টোকিও অলিম্পিকে জাপানি পরিবারে ভিনদেশিদের থাকার সুযোগ

0
290
হোম স্টে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া অতিথিরা।

বাড়িতে থাকা বা ‘হোম স্টে প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে টোকিও অলিম্পিকের সময় ভিনদেশিদের জাপানের বিভিন্ন পরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। টোকিওর উত্তরের লাগোয়া জেলা সাইতামার কর্তৃপক্ষ ব্যতিক্রমী অতিথিসেবা গ্রহণের এই সুযোগ ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকে অংশ নেওয়া ক্রীড়াবিদদের পরিবারের সদস্য, ক্রীড়া সংগঠক ও সাংবাদিকেরা এই সুযোগ নিতে পারবেন। কিছু শর্ত পূরণ করে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রের বিদেশি অতিথিদের জন্য জেলার বিভিন্ন শহরে জাপানি পরিবারের সঙ্গে তাঁদের বাসভবনে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এ জন্য অতিথিদের কোনো রকম মূল্য পরিশোধ করতে হবে না।

২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিক গেমস শুরু হতে বাকি আছে এক বছরের কম সময়। অলিম্পিকের প্রস্তুতিকে ঘিরে নানা আয়োজন পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। আয়োজকেরা আশা করছেন, সময়মতো সব প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাবে; যদিও কিছু কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তাঁদের এখনো কাটেনি। আয়োজকদের কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তায় ফেলে দেওয়া সেসব বিষয়ের একটি হচ্ছে অলিম্পিক চলাকালে আবহাওয়া পরিস্থিতি। অন্যটি হচ্ছে অলিম্পিক উপলক্ষে যে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন জাপানের রাজধানী প্রত্যাশা করা করছে, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা।

টোকিওতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হবে ২০২০ সালের ২৪ জুলাই এবং শেষ হবে ৯ আগস্ট। এরপর ২৫ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে প্রতিবন্ধীদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা প্যারালিম্পিকের আয়োজন। জাপানে ওই সময়টা, বিশেষ করে জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে শুরু করে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্রীষ্মের দাবদাহ চরমে ওঠে। ইংরেজিতে এই দিনগুলোকেই সম্ভবত বলা হয় ‘ডগ ডেজ’। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বিরাজমান থাকে এবং বাতাসের আর্দ্রতা সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ঘরের বাইরে বেরোলেই মানুষকে হাঁসফাঁস করতে হয়। সে রকম পরিস্থিতি মাঠের ক্রীড়াবিদদের জন্য কতটা কষ্টকর হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ফলে, গ্রীষ্মের দাবদাহ যেন ক্রীড়াবিদদের শারীরিক অবস্থার ওপর খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, সে জন্য ম্যারাথনের মতো দূরপাল্লার দৌড় শুরু হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ভোর ছয়টায়, সূর্য যখন তেমন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে না। এ ছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য পদক্ষেপও আয়োজকেরা বিবেচনা করে দেখছেন।

বাড়িতে অতিথিকে পরিবেশ-কাহিনি বর্ণনা করে শোনাচ্ছে (ডান দিক থেকে) ছেলে ইবুকি ও দুই মেয়ে মিনোরি ও কোনোমি।

ব্যতিক্রম অতিথিসেবা নেওয়ার সুযোগ
জাপানের রাজধানীতে হোটেলের ঘাটতি নেই বললেই চলে। তবে অলিম্পিক চলাকালে বিপুলসংখ্যক বাড়তি পর্যটক টোকিও ভ্রমণে এলে সে রকম অবস্থায় আবাসন-সমস্যা মারাত্মক হয়ে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হোটেলভাড়া বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার মুখে কম খরচে থাকার জায়গার খোঁজ করা অলিম্পিক পর্যটকদের জন্য বড় এক সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। সম্ভাব্য সেই সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য অলিম্পিকের আয়োজকদের পাশাপাশি টোকিওর মেট্রোপলিটন সরকারও বেশ কিছু পদক্ষেপ এখন বিবেচনা করে দেখছে, যার মধ্যে টোকিওবাসীর প্রতি নিজেদের বাড়ির বাড়তি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার আহ্বান জানানো এবং এয়ার বি অ্যান্ড বির মতো আবাসন হোটেলের অনুমতি দেওয়া অন্তর্ভুক্ত আছে।

