জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির চোখে বাংলাদেশ

0
273
নির্যাতনের প্রতীকি ছবি
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটিতে (ক্যাট) বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় গত ৩০ ও ৩১ জুলাই। সেখানে গুম, আটক, হেফাজতে নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ তোলে কমিটি এবং এর জবাব দেয় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। এরপর ৯ আগস্ট নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও কিছু বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং সঙ্গে বিভিন্ন সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে কমিটি। সেই প্রতিবেদনের প্রথমাংশ ছাপা হলো আজ। বাকি অংশ প্রকাশিত হবে আগামীকাল।

বাংলাদেশের প্রাথমিক প্রতিবেদন নিয়ে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ, কমিটির ৬৭তম অধিবেশনে অনুমোদিত

সূচনা

বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করেছে। সনদের ১৯ আর্টিকেলের প্রথম প্যারাগ্রাফ অনুযায়ী, দেশটি ১৯৯৯ সালের ৪ নভেম্বরের মধ্যে তার প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করতে নীতিগতভাবে বাধ্য ছিল। ২০০০-১৮ সাল পর্যন্ত যেসব রাষ্ট্রপক্ষ তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়নি, সেসব রাষ্ট্রপক্ষের তালিকায় ছিল বাংলাদেশ; যা কমিটির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনটি রাষ্ট্রপক্ষ ও সাধারণ পরিষদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের ১০ ডিসেম্বর কমিটি এক চিঠিতে রাষ্ট্রপক্ষকে তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয় এবং প্রতিবেদন ছাড়াই কমিটি তার পর্যালোচনার কাজ এগিয়ে নিতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ বাংলাদেশ কমিটিকে জানায়, দেশটি তার প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করবে ও পাঠাবে। ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ কমিটির চেয়ারপারসন প্রাথমিক প্রতিবেদন বিবেচনা করার তারিখের বিষয়ে ইঙ্গিত দেন। দেশটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ৩০ ও ৩১ জুলাই গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। দেশটির প্রাথমিক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে ২৩ জুলাই ২০১৯ গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ তার প্রাথমিক প্রতিবেদন ২০ বছর পর জমা ও প্রতিবেদনটি বিবেচনা করার মাত্র এক সপ্তাহ আগে তা গৃহীত হওয়ায় কমিটি দুঃখ প্রকাশ করে। তবে দেশটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা এবং কমিটির সভায় বিভিন্ন জিজ্ঞাসার মৌখিক ও লিখিত জবাব দেওয়াকে স্বাগত জানায় কমিটি।

ইতিবাচক বিষয়সমূহ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক নিম্নলিখিত সনদ ও প্রটোকলগুলো রাষ্ট্রপক্ষের স্বাক্ষর এবং অনুমোদন করার বিষয়টিকে কমিটি স্বাগত জানায়:

ক. ১৯৯৮ সালে, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ;

খ. ১৯৯৮ সালে, গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ ও সাজাবিষয়ক সনদ;

গ. ১৯৯৮ সালে, বিবাহের ক্ষেত্রে অনুমতি, বিবাহের ন্যূনতম বয়স ও বিবাহ নিবন্ধনবিষয়ক ১৯৬২ সালের সনদ;

ঘ. ২০০০ সালে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ;

ঙ. ২০০০ সালে, নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য অবসান সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল;

চ. ২০০০ সালে, শিশুদের বিক্রির ওপর শিশুর অধিকার, শিশু পতিতাবৃত্তি ও শিশু পর্নোগ্রাফি বিষয়ক সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল;

ছ. ২০০০ সালে, সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের যুক্ত করা নিয়ে শিশু অধিকারবিষয়ক সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল;

জ. ২০০৭ সালে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদ;

ঝ. ২০০৮ সালে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল;

ঞ. ২০১০ সালে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতবিষয়ক রোম বিধি;

ট. ২০১১ সালে, সব অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ;

নিম্নলিখিত আইনগুলো অনুমোদন করা ছাড়াও সনদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রগুলোতে নিজস্ব আইন পর্যালোচনায় রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগকে স্বাগত জানায় কমিটি: 

ক. ২০০০ সালের নারী ও শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন;

খ. ২০০০ সালের লিগ্যাল এইড সার্ভিস অ্যাক্ট (আইনি সহায়তা সেবা আইন);

গ. ২০১০ সালের পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন;

ঘ. ২০১২ সালের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন;

ঙ. ২০১৩ সালের নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (প্রতিরোধ) আইন;

চ. ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন;

ছ. ২০১৩ সালের শিশুদের ওপর যেকোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতনে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণবিষয়ক শিশু আইনে সংশোধনী;

