু রোগ।

ডেঙ্গুর সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের নবনিযুক্ত সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৮১১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮০৬ জন। এখন জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী আছেন মাত্র পাঁচজন। আমাদের হিসাবে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন মাত্র দু’জন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আমাদের আওতাভুক্ত নয়। চমেক হাসপাতালের তথ্য নেই আমাদের এই হিসাবে।

সিভিল সার্জনের এ হিসাবের সঙ্গে চমেক হাসপাতালের হিসাব সংযুক্ত করলেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি হবে না।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসিন উদ্দিন আহমেদ বলেন, চমেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের শতভাগই কার্যকর সেবা পেয়েছেন। আলাদা সেল করে আমরা ডেঙ্গু রোগীদের নিবিড়ভাবে সেবা দিয়েছি। এখন কোনো ডেঙ্গু রোগী নেই হাসপাতালে। তাই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সেই বিশেষ সেলও।

মশক নিধন কার্যক্রমে ঢাকার দুই মেয়রের গৃহীত উদ্যোগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন আদালত। মশা নিধনে অকার্যকর ওষুধ আমদানি ও সরবরাহে জড়িতদের দুর্নীতি তদন্ত করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অকার্যকর ওষুধ কেনার প্রক্রিয়ায় যুক্তদের বিরুদ্ধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কিংবা এর মেয়রের বিরুদ্ধে এমন কোনো নির্দেশনা দেননি আদালত। চসিকের ব্যবহূত ওষুধের বিরুদ্ধেও কোনো মন্তব্য করেননি হাইকোর্ট। ঢাকায় মশক নিধনে ব্যবহূত ওষুধ আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণায়ও অকার্যকর প্রমাণিত হয়। কিন্তু এডিস মশা নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন যে ওষুধ ব্যবহার করছে, তা শতভাগ কার্যকর ছিল। ভারত থেকে আমদানি করা ‘অ্যাডাল্টিসাইড’ ওষুধটি কার্যকর হওয়ার প্রয়োজনীয় ডাটা ও তথ্য উপাত্ত সংরক্ষণ করে রাখে চসিক। ওষুধের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে বলে জানান মেয়র আ জ ম নাছির।

ডেঙ্গু রোগ ছড়িয়ে পড়ায় দেশে এবার ভঙ্গ হয়েছে অতীতের সব রেকর্ড। এত বেশি সংখ্যক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী দেশে ছিল না অতীতে কখনও। এবার ডেঙ্গু রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও ছাড়িয়ে গেছে অতীতকে। তবে এ মৃত্যু সে হারে স্পর্শ করেনি চট্টগ্রামকে। বিভিন্ন হাসপাতালের হিসাবে বন্দর নগরীতে ডেঙ্গু রোগে মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত তিন। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এর বাইরে নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে একজন ও ন্যাশনাল হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে