মালয়েশিয়ায় থাকা একদল প্রবাসী বাংলাদেশি পেট্রোনাস টাওয়ারের সামনে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে রেমিট্যান্স শাটডাউনের দাবি জানাচ্ছেন। এমন একটি ছবি সম্প্রতি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই ছবি প্রকাশিত হয় গত বছরের ৩ ডিসেম্বর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনার পর। যেখানে বলা হয়েছিল, যদি প্রবাসীরা ১৬ ডিসেম্বরের পর দেশে ৬০ দিনের বেশি অবস্থান করেন, তাঁদের মুঠোফোন রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক হবে। এর প্রতিবাদই মালয়েশিয়ায় প্রবাসীরা জানিয়েছিলেন দাবি করে ছবিটি প্রচার করা হয়েছিল।

সাধারণ দৃষ্টিতে ছবিটি বাস্তব মনে হলেও খেয়াল করলে চোখে পড়বে, এর নিচের ডান কোণে গুগলের এআই জেমিনাইর জলছাপ। গুগল ডিপমাইন্ড ‘ন্যানো বানানা’ নামে একটি উন্নত ইমেজ এডিটিং মডেল সম্প্রতি চালু করেছে। এটি জেমিনাইয়ের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ছবি সৃজনশীলভাবে সম্পাদনা করার সুযোগ দেয়। ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন, মুখের অভিব্যক্তির সামঞ্জস্য আনা, এমনকি পুরো ছবি নতুনভাবে তৈরিও করা যায় এর মাধ্যমে।
সন্দেহ জাগার পর এআই শনাক্তকরণ টুলসে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। অথচ এই ছবি আসল মনে করে অনেকেই এমন বিক্ষোভের খবরটি সত্য ভাবছিলেন।
এমন অনেক ছবি ও ভিডিও ভুল করে সত্যি ভাবার পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে এআই। তাতে দেখা মানেই বিশ্বাস করার যে অভ্যাস, তা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি-ভিডিও বেশি ছড়াচ্ছে। প্রচারের পাশাপাশি অন্য পক্ষকে ঘায়েলের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এআই।
এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও এমন বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে যে সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক সময় সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বিভ্রান্ত হন। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এআই ছবি ও ভিডিও বোঝার কিছু সহজ দিক নিয়ে কথা বলা জরুরি।
ছবি দেখে কীভাবে বোঝা যাবে
১. অস্বাভাবিক শারীরিক গঠন বা খুঁটিনাটি লক্ষ করুন: এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে মানুষের শরীরের ছোটখাটো অংশে গরমিল খুব সাধারণ বিষয়। অনেক সময় হাতে আঙুল পাঁচটির বেশি বা কম দেখা যায়, আঙুলগুলো জোড়া লেগে থাকে, নখের গঠন অস্বাভাবিক হয়। কানের আকৃতি, দাঁত অদ্ভুতভাবে সারিবদ্ধ বা চোখ দুটো একরকম না লাগতে পারে। বাস্তব ছবিতে ক্যামেরার কোণ বা আলো খারাপ হলেও এমন শারীরিক ভুল সাধারণত হয় না। তাই মানুষের মুখ, হাত, চোখ, কান—এই জায়গাগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই অনেক সময় এআইয়ের ছাপ ধরা পড়ে।

উদাহরণ: সিলেটে শিক্ষার্থীদের মিছিল থেকে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় চাওয়ার দাবির একটি ছবি সামাজিক যোগাযোমাধ্যমে ছড়ানো হয়। ছবিটি পর্যবেক্ষণ করলে লক্ষ করা যায়, বিদ্যালয়ের নামের বানান ভুল আছে, শিক্ষার্থীদের চোখ ও মুখের গঠন প্রায় এক রকম, কিছু মুখ গলে যাচ্ছে মনে হয়। পতাকা ও নৌকা প্রতীকও অস্বাভাবিকভাবে বিকৃত বা অসংগত দেখাচ্ছে। এগুলো সবই এআই দিয়ে তৈরি ছবির সাধারণ লক্ষণ, যা বাস্তব ঘটনার ছবি নয়।
২. ব্যাকগ্রাউন্ডের লেখা, ব্যানার বা সাইনবোর্ড দেখুন: এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ডের লেখায় সবচেয়ে বেশি ভুল দেখা যায়। সাইনবোর্ডে লেখা অস্পষ্ট, বানান ভুল বা অর্থহীন হতে পারে। বাংলায় অক্ষর এলোমেলো থাকে, শব্দের অর্ধেক ঠিক অর্ধেক ভুল, আবার কোথাও ইংরেজি অক্ষর বিকৃত হয়ে যায়। বাস্তব ছবিতে ক্যামেরার রেজল্যুশন কম হলেও লেখা সাধারণত অর্থপূর্ণ থাকে। কোনো ব্যানার বা পোস্টারে যদি চোখে পড়ার মতো ভাষাগত গরমিল থাকে, তাহলে সেটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