জ. ২০১৮ সালের যৌতুক নিরোধ আইন।

সনদ কার্যকর করতে রাষ্ট্রপক্ষের নীতিমালা, কর্মসূচি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে সংশোধনীর উদ্যোগ স্বাগত জানায় কমিটি; যার মধ্যে রয়েছে:

ক. ২০০৮ সালে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠন; নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের গ্রহণ করা বহুপক্ষীয় কর্মসূচি (মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম অন ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন/ এমএসপিভিএডব্লিউ); এবং ৫৯১৬ নম্বর রিট আবেদনে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সুরক্ষা পদক্ষেপসংবলিত নির্দেশনার উল্লেখ;

খ. ২০০৯ সালে, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন;

গ. ২০১০ সালে, ৫৬৮৪ নম্বর রিট আবেদনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক শাস্তি বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা;

ঘ. ২০১৬ সালে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার, আটক, রিমান্ড ও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ অনুসরণ বিষয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া ১৫টি নির্দেশনা; এবং গ্রেপ্তার, আটক, তদন্ত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি আচরণ বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা;

ঙ. প্রধান উদ্বেগের বিষয়সমূহ ও সুপারিশমালা

১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। পরের বছর ৪ নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করার কথা ছিল। প্রায় ২০ বছর পর সেই প্রতিবেদন বাংলাদেশ উপস্থাপন করেছে গত জুলাই মাসে। এরপর এই প্রতিবেদন ধরে এবং বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে আলোচনা হয়েছে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটিতে। অনেক বিষয়ে কমিটি সন্তুষ্ট হতে না পারলেও বাংলাদেশ যে শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে, সেটাকেই আপতত অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে একে স্বাগত জানানো হয়েছে।

নির্যাতনের ব্যাপক ব্যবহার ও অসদাচরণের অভিযোগ

নির্যাতন বা নিষ্ঠুরতা, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর শাস্তি বা আচরণ থেকে যে কাউকে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রপক্ষের সাংবিধানিক ধারা; এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ রাষ্ট্রপক্ষের অনুমোদন করাকে স্বাগত জানায় কমিটি। তবে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি বা ঘুষ আদায়ের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক ও নিয়মিত নির্যাতন এবং অসদাচরণের অভিযোগের যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে উদ্বিগ্ন কমিটি। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে এমন ১৭টি ঘটনার কথা জানা গেছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা করা হয়েছে। কমিটি এ নিয়েও উদ্বিগ্ন যে এসব মামলার বিষয়ে আরও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি এবং প্রতিনিধিদলও এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ আইনে দায়েরকৃত মামলাগুলোর একটিরও বিচার সম্পন্ন না হওয়ার খবরে উদ্বিগ্ন কমিটি। উপরন্তু, কমিটি এ খবর পেয়েছে, এ আইনের অধীন কিছু কিছু বাহিনীকে দায়মুক্তির সুরক্ষা দিতে বা আইনে নিষিদ্ধ আচরণের ব্যাপকতা সীমাবদ্ধ করতে আইনটি সংশোধন বা বাতিলের জন্য পুলিশ ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ জানিয়েছে। এ আইনে কোনো সংশোধনী আনা হবে না বলে প্রতিনিধিদল যে বিবৃতি দিয়েছে সেটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অপরাধমূলক কাজে সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি এবং পুলিশ সপ্তাহ ২০১৯-এ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য—কোনো নিরপরাধ মানুষকে যেন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার করা না হয়—এ সবই কমিটি সাধুবাদ জানায়। কমিটি ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ রকম দায়মুক্তির অনুরোধ করছে এবং তাদের কাজের ক্ষেত্রে নির্যাতন ও অসদাচরণের শামিল হয় এমন ঘটনাকে প্রয়োজনীয় ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা অব্যাহত রেখেছে। উপরন্তু, এ-ও গভীর উদ্বেগের বিষয়, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে না। রাষ্ট্রপক্ষকে কমিটি মনে করিয়ে দিতে চায়, সনদের আর্টিকেল ২-এর ধারা ২-এ বলা আছে, কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি যেমন যুদ্ধাবস্থা বা যুদ্ধের হুমকি, অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা বা অন্য যেকোনো জরুরি অবস্থাকে নির্যাতনের দোহাই হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না (আর্টিকেল ২, ৪, ১৫ ও ১৬)।

রাষ্ট্রপক্ষের যা করা উচিত (নির্যাতনবিরোধী সুপারিশ)

ক. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্যাতন ও অসদাচরণের বিষয়টিকে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিয়ে কোনো অবস্থাতেই বা কারও বিরুদ্ধে তা সহ্য করা হবে না বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।

