গবেষক হতে গিয়ে হয়ে গেলেন ‘রিকশাগার্ল’

0
365
নভেরা আহমেদ।

তাঁর বয়স তখন সবে তিন বা চার মাস। মায়ের কোলে। মাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে—এ রকম একটা দৃশ্য। মায়ের চোখে অশ্রু। আর হঠাৎই কোলের মেয়েটা মাকে চুমু খেল। যেন নীরবে প্রতিশ্রুতি দিল—‘পৃথিবীর আর কেউ না থাকলেও আমি তোমার সঙ্গে আছি, মা।’ কাট। পারফেক্ট। এক টেকেই ‘ওকে’ হলো দৃশ্যটি। এই প্রথম ক্যামেরার সামনে অভিনয় করলেন নভেরা রহমান। সেটা দিয়ে শুরু।

বেড়া ওঠা অভিনয়ে

তাঁর একদম ছোটবেলার সকাল, দুপুর, বিকেল কেটেছে আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে মা মোমেনা চৌধুরীর হাত ধরে। তাই এবেলায় যখন অভিনয়শিল্পী হয়ে উঠলেন, জানতে চাইলাম, মায়ের প্রভাব আছে? কৌশলী জবাব এল নভেরার কাছ থেকে—‘হ্যাঁ এবং না। হ্যাঁ এ জন্য যে আমি বড় হয়েছি আরণ্যক নাট্যদলের সাজঘরে। মঞ্চের প্রতি আমার খুব গভীর একটা ভালোবাসা জন্মেছিল সেই বেড়ে ওঠার সময় থেকেই। যেটা আমি টের পেয়েছি দেশের বাইরে পড়তে যাওয়ার পর। আবার না বলব এ কারণে যে, আমার আর মায়ের অভিনয়ের ধরন কিন্তু ভিন্ন। একই চরিত্র আমরা দুজন দুইভাবে করব। তাই আমার অভিনয়ে তাঁর প্রভাবটা সেভাবে নেই।’

নভেরার যত কাজ

পাখিসব করে রব, একান্নবর্তী—এই নাটকগুলোতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছেন। নকুল কুমার বিশ্বাসের দুটো গানের ভিডিওতেও ছিলেন মায়ের সঙ্গে। সেই ভিডিওতে মা আর বাবা নাকি তাঁকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করেন! এখন নিজের সেই সব অভিনয় দেখে খুবই বিব্রত হন নভেরা। এরপর একটু পরিণত হয়ে অভিনয় করেছেন একাত্তরের ক্ষুদিরাম চলচ্চিত্রে। একটা হিন্দু বউ, যাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই একটা দৃশ্য দেখে এই চরিত্রকে আরেকটা দৃশ্য দেওয়া হয়েছিল। এসব ছাড়াও তাঁকে দেখা গেছে শঙ্খ দাসগুপ্ত পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সুন্দরচান–এ দৌলতদিয়ার যৌনকর্মীরূপে। দেখা গেছে ও এর গল্প–এ। কণ্ঠ দিয়েছেন বিজ্ঞাপনচিত্রে।

নভেরা আহমেদ।

তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য উড়াল দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। সেন্ট থমাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে কানাডার অ্যাথাবাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই একটা এনভায়রনমেন্টাল থিয়েটারে যোগ দেন। বনে–জঙ্গলে দর্শকদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে নাটক করেন শেক্​সপিয়ারের পেরিক্লিস। তারপর অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের পাশাপাশি থিয়েটার বিষয়ে পড়াশোনা করে ফিরে আসেন দেশে। জীবন নিয়ে ‘বেরসিক’ পরিকল্পনা করেছিলেন! প্রচুর পড়াশোনা করবেন আর হবেন গবেষক। চশমা চোখে লাগিয়ে, কাগজ–কলম, কম্পিউটার নিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে ‘পেপার’ লিখবেন।

কিন্তু জীবন তাঁকে বানাল প্রথমে রুবাইয়াত হোসেনের মেড ইন বাংলাদেশ–এর পোশাককর্মী ডালিয়া, তারপর রিকশাগার্ল–এর নাইমা। ও, এর আগে আবার চয়নিকা চৌধুরীর ঈদের উপহার নামে একটি নাটকও করেছেন তিনি। তারপর আড়ং ডেইরির বিজ্ঞাপন। যেদিন এসব নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলছেন নভেরা, সেদিন ছিল তাঁর জন্মদিন। পরদিনই উড়াল দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে, তারপর কানাডায় টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানেই ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত মেড ইন বাংলাদেশ ছবির। ৫ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর চলা এই উৎসবে অংশগ্রহণ করবে কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ড সিনেমা বিভাগে। মেড ইন বাংলাদেশ ছবিতে কাজ করে নাকি জীবন বদলে গেছে নভেরার। তাঁর ভাষায়, ‘চলচ্চিত্র নির্মাণ যে একটা সুষ্ঠু ও সূক্ষ্ম পরিকল্পনামাফিক গোয়েন্দা অপারেশনের মতো, তা বুঝিনি আগে। আমি এর আগে কখনো কোনো চরিত্রের এতটা গভীরে ঢুকতে পারিনি।’

‘রিকশাগার্ল’ হয়ে ওঠা

নভেরা জানালেন তাঁর ‘রিকশাগার্ল’ হয়ে ওঠার দিনের কথা, যখন তিনি নিকেতনের রাস্তায় রিকশা ভাড়া করে রিকশা চালানো শিখতেন। তারপর কয়েক সপ্তাহের মাথায় ভালো রিকশাচালক হয়ে উঠলেন। আর শুটিংয়ের দিনগুলো নাকি ছিল পিকনিকের মতো।

একটা চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনা, প্রযুক্তির দল যে এত শ্রম দিয়ে, সূক্ষ্ম আর নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে, রিকশাগার্ল ছবির সেটে তা দেখে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত হয়েছেন তিনি। বিশেষভাবে বললেন পরিচালক অমিতাভ রেজার সহকারী সুমনা টুম্পার কথা। বললেন, ‘টুম্পা আপুই পরিচালকের সেই চোখ, যিনি দর্শকের দৃষ্টিতে দেখেন। প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। লজিকটা বের করে আনেন। সেটে তাঁর মতো একজন থাকাতে সবার সব কাজ, শুটিংয়ের ক্লান্তিকর দিন অনেকটা সহজ হয়ে যায়।’

জানতে চাইলাম, ডালিয়া, নায়িমার পর নভেরা কোথায় যাবে? হেসে উত্তর দিলেন, ‘কে জানে, গবেষকও হয়ে যেতে পারি!’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে