জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আজ মঙ্গলবার। গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ওই দিন সকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। পরে ৬ জানুয়ারি নির্বাচনের নতুন তারিখ ধার্য করে নির্বাচন কমিশন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে এই প্রথম জকসু নির্বাচন হচ্ছে। এর আগে জগন্নাথ কলেজ থাকাকালীন ১৯৮৭ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন। প্রথম জকসু নির্বাচন নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। সংকট কাটিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনায় আশাবাদী তাঁরা।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ভোট গ্রহণের জন্য তারা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সকাল সাড়ে আটটা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯টি কেন্দ্রে মোট ১৭৮টি বুথে ভোট গ্রহণ চলবে।
আমরা আজকে নতুন করে আরও দুটি মেশিন নিয়ে এসেছি। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে চেক করে দেখেছি বর্তমান মেশিনগুলোতে অসংগতির পরিমাণ শূন্য শতাংশ। কালকে (মঙ্গলবার) ওএমআর মেশিনে ভোট গণনা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আনিসুর রহমান
নির্বাচনের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোস্তফা হাসান বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কোন পদে কত প্রার্থী
নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য ২১টি পদে ১৫৭ জন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হলের সংসদের ১৩টি পদে ৩৩ জনসহ মোট ৩৪টি পদের বিপরীতে ১৯০ জনকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জকসু নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, নির্বাচনে মোট ভোটার ১৬ হাজার ৬৬৫ জন। এতে মোট চারটি প্যানেলে প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। সেগুলো হলো ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’, ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’, বাম জোট–সমর্থিত ‘মওলানা ভাসানী ব্রিগেড’ এবং জাতীয় ছাত্রশক্তি–সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’।
এ ছাড়া স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচনে বেশ কয়েকজন প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনে ভিপি পদে লড়ছেন ১২ জন, জিএস পদে ৯ জন এবং এজিএস পদে লড়ছেন ৮ জন।
মওলানা ভাসানী ব্রিগেড প্যানেলের পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদপ্রার্থী সায়্যিদা মুবাশ্বিরা বলেন, জকসু নির্বাচন নিয়ে প্রার্থী এবং ভোটার—আমাদের সবারই বেশ আশা ছিল। কিন্তু কিছু প্যানেলের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রচারণা চালানো এবং জকসু নিয়ে প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা—এসব শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে।
ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা বলেন, ‘অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্যানেলের শীর্ষ পদে নারী নেই, সেখানে আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমি নারীর অধিকার আদায়ে কাজ করতে চাই; কিন্তু এখানে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে নারীদের জন্য। নারীদের অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহ দেওয়া দরকার সেখানে বিভিন্নভাবে নারীদের হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’
ভোটারদের উচ্ছ্বাস
জকসু নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস লক্ষ করা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতামত প্রকাশ করছেন। গতকাল সোমবার সরেজমিনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষদ, একাত্তরের গণহত্যা ভাস্কর্য চত্বর, শহীদ মিনার, টিএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফটক ঘুরে চোখে পড়েছে ভোট নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, জকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘প্রথমবারের মতো নির্বাচন হওয়ায় প্রার্থীদের মধ্যে যে উৎসাহ–আমেজ ছিল, তা নির্বাচন পেছানোতে কিছুটা কমে গিয়েছিল; কিন্তু এখন আবার সে আমেজ দেখা যাচ্ছে। আশা করি কালকে (মঙ্গলবার) সুষ্ঠু নির্বাচন হবে এবং প্রশাসন সুশৃঙ্খল একটা নির্বাচন আমাদের উপহার দেবে।’
মানতে হবে নির্দেশনা
জকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নির্দেশনাগুলো হলো ভোট প্রদানের জন্য শিক্ষার্থীরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর ফটক দিয়ে প্রবেশ করবেন, ভোট দেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ ও ৩ নম্বর ফটক দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে প্রস্থান করবেন; শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ের আগেই কেবল ২ নম্বর ফটক দিয়ে প্রবেশ করবেন। কর্মকর্তা–কর্মচারীরা আইডি কার্ড দেখিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন এবং জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ক্যাম্পাসের বাইরে যাবেন না।
ওএমআর যন্ত্রে অসংগতির অভিযোগ
জকসু নির্বাচনের ভোট গণনার ওএমআর যন্ত্রে অসংগতির অভিযোগ এবং এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার ও সাধারণ শিক্ষার্থী সমন্বিত ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান প্যানেল। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ওএমআর যন্ত্রে বিভিন্ন অসংগতির কথা তুলে ধরেন তাঁরা।
নির্বাচন কমিশনার আনিসুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি খুবই ভালো।’ ওএমআর মেশিনে অসংগতি প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা আজকে নতুন করে আরও দুটি মেশিন নিয়ে এসেছি। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে চেক করে দেখেছি বর্তমান মেশিনগুলোতে অসংগতির পরিমাণ শূন্য শতাংশ। কালকে (মঙ্গলবার) ওএমআর মেশিনে ভোট গণনা হবে।’

