খ. এটি সরকারকে প্রকাশ্যে নিশ্চিত করতে হবে, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের প্রয়োগ রাষ্ট্রের কোনো কর্মীর স্বার্থে সীমিত করার কোনো রকম ইচ্ছে তাদের নেই। এই আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে যারা তালিকাভুক্ত রয়েছে, তার বাইরেও রাষ্ট্রের অন্য যেকোনো কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিধানটি কার্যকর করতে ও নির্যাতনের জন্য তার ব্যক্তিগতভাবে অপরাধের দায় বহন নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

গ. সরকারের যে কর্মকর্তারা নির্যাতন ও অসদাচরণ করবেন, তাঁদের বিচারের আওতায় আনা এবং কৃত অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায় বা কমান্ড রেসপনসিবিলিটিও নিশ্চিত করতে হবে।

ঘ. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ফরেনসিক এবং বলপ্রয়োগহীন তদন্ত পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান ও এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সন্দেহভাজন অপরাধীর কাছ থেকে জোরপূর্বক অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায়ে নির্যাতন ও অসদাচরণ অগ্রহণযোগ্য —আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সদস্যকে এ ব্যাপারে অবগত করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

ঙ. নির্যাতন ও অসদাচরণের মাধ্যমে সন্দেহভাজন অপরাধীর কাছ থেকে আদায় করা স্বীকারোক্তি অপরাধের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে না, এটি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া।

চ. নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে পরিসংখ্যানগত তথ্য পদ্ধতিগত উপায়ে সংগ্রহ করতে হবে। এতে অভিযোগের সংখ্যা, তদন্ত, প্রসিকিউশন, বিচার এবং নির্যাতন ও অসদাচরণের ঘটনায় কতজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, নির্যাতন ও অসদাচরণের জন্য দায়ী কর্মকর্তার শাস্তি এবং প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ, বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের তথ্য ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

নির্যাতনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অপর্যাপ্ত তদন্ত

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অসদাচরণের অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যবস্থা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অর্থপূর্ণভাবে জবাবদিহি করতে পারছে না বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সে ব্যাপারে কমিটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ভুক্তভোগী বা পরিবারের সদস্যদের আনা নির্যাতন বা গুমের অভিযোগ পুলিশ কর্মকর্তারা প্রায়ই নথিভুক্ত করতে চান না বলে যে খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন। নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ দায়ের করতে চাইলে বা নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করলে, প্রায় ক্ষেত্রেই তাঁদের হয়রানি, হুমকি ও প্রতিশোধপরায়ণতার শিকার হতে হয় বলে যে খবর পাওয়া যায়, তা নিয়েও কমিটি উদ্বিগ্ন। রাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল বলেছে যে তারা ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের কথা বিবেচনা করছে এবং অংশীজনদের সঙ্গে এ আলোচনা করছে, কমিটি এই বিষয়টিকে সাধুবাদ জানায়। তবে উদ্বেগের সঙ্গে এটাও বলতে চায় যে এ বিষয়ে আইন কমিশনের একটি খসড়া প্রস্তাব অনেক বছর ধরেই বিবেচনাধীন রয়েছে, কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

কমিটি উদ্বেগের সঙ্গে বলতে চায় যে কর্মকর্তাদের নির্যাতনের ঘটনা বা নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে রাষ্ট্রে কোনো স্বাধীন কর্তৃপক্ষ নেই। কাজেই সেই সব কর্মকর্তাই এসব অভিযোগ তদন্ত করেন, যাঁরা অভিযুক্ত কর্মকর্তার দপ্তরে কর্মরত কিংবা একই শ্রেণির দপ্তরে কর্মরত। ফলে এতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কমিটি দুঃখের সঙ্গে বলতে চায়, ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকার বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে যে ৭৭টি নির্যাতনের অভিযোগ পেয়েছে, সেগুলোর তদন্তের ফলাফলের ব্যাপারে প্রতিনিধিদল কোনো তথ্য দেয়নি। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের ঘটনা, যে বিষয়টি কমিটি সরাসরি উত্থাপন করেছিল। কমিটি দুঃখের সঙ্গে বলতে চায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের চিকিৎসকেরা যখন বললেন যে শহিদুল আলম বড় কোনো আঘাত পাননি, তখন তাঁকে ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হয়, যদিও তিনি দাবি করেছিলেন যে ২০১৮ সালের ৫ আগস্ট গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকার সময় তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়েছে।

প্রতিনিধিদল জানিয়েছে যে ২০১৭ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সদস্যদের বেশ কয়েকজনকে ‘নানা অপরাধে’ অভ্যন্তরীণ নজরদারি কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা ভঙ্গের শাস্তি দিয়েছে। কমিটি এই বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে বলতে চায় যে এসব অভিযোগের সর্বোচ্চ সাজা চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া ও পদাবনতি, যা নির্যাতন ও অসদাচরণের মতো গুরুতর অপরাধের সাজা হিসেবে যথোপযুক্ত নয়।