টোকিও অলিম্পিকের জন্য যে ৪২টি ভেন্যু আয়োজক কমিটি ইতিমধ্যে ঠিক করে নিয়েছে, তার সব কটিই বৃহত্তর টোকিওতে অবস্থিত নয়। টোকিওর বাইরের তিন প্রতিবেশী জেলা কানাগাওয়া, চিবা ও সাইতামাতেও অলিম্পিকের কিছু কিছু খেলার আয়োজন বসবে। এ ছাড়া ফুটবল ও বেসবল-সফট বলের প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু খেলা টোকিওর অনেকটা উত্তরে অবস্থিত ফুকুশিমা ও মিয়াগি জেলাতেও অনুষ্ঠিত হবে। আর এ কারণেই সেসব জেলাও অলিম্পিক চলাকালে আবাসন-সমস্যা সমাধানে কিছু কিছু উদ্যোগ হাতে নিতে শুরু করেছে। সে রকম একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হচ্ছে টোকিওর উত্তরের লাগোয়া জেলা সাইতামার অলিম্পিক ‘হোম স্টে প্রোগ্রাম’। এই কর্মসূচির আওতায় সাইতামা জেলা কর্তৃপক্ষ অলিম্পিক উপলক্ষে জাপানে আসা সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রের বিদেশি অতিথিদের জন্য জেলার বিভিন্ন শহরে জাপানি পরিবারের সঙ্গে তাঁদের বাসভবনে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। আর এ জন্য অতিথিদের কোনো রকম মূল্য পরিশোধ করতে হবে না। তবে কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য কিছু শর্ত উদ্যোক্তারা ঠিক করে দিয়েছেন।

রেস্তোরাঁয় রাতের আহারের পর রেস্তোরাঁ-মালিক আত্মীয়দের সঙ্গে উয়েনো পরিবারের গৃহকর্ত্রী ও সন্তানেরা

যেসব শর্ত পালন করতে হবে
প্রথম শর্ত হচ্ছে এই আমন্ত্রণ কেবল তাঁদের বেলাতেই প্রযোজ্য, অলিম্পিকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সম্পর্ক যাঁদের আছে। অলিম্পিকে যোগদানকারী ক্রীড়াবিদেরা যেহেতু থাকবেন বর্তমানে নির্মাণাধীন অলিম্পিকপল্লিতে, এই কর্মসূচিতে তাই তাঁরা অন্তর্ভুক্ত থাকছেন না। এটা উন্মুক্ত থাকবে ক্রীড়াবিদদের পরিবারের সদস্য, দেশের অলিম্পিক কমিটি ও বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের জন্য। ২০২০ সালের ২০ জুলাই থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমার মধ্যে হোম স্টে প্রোগ্রামের সুযোগ গ্রহণ করা যাবে।

এর বাইরে অন্য শর্তগুলোর মধ্যে আছে, সুনির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করতে হবে। হোম স্টে প্রোগ্রাম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠন সাইতামা আন্তর্জাতিক সমিতির ইন্টারনেট ওয়েব পেজ থেকে ডাউনলোড করে করে নিতে হবে আবেদনপত্র। সেটা পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত রেখে প্রত্যাশিত আগমনের অন্তত চার সপ্তাহ আগে সমিতির ই-মেইল ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে হবে। এই লিংক থেকে আবেদনপত্র ও অন্যান্য তথ্যসংক্রান্ত প্রচারপত্র ডাউনলোড করে নেওয়া যাবে।

হোম স্টে প্রোগ্রামের আরেকটি শর্ত হচ্ছে কেবল নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য এই সেবার সুযোগ গ্রহণ করা যাবে। সাইতামা আন্তর্জাতিক সমিতি প্রাথমিকভাবে সেই সময়সীমা তিন দিন নির্ধারণ করে দিলেও চার দফায় স্বাগতিক পরিবার বদল করে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে আবেদনকারীদের পক্ষে সর্বমোট ১২ দিন এই সুযোগ গ্রহণ করা সম্ভব। স্বাগতিক পরিবার থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া ছাড়াও বিনা মূল্যে সকালের নাশতা এবং রাতের আহারের ব্যবস্থাও অতিথিদের জন্য করে দেবে। শুধু যাতায়াত এবং বাইরে সেরে নেওয়া মধ্যাহ্নভোজনের খরচ অতিথিদের নিজের বহন করতে হবে। ফলে, প্রায় সব রকম সেবাই সেখানে পাওয়া যাবে বিনা মূল্যে কিংবা সামান্য অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে।