উদাহরণ: ধামরাইয়ের ঐতিহাসিক জগন্নাথ রথে অগ্নিকাণ্ডের দাবিতে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। ছবিটি জুম করে দেখলে আশপাশের দোকান ও বিলবোর্ডের লেখা বিকৃত বা অস্বাভাবিক, কিছু লেখা বোঝা দুষ্কর। এগুলো এআই দিয়ে তৈরি ছবির সাধারণ লক্ষণ।
৩. অতিরিক্ত নিখুঁতকে সন্দেহ করুন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যে এমন ছবি দেখা যায়, যেখানে সবাই অস্বাভাবিকভাবে সুন্দর, ত্বকে কোনো দাগ নেই, কাপড় একদম পরিপাটি, আলো নিখুঁতভাবে পড়েছে, আকাশ অতিরিক্ত নীল। বাস্তবে রাস্তা, বাজার, মিছিল বা জনসমাবেশে সাধারণত এত নিখুঁত দৃশ্য দেখা যায় না। বাস্তব ছবিতে বিশৃঙ্খলা, ঘাম, ছায়া-আলোয়ের গরমিল, অপ্রস্তুত মুখ—এসব থাকে। সবকিছু যদি খুব ‘পারফেক্ট’ লাগে, তাহলে সেটি এআইয়ের তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

উদাহরণ: বিমানবন্দরে লাগেজ কাটাছেঁড়া ও মালামাল চুরির ঘটনায় এক প্রবাসীর আর্তনাদ দেখানোর নামে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। ছবিটি অতি নিখুঁত, তবে আশপাশের পুলিশ ও যাত্রীদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর বা সহানুভূতির চিহ্ন দেখা যায় না। যেন সবাই ছবি তোলার জন্যই প্রস্তুত। এগুলো এআই দিয়ে তৈরি ছবির লক্ষণ।
৪. এআই টুলের জলছাপ বা লেবেল খুঁজে দেখুন: অনেক এআই টুল ছবি তৈরি করার সময় কোনায় ছোট করে জলছাপ বা লেবেল রেখে দেয়। ছবির নিচে, পাশে বা কোনায় এআই জেনারেটেড বা কোনো নির্দিষ্ট আইকন থাকতে পারে। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে কখনো কখনো এআই-সংক্রান্ত একটি চিহ্ন বা লেবেলও দেখা যায়। যদিও সব এআই ছবি তাতে চিহ্ন রাখে না, তবু চোখে পড়লে সেটিই সবচেয়ে সরাসরি প্রমাণ যে ছবিটি বাস্তব নয়।

উদাহরণ: মিজানুর রহমান আজহারীর খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতের দাবি করে একটি ছবি প্রচার হয়। ছবিটির ডান পাশে নিচে ‘AI দিয়ে তৈরি’ লেখা রয়েছে। এ ছাড়া লেখাটির নিচেই MINIMAX | Hailuo AI–এর জলছাপও রয়েছে। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, ছবিটি এআই ব্যবহার করে তৈরি।
৫. উৎস যাচাই করুন: কোনো ছবি কে পোস্ট করেছে—এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অচেনা ফেসবুক প্রোফাইল, নতুন পেজ বা অস্পষ্ট পরিচয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে আসা সংবেদনশীল ছবি বেশি সন্দেহজনক। প্রোফাইল ঘেঁটে দেখলে অনেক সময় দেখা যায়, একই আইডি থেকে নিয়মিত বিভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এআই দিয়ে তৈরি ছবি পোস্ট করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে, এই ছবিটি যদি সত্যিই বাস্তব হতো, তাহলে জাতীয় গণমাধ্যমে এর খবর নেই কেন?

উদাহরণ: জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের বৈঠকের দাবিতে যে ছবি ছড়িয়েছিল, সেটির কোনো অস্তিত্ব জাতীয় বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। পরে যাচাই করে দেখা যায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।
৬. সাধারণ যুক্তি ব্যবহার করুন: ছবির সত্যতা যাচাই করার সবচেয়ে সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি হলো সাধারণ যুক্তি প্রয়োগ করা। কোনো বড় ঘটনা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সংবেদনশীল পরিস্থিতির ছবি যদি শুধু ফেসবুক বা কোনো অচেনা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে দেখা যায়, অথচ জাতীয় বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কোথাও প্রকাশিত হয়নি, তাহলে সেটি নিয়ে সন্দেহ করা স্বাভাবিক। বাস্তব ঘটনার ছবি সাধারণত একাধিক সূত্র থেকে, একাধিক কোণ থেকে ধারণ করা হয়। অর্থাৎ যদি ঘটনা সত্যিই ঘটে, তাহলে তা কোথাও একবারই নয়; বরং বিভিন্ন মাধ্যমে ফুটে ওঠার কথা।