২০১৩ সালের নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধ আইনে অভিযোগকারীকে বিচারিক তদন্তের জন্য সরাসরি আদালতে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা কমিটি সাধুবাদ জানায়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ আইনে বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করে না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদন্ত কর্মকর্তাকে তা করতে চাপ প্রয়োগ করেন না বলে যে খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন। কমিটি দুঃখের সঙ্গে বলতে চায় যে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ থাকলেও তা শেষ হয়নি (পারভেজের মামলা, বশির উদ্দিনের মামলা) কিংবা বছরের পর বছর ধরে বিচার ঝুলে আছে (ইমতিয়াজ হোসেনের মামলা), এমন যে কয়টি মামলার বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে প্রতিনিধিদল কোনো তথ্য দেয়নি। (আর্টিকেল ২, ৪, ১০, ১২, ১৩, ১৫ ও ১৬)।

সব ধরনের নির্যাতন ও অসদাচরণের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ, কার্যকর ফৌজদারি তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রপক্ষকে। এ ক্ষেত্রে কমিটি রাষ্ট্রপক্ষকে সুপারিশ করছে:

ক. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর পদস্থ কর্মকর্তাদের প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন থেকে কাজ করবে;

খ. দ্রুততার সঙ্গে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে;

গ. নিশ্চিত করতে হবে যে একটি তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষ নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে উল্লেখিত সময়সীমার মধ্যে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম শেষ করার বিষয়টি দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করবে;

ঘ. চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে এবং নির্যাতনের অভিযোগে নির্দেশিত ডাক্তারি পরীক্ষা নির্যাতন ও অন্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মানহানিকর আচরণ বা সাজার কার্যকর তদন্ত ও নথিবদ্ধকরণের নির্দেশিকা (ইস্তাম্বুল প্রটোকল) অনুসারে সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

অস্বীকৃত বা অঘোষিত আটক ও গুম

রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাধীনতা নির্বিচারে হরণ, পরে তাঁদের অনেককে হত্যার এবং তাঁদের অবস্থান বা ভাগ্যে কী ঘটেছে তা প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার যে অসংখ্য, সংগত খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ভুক্তভোগীকে হত্যা করা হোক বা তিনি পরবর্তী সময়ে ফিরে আসুন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এ ধরনের আচরণকে গুম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কমিটি এখানে উল্লেখ করছে যে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ‘বাংলাদেশে প্রায়ই গুমের ঘটনা ঘটে’ বলে যে অভিযোগ, তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একটি ক্ষেত্রে তারা স্বীকার করেছে যে নারায়ণগঞ্জে কয়েকজনকে গুমের ঘটনায় কর্মকর্তাদের ফৌজদারি বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, যে ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাকে ‘অপহরণ’ ও ‘হত্যার’ অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। কমিটি আরও উল্লেখ করছে যে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বলেছে, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুমের অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন, কেননা পরে দেখা গেছে তাঁরা ফিরে এসেছেন। যেমনটা ঘটেছে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর ক্ষেত্রে।

কমিটি উল্লেখ করছে যে হুম্মাম কাদের চৌধুরীসহ মীর আহমেদ বিন কাশেম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আল আজমির বিষয়গুলো ২০১৭ সালে জোরপূর্বক ও অনিচ্ছাকৃত গুমবিষয়ক জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ সামনে নিয়ে আসে। তাঁদের বাবাদের বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজা হওয়ার পর তাঁরা তাঁদের মুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালান। এরপর অজ্ঞাত কর্তৃপক্ষ তাঁদের আটক করে। ওয়ার্কিং গ্রুপ সে সময় উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও বলেছিল, বাংলাদেশে গুমের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। কমিটি দুঃখের সঙ্গে বলছে, এসব ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ দীর্ঘসময় ধরে আটক রেখেও স্বীকার করেনি বলে যে অভিযোগ, তা তদন্ত করা হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে রাষ্ট্র কোনো তথ্য দেয়নি। এমনকি হেফাজতে একরামুল হকের মৃত্যু ও পুলিশ হেফাজত থেকে শেখ মোখলেসুর রহমানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাসহ অন্য ঘটনাগুলোয় চলমান তদন্তের বিষয়েও রাষ্ট্র কোনো তথ্য দেয়নি (আর্টিকেল ২, ৪, ১২, ১৩, ১১ ও ১৬)।

কমিটি রাষ্ট্রপক্ষকে সুপারিশ করছে

ক. সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করতে হবে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে অস্বীকৃত বা অঘোষিত আটকের অনুশীলন বন্ধ করবে;