সাইতামা জেলা কর্তৃপক্ষ জেলায় বসবাসকারী পরিবারের সদস্যদের জন্য এটাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচিত হওয়া ও সেই সঙ্গে বিদেশি ভাষা চর্চার চমৎকার সুযোগ হিসেবে দেখছে। জেলায় বসবাসরত বিভিন্ন পরিবারও এতে চমৎকার সাড়া দিচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬৭০টির বেশি পরিবার স্বাগতিক পরিবার হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

অতিথিদের সঙ্গে নৌকাভ্রমণে পরিবারের গৃহকর্তা ও সন্তানেরা।

 

অতিথিসেবার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু
হোম স্টে প্রোগ্রাম যেন নিখুঁতভাবে পরিচালিত হতে পারে, তা নিশ্চিত করে নিতে সাইতামা জেলা কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এই কর্মসূচি পরিচালনা করতে শুরু করেছে। সেই কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে দুই দফায় টোকিওতে বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাসের কূটনীতিক এবং বিদেশি সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে হোম স্টে উদ্যোগের বিভিন্ন দিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আমন্ত্রিত অতিথিরা জেলার বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থান পরিদর্শন করা ছাড়াও স্থানীয় কয়েকটি পরিবারের বাসভবনে থেকেছেন। আমন্ত্রিত সেই দলের অংশ হিসেবে একটি পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করে কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভের সুযোগ এই প্রতিবেদকের হয়েছে।

এই প্রতিবেদকের জন্য স্বাগতিক পরিবার ছিল জেলার এক ছোট শহরে বসবাসরত উয়েনো পরিবার। স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও পরিবারের তিন সন্তান অতিথির জন্য সব রকম ব্যবস্থা করে দেওয়া ছাড়াও ইংরেজিতে কথা বলার যথাসাধ্য চেষ্টা করে গেছেন। উয়েনো পরিবারের তিন সন্তান প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী। মা-বাবা তাদের বিদেশি ভাষা ছাড়াও সামাজিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় সম্পর্কে জেনে নিতে উৎসাহ দিয়ে আসছেন। তাই সন্তানেরা পরিবেশ সম্পর্কে খুবই সচেতন হয়ে উঠেছে। পাখি দেখতে পরিবারের সবাই মিলে ছুটির দিনগুলোয় বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে।

উয়েনো পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও দুই কন্যা নিজেদের আঁকা ছবির মধ্য দিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে প্লাস্টিক দূষণের কারণে অ্যালবাট্রস পাখির জীবনে দেখা দেওয়া সমস্যার কাহিনি অতিথির জন্য সহজ ইংরেজিতে বর্ণনা করে শুনিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা পরিবেশসচেতনতার পরিচয় ভালোভাবে দেখিয়ে দিতে পেরেছে। পরিবারের সদস্যরা রাতের আহারের জন্য অতিথিকে নিজেদের এক নিকট আত্মীয়ের চালানো রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়েছিলেন। সার্বিকভাবে হোম স্টের সেই আয়োজন ছিল খুবই তৃপ্তিদায়ক। ফলে অলিম্পিক চলাকালে আগত অতিথিরা যে এই সুযোগ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে জাপানিদের পারিবারিক জীবনের নানা দিক সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং জাপানে অবস্থান উপভোগ করতে সক্ষম হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সাইতামা জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে টোকিওর নগরকেন্দ্রে অল্প সময়ের মধ্যে কমিউটার ট্রেনে সহজে যাতায়াত করা যায় বলে জাপানের রাজধানীতে অলিম্পিকের আয়োজনে যোগ দেওয়া অতিথিদের জন্য কষ্টকর হবে না।

বাংলাদেশ থেকে অলিম্পিক ক্রীড়াবিদদের পরিবারের সদস্য ও যেসব সাংবাদিক ২০২০ অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক উপলক্ষে জাপানে আসার পরিকল্পনা করছেন, এই সুযোগের ব্যবহার তাঁরা সহজেই করতে পারেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে