ব্যবসায় অলিগার্কদের ক্ষমতা ভাঙতে হবে, ফেরাতে হবে প্রতিযোগিতা

0
17
বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্সের এক অধিবেশনে অতিথিরা। আজ শুক্রবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে

বিগত সরকারের আমলে দেশে একটি অলিগার্ক শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল। লুণ্ঠনের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি করলেও দেশে কর্মসংস্থান বাড়েনি। এই অলিগার্কদের ক্ষমতা ভাঙতে হবে। ব্যবসায় প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে; যাতে মধ্যম মানের ব্যাপক উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হয়। আর ব্যবসায় নতুন শ্রেণির উৎপাদনমুখী বুর্জোয়া গোষ্ঠী প্রয়োজন। যারা লুণ্ঠন নয়, উদ্ভাবন এবং প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত হবে।

বেসরকারি নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের আয়োজনে বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্সের ‘অর্থনৈতিক কৌশল ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ শীর্ষক অধিবেশনে এ কথাগুলো বলেন বক্তারা। এই অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খান। সঞ্চালনা করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খান। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলন শুরু হয়।

মূল আলোচনায় অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, ‘এখন অর্থনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের সময় এসেছে। নব্বইয়ের দশকে আমরা দেখেছি, দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল আর্মি ও অলিগার্ক শ্রেণির লোকজন। এরপরই দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি শক্তিশালী হয়েছিল। হাজার হাজার ক্ষুদ্র এ মাঝারি উদ্যোগ তৈরি হয়। শিল্পকারখানা গড়ে উঠে। তখন কর্মসংস্থান ভারতের চেয়ে দ্রুত বাড়ছিল। চালকের আসনে ছিল মধ্যম সারির উদ্যোক্তারা, যা চীনেরও সফলতার মূল শক্তি।’

মুশতাক খান আরও বলেন, গত ১৭ বছরে মধ্যবিত্ত থেকে আবার উচ্চবিত্তরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। নতুন অলিগার্ক শ্রেণির উদ্ভব হয়। এতে কেবল তাদেরই উন্নতি হয়। প্রবৃদ্ধি বাড়ে। তবে কর্মসংস্থান প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। এই অলিগার্কদের ক্ষমতা ভাঙতে হবে। ব্যবসায় প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ, পুঁজিপতিরা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে নিয়ে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে। তাই সংস্কারের ক্ষেত্রে ভূরাজনীতির সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক সংযোগ ঘটাতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, গত ১৫ বছরে দেশে লেনদেনভিত্তিক একটি ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। যার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কবজা করে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিয়েছিলেন। এ ধরনের সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই হয়তো তাঁরা জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন। গত তিনটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছিল। তাই তারা বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করেছিল, তবে তা ব্যর্থ হয়েছে।

বর্তমান সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, কে সংস্কার করবে? সংস্কারের চাহিদা বেশির ভাগ সুশীল সমাজ, উন্নয়ন-সহযোগীসহ সাধারণ শ্রেণি থেকে এসেছে। তবে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে সেই আগ্রহ নেই। তাই বর্তমান সংস্কারে আলাপ কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চিন্তার প্রয়োজন খুবই প্রয়োজন। না হলে পুরোনো দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়া যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘এখন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সময়। জুলাই আন্দোলনকে আমি বিপ্লব মনে করি না। কারণ, কিছু সংস্কার করতে গিয়েও প্রচুর বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিপ্লব হলে এমনটা হতো না।’ ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের সহায়তায় নতুন অলিগার্ক শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল। এখন সেখানে নতুন একটি উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরির সুযোগ এসেছে। উৎপাদনশীল একটি বুর্জোয়া শ্রেণি লাগবে, যারা লুণ্ঠন করবে না; বরং উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করবে। তবে তাদের উত্থানের জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

সংস্কার নিয়ে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘দুর্বল সামাজিক ভিত্তির ওপর অনেক বেশি সংস্কার কার্যক্রম টিকবে না। এ জন্য সময় দিতে হবে। ধাপে ধাপে এগোতে হবে। ভবিষ্যতে আমি খুব বেশি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছি না। একের পর এক অভ্যুত্থান ঘটতে থাকবে হয়তো। এটা কখন থামবে, আমি জানি না।’

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, ‘অলিগার্করা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, তাই সংস্কার বাস্তবায়নের জরুরি মুহূর্তে আছে বাংলাদেশ। সামনে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয় আছে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। শক্তিশালী রোডম্যাপ লাগবে। আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছি। তবে জোরালো সংস্কার না হলে তা সম্ভব হবে না। আর বাংলাদেশকে অবশ্যই এলডিসি থেকে উত্তরণ করা উচিত। রক্ষণশীলতা বজায় রেখে পিছিয়ে না থেকে বরং সুযোগ নেওয়া উচিত।’

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন বলেন, ‘কীভাবে আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো তৈরি করব, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজভিত্তিক পন্থা তৈরি করা প্রয়োজন। সামাজিক খাতের সংস্কার নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.