খ. সব স্বীকৃত আটকের তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে রাষ্ট্রের কোনো জায়গায় কাউকেই গোপনে বা নির্জন আটকাবস্থায় রাখা হবে না;

গ. কাউকে অস্বীকৃত আটকাবস্থায় রাখার ঘটনায়, এমনকি আটক করার পর ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে যেকোনো কর্মকর্তাকে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় বিচার ও সাজা নিশ্চিত করতে হবে;

ঘ. অস্বীকৃত আটক, গুম এবং হেফাজতে মৃত্যুর সব অভিযোগ দ্রুত ও বিস্তারিত তদন্তে এমন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে হবে, যা আটকের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে;

ঙ. রাষ্ট্রের কোনো জায়গায় স্বাধীনতা খর্বিত হলো কি না, তা নজরদারি করতে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আটককেন্দ্র, সেসব জায়গার যেকোনো ব্যক্তির সঙ্গে একান্তে কথা বলার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে হবে; এবং বেসরকারি সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা যেন সব আটককেন্দ্রে যাওয়ার অনুমতি পান, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে;

চ. অপশনাল প্রটোকল টু দ্য কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার অনুসমর্থনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে;

ছ. রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা বা তাঁদের সহযোগিতায় অস্বীকৃত আটকের মতো গুরুতর অপরাধের প্রকৃতি ‘অপহরণ’-এর মতো অপরাধগুলো না থাকায় ‘গুমকে’ সুস্পষ্ট অপরাধ হিসেবে ‘সকল ব্যক্তিকে গুম হওয়া থেকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ’ অনুসারে আইনে নিষিদ্ধ করতে হবে, এবং এই সনদ অনুসমর্থনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন

পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনী থেকে বদলিকৃত সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সদস্যদের বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, অস্বীকৃত আটক, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নির্ভরযোগ্য অভিযোগসংবলিত যে অসংখ্য খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ওপরে উল্লিখিত নারায়ণগঞ্জের ঘটনা ছাড়া এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে এই বাহিনীর সদস্যদের ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি না হওয়ার বিষয়েও কমিটি একইভাবে উদ্বিগ্ন। কমিটি উদ্বিগ্ন যে সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের ১৩ ধারায় বাহিনীর সদস্যদের ‘সরল বিশ্বাসে করা বা করতে চাওয়ার’ যে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা এই বাহিনীর সদস্যদের নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দিয়েছে। কমিটি দুঃখের সঙ্গে বলছে, সুইডিশ ন্যাশনাল রেডিওতে ২০১৭ সালে সম্প্রচারিত সাক্ষাৎকারে র‍্যাবের অজ্ঞাত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন যে এই বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত অপহরণ, নির্যাতন এবং উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে হত্যা ও কোনো প্রমাণ না রেখেই নিহত ব্যক্তির লাশ গায়েব কিংবা আত্মরক্ষার্থে হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে বলে সমর্থন আদায়ে অস্ত্র রাখে, সেই দাবির বিষয়ে রাষ্ট্র কোনো স্বাধীন তদন্ত করেনি। কমিটি দুঃখের সঙ্গে আরও বলেছে, র‍্যাবের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান ইউনিট কীভাবে গঠিত, বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিশ্চিত হওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে ব্যাপারে কমিটিকে কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। র‍্যাবে কাজ করা সদস্যদের প্রায়ই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো হয় বলে যে খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন (আর্টিকেল ২, ৪, ১২, ১৩ ও ১৬)।

কমিটি রাষ্ট্রকে সুপারিশ করেছে

ক. র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সদস্যদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নির্যাতন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, অস্বীকৃত আটক, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে এবং যাঁরা এই তদন্ত করবেন, তাঁদের হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের হাত থেকে কার্যকরভাবে রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে;

খ. সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধিত) আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা থেকে ‘সরল বিশ্বাস’ এর বিধান বাতিল করতে হবে;

গ. সেনাবাহিনী থেকে র‍্যাবে বদলির অনুশীলন বন্ধ করতে হবে, এই বাহিনীকে পুরোপুরি বেসামরিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার এবং অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতো র‍্যাবের সদস্যদেরও নির্যাতন, অসদাচরণ, গুম অথবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ফৌজদারি বিচারের ব্যবস্থা করার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে;

ঘ. জাতিসংঘের দিকনির্দেশনা অনুসারে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর প্রস্তাবিত সব সদস্যের স্বাধীন যথাযথ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম অথবা অন্য যেকোনো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তি বা ইউনিটকে যাতে এই মিশনের জন্য বাছাই না করা হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