উদাহরণ: শহীদ শরিফ ওসমান হাদির গ্রাফিতি কাশ্মীরে আঁকা হয়েছে, এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। যদি সত্যি হতো, তা অন্য কোনো বিশ্বস্ত সূত্র বা গণমাধ্যমে থাকার কথা। যাচাই করলে দেখা যায়, আঞ্চলিক, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যমে এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
ভিডিও দেখে কীভাবে বোঝা যাবে
১. চোখের পলক ও দৃষ্টির স্বাভাবিকতা লক্ষ করুন: এআই ভিডিওতে অনেক সময় মানুষ খুব কম চোখের পলক ফেলে, অথবা চোখ স্থির ও প্রাণহীন দেখায়। বাস্তব ভিডিওতে মানুষের চোখ স্বাভাবিকভাবেই নড়ে ও পলক ফেলে।

উদাহরণ: তাসনিম জারাকে ঘিরে ভাইরাল একটি ভিডিওতে চোখের অস্বাভাবিক স্থিরতা ও মুখের অসংগতি লক্ষ করা যায়।
২. ঠোঁটের নড়াচড়া ও কণ্ঠস্বর মিলছে কি না দেখুন: কথা বলার সময় ঠোঁটের নড়াচড়া যদি শব্দের সঙ্গে পুরোপুরি না মেলে, তাহলে সেটি ডিপফেক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অনেক সময় কণ্ঠস্বর আলাদা মনে হয়, স্বাভাবিক ওঠানামা থাকে না।

উদাহরণ: শরীয়তপুরে নিহত খোকন দাসের স্ত্রীর বক্তব্য দেখানোর নামে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি এবং এতে কয়েকটি অসংগতি লক্ষ করা যায়: একাধিক অস্বাভাবিক কাট, পেছনের নারীদের চিৎকারের ভঙ্গি কিন্তু কোনো শব্দ শোনা যায় না, বক্তব্যে নাম ও শব্দের উচ্চারণ অস্বাভাবিক (‘কোকন দাস’ এবং ‘পূর্ণ আবৃত্তি’), চোখের পানির দৃশ্যও স্বাভাবিকতার সঙ্গে মেলে না। এগুলো সবই এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওর সাধারণ লক্ষণ।
৩. মুখের আবেগ ও অভিব্যক্তি অস্বাভাবিক কি না দেখুন: এআই ভিডিওতে হাসি, রাগ বা গম্ভীর ভাব প্রায়ই এক রকম থাকে। বাস্তব মানুষের মুখে কথা বলার সময় স্বাভাবিক আবেগের পরিবর্তন ঘটে।

উদাহরণ: শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের কথিত স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওতে মুখভঙ্গি ও আচরণ অস্বাভাবিক ছিল।
৪. পরিবেশ ও পটভূমি যুক্তিযুক্ত কি না ভাবুন: গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার ভিডিও বিশ্বাস করার আগে দেখুন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবরটি রয়েছে কি না? বড় ঘটনা কিন্তু কোথাও সংবাদ নেই, এটাই বড় সতর্কতা সংকেত।

উদাহরণ: মক্কায় পবিত্র ওমরাহর স্থানে আগুন লাগার দাবিতে যে ভিডিও ভাইরাল হয়, সেটি নিয়ে কোনো বিশ্বস্ত গণমাধ্যমে তথ্য পাওয়া যায়নি।
৫. ভিডিও ছড়ানো অ্যাকাউন্টের ইতিহাস দেখুন: যে আইডি থেকে ভিডিওটি ছড়ানো হচ্ছে, সেটি আগে কী ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করেছে, তা দেখুন। অনেক সময় দেখা যায়, একই প্রোফাইল থেকে ধারাবাহিকভাবে এআই ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে।

উদাহরণ: মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর এআই দিয়ে তৈরি সেনা কর্মকর্তার একটি ভিডিও ছড়ায়। ভিডিওটি যে প্রোফাইল থেকে আপলোড করা হয়েছে, সেখানে এ রকম এআই তৈরি করা ভিডিও ধারাবাহিকভাবে আপলোড করতে দেখা যায়।
সুতরাং, অনেক ক্ষেত্রেই এআই ছবি বা ভিডিও ধরতে সব সময় জটিল সফটওয়্যার দরকার হয় না। আবেগ উসকে দিচ্ছে কি না, খুঁটিনাটি স্বাভাবিক কি না, উৎস বিশ্বাসযোগ্য কি না এবং ‘এটা সত্য হলে অন্য কোথাও থাকার কথা’—এসব সাধারণ যুক্তি ব্যবহার করলেই অনেক ভুয়া কনটেন্ট চিহ্নিত করা সম্ভব, যা আপনি নিজেই করতে পারেন। এখানে প্রয়োজন একটু সচেতনতা—দেখলেই বিশ্বাস নয়; বরং দেখে, ভেবে, যাচাই করে বিশ্বাস, এই অভ্যাসটি যদি গড়ে তুলতে পারেন।
সোহাগ মিয়া


















