নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যেই গত ২৯ ডিসেম্বর শুরু হয়েছিল নারী ফুটবল লিগ। সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সেই পুরোনো ছবিটা একচুলও বদলায়নি। বরং কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে গিয়ে মনে হতে পারে, দিন দিন অবস্থা বুঝি আরও খারাপ হচ্ছে!
গতকালের কথাই ধরা যাক। তিন ম্যাচের মধ্যে পুলিশ এফসি ও ফরাশগঞ্জ নিজ নিজ ম্যাচে জয় পেলেও সিরাজ স্মৃতি সংসদ ও আনসার একাডেমির লড়াই শেষ হয়েছে গোলশূন্য ড্রতে। কিন্তু খেলার ফলের চেয়েও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে মাঠের পরিবেশ। শেষ দুটি ম্যাচ তো একরকম অন্ধকারেই খেলতে হয়েছে মেয়েদের!
স্টেডিয়ামের চার ফ্লাডলাইট টাওয়ারের তিনটিরই অধিকাংশ বাতি নষ্ট। ডিজিটাল স্কোরবোর্ডটা অচল হয়ে পড়ে আছে। কোনো ম্যাচ টাইমার নেই, লিগ সম্প্রচারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। সাবেক ফুটবলাররা আক্ষেপ করে বলছেন, নামে লিগ হলেও বাস্তবে এটি দেশের নারী ফুটবলের প্রতি চরম অবহেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সর্বশেষ ১৩ বছরে বাংলাদেশে নারী ফুটবল লিগ হয়েছে মোটে ছয়বার। শুরুতে পরপর দুটি আসর হওয়ার পর টানা ছয় বছরের দীর্ঘ বিরতি। ২০১৯ সালে নতুন করে শুরু হলেও আগের মতোই অনিয়মিত ও উপেক্ষিত রয়ে গেছে লিগটা। ২০২৩ সালে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের বড় হাঁকডাক দিয়েছিল বাফুফে, কিন্তু সেই ঘোষণা শেষ পর্যন্ত ফাঁকা আওয়াজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
দেড় বছর পর এবার মেয়েদের ঘরোয়া লিগ যখন মাঠে ফিরল, সেখানে নেই আবাহনী, মোহামেডান, বসুন্ধরা কিংস কিম্বা ফর্টিস এফসির মতো বড় ক্লাবগুলো। বড় দল না থাকায় লিগের লড়াইটাও পানসে হয়ে গেছে। কোনো কোনো দল ১০-১২টি করে গোল হজম করছে।

ম্যাচ হবে এক মাসে ৫৫টি! এটাকে তাই ঠিক ‘লিগ’ বলতে নারাজ সাবেক ফুটবলার রেহানা পারভীন। তিনি সরাসরিই বললেন, ‘এটাকে লিগ বলা যায় না, নামমাত্র আয়োজন। এক মাসে ৫৫টি ম্যাচ, এটা কী করে সম্ভব। এখন দেখানোর জন্য যদি করেন তাহলে ভিন্ন কথা। আমি বলব, এটা সম্পূর্ণ জোড়াতালির লিগ।’
১১ দল খেলছে অথচ অনেকেই ম্যাচগুলো ঠিকমতো দেখতে পারছেন না, এ অবহেলার কারণ জানা নেই রেহানারও, ‘এত বছর পর লিগ হচ্ছে, উচিত ছিল আগে থেকেই সবকিছু ঠিকঠাক করা। এটা দেশের শীর্ষ লিগ অথচ সেভাবে সম্প্রচার নেই। শুনলাম কম আলোয় মেয়েরা খেলছে, এত অবহেলা কেন?’
বড় হতাশা পারিশ্রমিক নিয়েও। বসুন্ধরা কিংস যখন লিগে ছিল, তখন শীর্ষ খেলোয়াড়েরা ৪-৫ লাখ টাকা পেতেন। কিংস সরে দাঁড়ানোর পর মেয়েদের আয়ের বাজারে যেন ধস নেমেছে। গতবারও সর্বোচ্চ ছিল দুই-আড়াই লাখ। এবার ঋতুপর্ণা চাকমা সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা পেলেও জাতীয় দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই দলভুক্ত হয়েছেন দেড় থেকে দুই লাখে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় দলের এক তারকা ফরোয়ার্ড আক্ষেপ করে প্রথম আলোকে বলছিলেন, ‘কী আর বলব, মাত্র দেড় লাখ টাকা পাব। বসে থাকার চেয়ে অন্তত খেলার মধ্যে তো থাকতে পারব—এই ভেবেই সই করেছি।’

জাতীয় দলের সাবেক কোচ হাসানুজ্জামান খান বাবলু মনে করেন, লিগের যে সিস্টেম হওয়া উচিত ছিল, তা আজও গড়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, ‘সারা দেশের ৬৪ জেলায় লিগ হবে, সেখান থেকে মেয়েরা জাতীয় দলে আসবে—এটাই হওয়ার কথা ছিল। শুধু বাফুফে ভবনের কিছু মেয়েকে নিয়ে লিগ আর আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলাই সব নয়।’ তাঁর পরামর্শ, বড় ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক না করলে লিগের চেহারা বদলাবে না।
এত অভাব আর অব্যবস্থাপনার মধ্যেও আশার কথা শোনাচ্ছেন বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার। তাঁর কথা, ‘এখান থেকেও আমরা ভালো ফুটবলার পাব। আমাদের কোচরা নজর রাখছেন, তাঁরাই প্রতিভা খুঁজে বের করবেন।’
বাস্তবতা অবশ্য বলছে ভিন্ন কথা। ভাঙা ফ্লাডলাইট আর অচল স্কোরবোর্ডের নিচে যে অন্ধকার তৈরি হয়েছে, তা ছাপিয়ে আলোর দেখা পাওয়া এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।


