রিমান্ড ও মৌলিক আইনি সুরক্ষা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ প্রায়ই আটক ব্যক্তিকে নির্যাতনের হাত থেকে মৌলিক আইনি সুরক্ষা দেয় না বলে যে খবর পাওয়া যায়, তাতে কমিটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কমিটি এই মৌলিক আইনি সুরক্ষাকে সনদের ২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নির্যাতন প্রতিরোধের বাধ্যবাধকতাগুলো পূরণে জরুরি বলে চিহ্নিত করেছে। খবরে অভিযোগ করা হয় যে অনেক ক্ষেত্রেই আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, তা জানানো হয় না তাঁকে; দ্রুত যোগ্য ও স্বাধীন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয় না কিংবা গ্রেপ্তারের পরপরই এবং জিজ্ঞাসাবাদ বা শুনানিসহ আটকাবস্থার কোনো পর্যায়েই আইনি সহযোগিতা দেওয়া হয় না; আটককেন্দ্রে নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটক ব্যক্তিকে বিনা মূল্যে ডাক্তারি পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়া হয় না, আটক ব্যক্তির পছন্দের চিকিৎসকের মাধ্যমে গোপনে পরীক্ষার অনুরোধ ও সুযোগ দেওয়া হয় না; গ্রেপ্তারের পরপরই গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে পরিবারের সদস্য কিংবা পছন্দ অনুযায়ী অন্য কাউকে জানানোর অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়।

আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে সব ঘটনাবলি আটককেন্দ্রসহ কেন্দ্রীয়ভাবে নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ব্যর্থ হয়েছেন এবং আইন অনুসারে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আটক ব্যক্তিকে বিচারকের সামনে হাজির করা হয় না বলে যেসব খবর পাওয়া যায়, সেগুলো নিয়েও কমিটি উদ্বিগ্ন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ প্রায়ই সন্দেহভাজন অপরাধীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার, যা রিমান্ড বলে পরিচিত, আবেদন করে এবং আইনজীবীর সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করার সুযোগ না রেখে বিচারিক হাকিম ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা অনুসারে নিয়মিত তা সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত অনুমোদন দেন বলে যেসব খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। খবর অনুসারে কমিটি উল্লেখ করেছে যে রাষ্ট্রে আটক হওয়া ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশেরও বেশি রিমান্ড হেফাজতে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ ও বিচারিক হাকিমদের ১৫টি নির্দেশনার মাধ্যমে যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, সেগুলোর অনুশীলন হচ্ছে না বলে যে খবর পাওয়া যায়, তা নিয়েও কমিটি উদ্বিগ্ন। উচ্চ আদালত যদিও তাঁর রুলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে ফৌজদারি দণ্ডবিধি-১৮৯৮, দণ্ডবিধি-১৮৬০ ও এভিডেন্স অ্যাক্ট-১৮৭২-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব পরিবর্তন করা হয়নি (আর্টিকেল ২, ৪, ১১, ১২, ১৩, ১৫ ও ১৬)।

রাষ্ট্রের উচিত

ক. ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলায় উচ্চ আদালতের রুল প্রতিফলিত করতে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা এবং এভিডেন্স অ্যাক্ট সংশোধন করা এবং তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে যেন হয়, তা নিশ্চিত করা;

খ. ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা, যা আপিল বিভাগ সমর্থন করেছেন, তা যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ ও বিচারিক হাকিমেরা দ্রুত ও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করেন, তা প্রশিক্ষণ ও বৃহত্তর নজরদারির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে;

গ. ওপরে উল্লিখিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি ও প্রাক্-বিচার বা রিমান্ডে থাকা ব্যক্তিরাসহ আটক সব ব্যক্তিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারকের সামনে হাজির করার বিষয়টি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করা উচিত; গ্রেপ্তারের পরপরই ও পরবর্তী সময়ে আইনি পরামর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে; এবং ব্যক্তির গ্রেপ্তার ও আটক হওয়ার সময় ও স্থান দ্রুত পরিবারের সদস্যদের জানানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে;

ঘ. আটক ব্যক্তির আইনি সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে কি না, তার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো কর্মকর্তা যদি এই সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হন, তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অন্য যথোপযুক্ত সাজা নিশ্চিত করতে হবে;

ঙ. প্রাক্-বিচার আটকের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে আইন অনুযায়ী যেন হয় এবং মৌলিক আইন ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক বিচারিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে;

চ. প্রাক্-বিচার আটকের বৈধতা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে এবং অপরাধের সাজার তুলনায় প্রাক্‌-বিচার আটকাবস্থার সময়সীমা বেশি হলে মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে;

