
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু করে মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে এশিয়ার মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ।
২০১০ সালের ২৯ জানুয়ারি ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে নেপালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পথচলা শুরু বাংলাদেশ নারী দলের। প্রথম ম্যাচেই ১-০ গোলে হার। তবে সেই হতাশা বেশি দিন থাকেনি। পরের ম্যাচে ৩১ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কাকে ২-০ গোলে হারিয়ে আসে প্রথম জয়।
সেই শুরু থেকে আজ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ নারী দল খেলেছে ফিফা–স্বীকৃত টায়ার-১ শ্রেণির ৬৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এর মধ্যে জয় ২৭টি, হার ৩১টি, ড্র ১১টি। ১৫ বছরের এই পথচলায় সবচেয়ে উজ্জ্বল অর্জন—প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া।
কোচ সাহেব আলী বেঁচে থাকলে আজ নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন। ১৯৭৭ সালের ১০ আগস্ট ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ২২ জন ছাত্রীকে নিয়ে ঢাকায় প্রথম মেয়েদের ফুটবলের অনুশীলন শুরু করেছিলেন তিনিই। তখন সাহেব আলী বলেছিলেন, এই মেয়েদের মধ্যেই ভবিষ্যতের ফুটবলার আছে। ৭-৮ জন অনেক দূর যেতে পারে। কিন্তু অর্থাভাবে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই অনুশীলন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
২০০৩ সালে ফিফা ও এএফসির চাপ না থাকলে হয়তো সেই নীরবতা আজও থাকত। বাধ্য হয়েই বাফুফে আবার চালু করে নারী ফুটবল। মাঠে এসে তখন ম্যাচ পণ্ড করে দেয় একশ্রেণির মানুষ। বাফুফে পিছিয়ে আসে। কিন্তু মেয়েদের ফুটবল চালু না রাখলে অনুদান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয় ফিফা। সেই হুমকিই যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
২০০৭ সালে ‘ভিশন এশিয়া’ প্রকল্পের অধীনে প্রথম মহিলা ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে বাফুফে। ২০০৯ সালে শুরু হয় জাতীয় মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। এরপর গোলাম রব্বানীকে নারী দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর হাত ধরেই শুরু নতুন যাত্রা। যদিও বাফুফে ভবনে দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ক্যাম্পের আয়োজন দেখে অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভঙ্গুর কাঠামোর মধ্যে শুধু ক্যাম্প করে আর কত দূর যাওয়া যাবে? মেয়েদের অদম্য ইচ্ছার জোরে কত দূর যাওয়া যায়, তা তো আজ প্রমাণিতই।
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকের সময়টায় দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল বাংলাদেশ। ২০১১ সালে সাফের বাইরে প্রথম কোনো দল হিসেবে উজবেকিস্তানের সঙ্গে খেলার সুযোগ আসে। অলিম্পিক বাছাইয়ের সেই ম্যাচে ৩-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ।

তবে সময়ের সঙ্গে বয়সভিত্তিক দলগুলো সাফের সীমা ভাঙার ইঙ্গিত দিয়েছে। একের পর এক ট্রফি এসেছে বয়সভিত্তিক ফুটবলে। এএফসির প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে এশিয়ার সেরা দলগুলোর সঙ্গে খেলার স্বাদও নিয়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। আঁখি খাতুন, মাসুরা পারভীন, সানজিদা আক্তার, কৃষ্ণা রানী, ঋতুপর্ণা চাকমা, রুপণা চাকমা, মনিকা চাকমা, শামসুন্নাহাররা একেকজন তারা হয়ে উঠতে থাকেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন সাবিনা খাতুন।
২০২২ সালে কাঠমান্ডুতে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ জেতে প্রথম সাফ ট্রফি। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ২০২৪ সালে আবারও জেতে সাফ শিরোপা। এর মধ্যে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি হয়েছে। সাফ অঞ্চলের বাইরেও সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়ার মতো দলকে বড় ব্যবধানে হারানোর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।
সেটিকে পুঁজি করে মিয়ানমারে চলমান ২০২৬ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ‘সি’ গ্রুপের খেলায় চমক দেখিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাগতিক মিয়ানমার ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। সেই বাধা কল্পনারও বাইরে গিয়ে জয় করেছে। পরশু ২-১ গোলের জয়ে নিশ্চিত হয়েছে এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূল পর্বে বাংলাদেশের জায়গা পাওয়া।
এই সাফল্যে আপ্লুত জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ডালিয়া আক্তার (২০০৬-২০১০)। তিনি বলেন, ‘ভাবতেই ভালো লাগে, আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ ছোট বোনেরা তা ছুঁয়েছে। সংগ্রামের দিনগুলো চোখে ভাসে। একসময় মাঠে নামলেই বাধা আসত। আজ সেই মেয়েরাই দেশের গর্ব। অভিনন্দন সবাইকে, অভিনন্দন কোচ পিটার বাটলারকেও।’

২০০৩ সালের সেই কণ্টকাকীর্ণ সময়টায় নারী ফুটবলের অগ্রণী সংগঠক কামরুন নাহার ডানাও আজ খুব খুশি, ‘তখন প্রতিবন্ধকতা থাকলেও আশা ছিল, অনেক দূর যাবে মেয়েরা। আস্তে আস্তে তারা সেই জায়গায় পৌঁছেছে। এটা দেশবাসীর জন্য সুখের বার্তা।’
বাংলাদেশ নারী ফুটবলের এই যাত্রা শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, বাধার দেয়াল টপকানোর দলিলও। সাহেব আলীর সেই অনুশীলন থেমে গেলেও পথচলা থেমে থাকেনি। মাত্র ১৫ বছরেই শূন্য থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের মেয়েরা আজ ক্রীড়াঙ্গনে আলো ছড়িয়েছেন। সামনে আরও বড় সুযোগ। আগামী বছর মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় ১২ দলের ২১তম এশিয়ান কাপ নারী ফুটবলের সেরা আটে থাকলে বিশ্বকাপে খেলার রাস্তাও খুলে যেতে পারে।
এই আনন্দের মধ্যেই বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়েছেন কোচ পিটার বাটলার। পরশু তিনি বলেন, বাংলাদেশে নারী লিগ নেই। যে কারণে মেয়েদের ভুটানের লিগে খেলতে যেতে হয়। বাফুফে কি এবার নড়েচড়ে বসবে?
মাসুদ আলম
ঢাকা