কাছাকাছি সময়ে মুক্তি পেয়েছিল দুই সিনেমা। তবে ‘থামা’ আর ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’-এর রাশমিকা মান্দানার মধ্যে আসমান আর জমিন ফারাক। বলিউড যেখানে তাঁর গ্ল্যামার পুঁজি করেছে, দক্ষিণি ইন্ডাস্ট্রি আস্থা রেখেছে অভিনয়ে। ‘থামা’র গানে যে আবেদনময়ী রাশমিকাকে দেখা যায়, কারণে-অকারণে ‘অ্যানিমেল’-এর মতো যাঁকে ‘শরীর সর্বস্ব’ বানানো হয়; দক্ষিণের ঘরের মেয়েকে নিয়ে দক্ষিণের নির্মাতারা সেখানে আস্থা রেখেছেন রাশমিকার সংবদেনশীলতায়। কেবল রাশমিকার জন্য নয়, অনেক কারণেই ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’ তাই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা।
সিনেমা: ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’
ধরন: ড্রামা
পরিচালক: রাহুল রবীন্দ্রন
অভিনয়: রাশমিকা মান্দানা, ধীক্ষিত শেঠি ও অনু ইমানুয়েল
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট
রাহুল রবীন্দ্রনের ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’ কোনো রাখঢাক না করা ছবি, তবে প্রচলিত সম্পর্কধর্মী ছবির মতো চড়া আবেগ বা অতিনাটকীয়তার পথে হাঁটে না এটি। বরং নানা ব্যস্ততা আর দৃশ্যের ভিড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরে।
ছবির প্রেক্ষাপট খেলাপাগল ও আত্মবিশ্বাসী ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র বিক্রম (ধীক্ষিত শেঠি) এবং ইংরেজি সাহিত্যের এক লাজুক ছাত্রী ভূমার (রাশমিকা মান্দানা) প্রেম। তরুণ বয়সের ভালোবাসার উচ্ছ্বাস, একসঙ্গে সিনেমা দেখা, লাঞ্চ ভাগাভাগি—এসব মুহূর্তের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে কিছু কদর্য সত্য, যা হয়তো আমাদের অনেকের সম্পর্কেই আছে; নির্মাতা সেই লুকিয়ে রাখা অস্বস্তিকর সত্যকে তুলে এনেছেন নিজের মতো। তবে পরিচালক এসব সত্য জোর করে দর্শকের ওপর চাপিয়ে দেন না, বরং আমাদেরই সেগুলো কুড়িয়ে নিতে বলেন।

ছবিটি মূলত দুটি চরিত্রকে ঘিরে—ভূমা ও বিক্রম। এই সিদ্ধান্ত যে কেন নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট। পরিচালক সময় নিয়ে দেখান, কীভাবে এই দুজনের মনোজগৎ কাজ করে। তাঁরা কেবল বহির্মুখী প্রেমিক ও অন্তর্মুখী প্রেমিকার চেনা ছকে আটকে থাকে না, বরং তাঁদের ব্যক্তিত্বের গভীরতা অন্বেষণ করেন।
বিক্রম যখন ভূমার সাফল্যকে খাটো করেন, তখন আমরা বিরক্ত হই। আবার এও বুঝতে পারি, এমন চিন্তাধারার পেছনে তাঁর বেড়ে ওঠার ভূমিকা আছে। অন্যদিকে ভূমা যখন দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করে যান, বিক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেন; তখনো মনে প্রশ্ন জাগে। পরিচালক দেখাতে চান, ভূমার শৈশবের পারিবারিক অবহেলা কতটা গভীর। এক সংবেদনশীল দৃশ্যে আমরা দেখি, ছোটবেলায় ভূমাকে তাঁর বাবার মানসিক সুস্থতার দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেই ট্রমাই বড় হয়ে তাঁর জীবনে ঢুকে পড়ে, যেখানে পুরুষদের দেখভাল করাই তাঁর পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় আর তাঁর নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।

‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’ এক অসম সম্পর্কের দিকে আলো ফেলে। এখানে দুজনই নিজেদের ভিন্ন আবেগ ও পারিবারিক বোঝা নিয়ে সম্পর্কে যুক্ত হন, তবে সেই বোঝার ভার সমান নয়।
ভূমা ও বিক্রম একেবারেই ভিন্ন মেরুর মানুষ। ভূমা লাজুক, ডরমিটরিতে বসে ভার্জিনিয়া উলফ পড়তেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য। বিক্রম আত্মবিশ্বাসী, তথাকথিত ‘হিরো’ ইমেজে অভ্যস্ত—মারধর করতে পিছপা নন এবং কলেজের মেয়েদের ‘রক্ষা’ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ভূমার পছন্দ বড় বড় বই আর বিক্রমের পছন্দ তাঁর মা। এমনকি ভূমার সঙ্গে প্রথম কথোপকথনেই তাঁর মায়ের সঙ্গে তুলনা টেনে আনেন বিক্রম। ভূমার কাছে সেটিকে বিপজ্জনক মনে হয়, তবে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হয়তো বাবার অভাব তাঁর আপাতদৃষ্টে বাজে সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাখ্যা।

রাশমিকা মান্দানা ও ধীক্ষিত শেঠির অভিনয়ে ভর করে এগোয় ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’। ছবিটি ‘বিষাক্ত’ সম্পর্ক নিয়ে হলেও প্রধান চরিত্রে দুজনের অভিনয় অন্য স্তরে নিয়ে গেছে। ছবির সবচেয়ে বড় চমক অনু ইমানুয়েল অভিনীত দুর্গা চরিত্রটি। দুর্গা কলেজের ডিভা, যার নজর বিক্রমের দিকে। চরিত্রটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে লেখা। আগের ভারতীয় সিনেমায় দেখা ‘ম্যান-ইটার’ স্টেরিওটাইপ চরিত্রগুলো ভুলে যেতে বাধ্য করে সে।
ছবিটিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বতঃস্ফূর্ত। যেমন ভূমা যখন প্রথমবার বিক্রমের মায়ের সঙ্গে দেখা করেন তখন তাঁর মাথার ভেতরের অনেক ধাঁধা অনেকটা মিলে যায়। কিন্তু কিছু জায়গায় ছবিটি যখন নিজেই সব ব্যাখ্যা করে দিতে চান, তখন তা বাড়াবাড়ির দিকে চলে যায়। ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’ অনেক পরিণত নির্মাণ, তবে কিছু জায়গায় কেন যেন নির্মাতা লেকচারের লোভ ছাড়তে পারেননি।
রোহিনির সঙ্গে ভূমার মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যটি আয়নার সামনে ধারণ করা, তাঁদের জীবনের প্রতিচ্ছবির এক চমৎকার রূপক। কিন্তু সেই রূপককে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ছবিটি তার প্রভাব কিছুটা হারিয়ে ফেলে।

কিছু খামতি সত্ত্বেও ছবির চিত্রনাট্য পুরো সময়ই শক্তিশালী। এটি নৈতিকতার পাঠ দিতে চায় না আবার পুরুষদের শুধরে দেওয়ার দায় নারীদের ওপরও চাপায় না। এখানে নারীদের সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্তের জন্য আলাদা করে যুক্তি দাঁড় করাতে বাধ্য করা হয় না—বিশেষ করে যখন পুরুষটি স্পষ্টতই ভুল। নারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্পর্ক রাখবে না, এটাই যথেষ্ট কারণ হওয়া উচিত আর ‘দ্য গার্লফ্রেন্ড’ ঠিক সেটাই বলে।
লতিফুল হক
ঢাকা


