ছ. প্রাক্-বিচার আটকের ঘটনা কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ইউনাইটেড নেশনস স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস ফর নন-কাস্টোডিয়াল মেজার্স (টোকিও রুলস) অনুসারে আটক না রেখে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার হার বাড়াতে হবে।

ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক, জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠী

সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা বা তাঁদের সহযোগিতায় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক, অন্য জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর লোকজন যৌন সহিংসতাসহ ভয়ভীতি, হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় বলে যে খবর পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তিন সাঁওতাল নিহত ও ৫০ জন আহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে, যে ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছে, সাঁওতালদের বাড়িঘর ও বিদ্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত ছিলেন না। যদিও টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ঘটনার ভিডিওতে এর বিপরীত দৃশ্যই দেখা গেছে। পিরোজপুরে সম্প্রতি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কয়েকজন সদস্যের বাড়িঘরে আগুন দেওয়াসহ সহিংসতা ও হয়রানির এবং হিন্দু অধিকারকর্মী ও আইনজীবী পলাশ কুমার রায়ের ঘটনা কমিটি উল্লেখ করেছে। প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করার অভিযোগে পলাশ কুমার রায়কে আটক করা হয় এবং পরে অভিযোগ পাওয়া যায় যে পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাঁর ওপর হামলা হয় এবং গায়ে আগুন দিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ইঙ্গিত করেছে যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কয়েকজন সেনাসদস্যের দুই কিশোরীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অধিকারকর্মী মাইকেল চাকমার গুম হওয়ার ঘটনাগুলোও উল্লেখ করেছে কমিটি। প্রতিনিধিদল বলেছে, মাইকেল চাকমার ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অন্যদের মাধ্যমে সমকামীদের সহিংসতার খবরেও কমিটি উদ্বিগ্ন। সমলিঙ্গ যৌন সম্পর্ককে ‘অপ্রাকৃতিক আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে রাষ্ট্র অপরাধ বলে গণ্য করার কারণেই এসব ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে (আর্টিকেল ২, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৬)।

রাষ্ট্রের উচিত

ক. ওপরে উল্লিখিত বিস্তারিতসহ ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, অন্য জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও অন্যান্য দুর্বল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনার স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা;

খ. ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’-এর বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আইন, যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ রদ করার বিষয় বিবেচনা করা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হয়রানি করতে এ ধরনের আইনের প্রায়ই অপব্যবহার এবং এসব গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর সহিংসতা আইনিভাবে বৈধ বলে ধরে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়;

গ. ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, অন্য জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও অন্যান্য অরক্ষিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; তাদের অভিযোগ দেওয়ার স্বাধীন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;

ঘ. সাঁওতাল সম্প্রদায় এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ও দুর্বল গোষ্ঠীর যারা শারীরিক সহিংসতা, ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাটের শিকার, তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনসহ প্রতিকারের ব্যবস্থা করা; এবং ‘অর্পিত’ সম্পত্তি প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া নিশ্চিত করতে ‘অর্পিত সম্পত্তির প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ (আইন নম্বর ১৬)’ বাস্তবায়ন করা;

ঙ. ‘অপ্রাকৃতিক আচরণকে’ অপরাধ গণ্য করা বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা রদ করতে হবে। রাষ্ট্র সমলিঙ্গ যৌন সম্পর্ককে এই ধারা অনুসারে নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করে থাকে;

চ. সমকামী সম্প্রদায়সহ ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, অন্য জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য দুর্বল সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর সহিংসতার সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে;

ছ. দুর্বল গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের ওপর সব ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত পুলিশের সদস্যসহ অন্য সাধারণ মানুষের বিচার ও সাজার ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

সিইএসসিআর ২০১৮ সালের পর্যবেক্ষণের উপসংহারে পৌঁছেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সম্ভবত যথেষ্ট বৃহত্তর এখতিয়ার (ম্যান্ডেট) না থাকার কিংবা সরকারি ব্যক্তি যেমন পুলিশ, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতন ও অসদাচরণের অভিযোগ সরাসরি তদন্তে এই কমিশনের বর্তমান এখতিয়ার (ম্যান্ডেট) পুরোপুরি কাজে লাগায়নি বলে কমিটি উদ্বিগ্ন। কমিশনের সদস্যদের বাছাই ও নিয়োগ–প্রক্রিয়া এবং ‘প্রিন্সিপালস রিলেটিং টু দ্য স্ট্যাটাস অব ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর দ্য প্রমোশন অ্যান্ড প্রোটেকশন অব হিউম্যান রাইটস’ (প্যারিস প্রিন্সিপালস) অনুসারে দায়িত্ব পালনে কমিশনের যথেষ্ট জনবল ও আর্থিক সংগতি না থাকার বিষয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন (আর্টিকেল ২, ১২, ১৩ ও ১৬)।

রাষ্ট্রের উচিত

ক. সেনাবাহিনী, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অসদাচরণের অভিযোগ সরাসরি তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা ও এখতিয়ার (ম্যান্ডেট) সম্প্রসারণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ সংশোধন করা; এবং এর বৃহত্তর পরিসরে অবারিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে;

খ. জাতীয় প্রতিরোধক ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে কমিশন যেন তার পুরো ক্ষমতার অনুশীলন করতে পারে এবং যেখানেই কেউ আটক হবে, সেখানেই যেন পৌঁছাতে পারে, তা নিশ্চিত করা;

গ. কমিশনকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদসংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অনুমোদন দিতে হবে, যাতে কমিশন তার ম্যান্ডেট নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে সম্পাদন করতে পারে;

ঘ. প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন ও নিয়োগদান প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে হবে;

ঙ. নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের তদন্ত কীভাবে করতে হয়, সেই বিষয়ে কমিশনের কর্মকর্তারা যেন সঠিক প্রশিক্ষণ পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

বিচারকেরা তাঁদের কাজসংশ্লিষ্ট বিষয়ে হুমকি ও চাপের মুখোমুখি হন—এ বিষয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে, প্রতিনিধিদলের দেওয়া ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়েও সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার করা অভিযোগের বিষয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন। অভিযোগ আছে, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীবিষয়ক মামলায় উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি হয়রানির শিকার হন, ফলে তাঁকে পদত্যাগে এবং দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়; এই বিষয়ে প্রতিনিধিদলের প্রধানের দেওয়া বিবৃতি, যাতে বলা হয়েছে, সিনহার পদত্যাগের সঙ্গে কমিটি ষোড়শ সংশোধনীবিষয়ক মামলার কোনো সম্পর্ক নেই, বরং দুর্নীতির অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে—সেটিও আমলে নেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে, কমিটি এখনো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তা ছাড়া, বিচার বিভাগের সদস্যদের ওপর থাকা দৈনন্দিন যে চাপ, যার কারণে বিচারিক কর্মকর্তাদের ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তারের ঘটনা গ্রহণ করতে হচ্ছে, কোনো তত্ত্বাবধান ছাড়াই হেফাজতে থাকার মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে, এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড, যেগুলো একজন ব্যক্তিকে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের মতো নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে মৌলিক আইনি নিরাপত্তা দেয়, সেগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে (আর্টিকেল ২)

রাষ্ট্রপক্ষকে অবশ্যই

ক. আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রভাব থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করতে হবে;

খ. উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাসহ অন্যান্য পক্ষ থেকে আসা হুমকি, হয়রানি এবং অনুচিত হস্তক্ষেপ থেকে বিচারিক কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে হবে;

গ. সব বিচারক ও আইনজীবী যাতে পর্যাপ্ত সম্মানী পান এবং অবসর বা কার্যালয়ের মেয়াদ শেষ না হওয়ার আগ পর্যন্ত মেয়াদ পূরণের নিশ্চয়তা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা, হয়রানি ও সহিংসতা

কিছু প্রতিবেদন পেয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশে সুশীল সমাজের যেসব কর্মী, আইনজীবী এবং সাংবাদিকেরা কর্তৃপক্ষ বা সরকারের আচরণের সমালোচনা করেন এবং নির্যাতন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও এ সম্পর্কিত অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়গুলো প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন, তাঁদের হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হতে হয়। একই সঙ্গে এসব সমালোচনা করার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে শাসকদলীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিশোধমূলক মামলা করে থাকে এবং অন্যায্য বিচারকাজের সমালোচনা করায় তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। কমিটি উদ্বিগ্ন যে, সুশীল সমাজের কিছু কর্মী, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়েছে, যখন কাজ সম্পর্কিত কারণে আনা অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের জারি করা কিছু আইন বিষয়ে কমিটি উদ্বিগ্ন, এর মধ্যে রয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, ২০১৮—যেগুলো এ ধরনের হয়রানি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মামলা নিয়ে কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যাকে তাঁর কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি, আদালত অবমাননা এবং এ সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগে কয়েক বছর ধরে রিমান্ডে আটক রাখা হয়েছিল এবং হতাশার বিষয় হলো, তাঁকে এসব অভিযোগে আটক রেখে নির্যাতন চালানোর অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে কি না, তা প্রতিনিধিদল উল্লেখ করেনি। কনভেনশন অনুযায়ী এমন তদন্ত করা প্রয়োজন।

[অনুবাদ করেছেন আবু হুরাইরাহ্‌, হারুন–অর–রশীদ, রাজিউল হাসান ও অর্ণব সান্যাল]

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে