স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মোছাব্বির (৪৪) নিহত হওয়ার ঘটনায় আধিপত্য বিস্তার, কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক বিরোধ—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। রাজধানীর তেজগাঁও থানার পশ্চিম তেজতুরি বাজার এলাকায় গত বুধবার রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি নিহত হন।
আজিজুর রহমান ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি একের পর এক মামলার আসামি হন এবং বেশির ভাগ সময় কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি দলীয় রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হন।
আজিজুর হত্যার সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পুলিশ ও র্যাবের একাধিক সূত্র জানায়, কারওয়ান বাজার, তেজতুরি বাজার ও আশপাশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষের সঙ্গে আজিজুরের বিরোধ চলছিল। পাশাপাশি ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে আরেকটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন ঘিরে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও তাঁর বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত একটি অংশের সঙ্গেও তাঁর বিরোধ চলছিল।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, খুনিরা আজিজুরের পরিচিত হতে পারে। দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে সূত্রটি বলছে, আজিজুরকে যেখানে গুলি করা হয়, অল্প দূরত্বে আরও দুজন ব্যক্তি ছিলেন। ওই দুই ব্যক্তি পেশায় অটোরিকশাচালক। তাঁরা পুলিশকে বলেছেন, গুলিতে আহত হওয়ার পর আজিজুর চিৎকার করে বলছিলেন, ‘…তোরা এটা কী করলি?’ এমন বক্তব্য থেকে পুলিশ সূত্রের ধারণা, খুনিরা পরিচিত।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত বুধবার সন্ধ্যার পর পশ্চিম তেজতুরি বাজার এলাকায় স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন আজিজুর। রাত আটটার দিকে বৈঠকটি শেষ হয়। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে পাশের গলির মুখে রাত ৮টা ১০ মিনিটে দুজন অটোচালকের সঙ্গে আজিজুরের দেখা হয়। তখন আজিজুরের সঙ্গে ছিলেন কারওয়ান বাজার ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী ওরফে মাসুদ (৪০)। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পর দুই অটোচালক ওই গলি ধরে সামনে এগিয়ে যান। একটু পর আজিজুর ও সুফিয়ান ওই গলি দিয়ে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স-সংলগ্ন গার্ডেন রোডের বাসার দিকে রওনা দেন। গলি দিয়ে একটু সামনে এগোতেই ওত পেতে থাকা দুই দুর্বৃত্ত আজিজুরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আজিজুর ও সুফিয়ান দৌড়ে কিছু দূর গিয়ে পড়ে যান। আর দুই দুর্বৃত্ত গলির মুখ পেরিয়ে মূল সড়কে এসে পালিয়ে যায়।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান গতকাল বিকেলে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুজনকে দেখা গেছে। তাঁদের একজনের চেহারা স্পষ্ট, অন্যজনের মুখমণ্ডল মাফলার দিয়ে ঢাকা। যাঁর চেহারা দেখা গেছে, তাঁর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ যে দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর কথা বলেছে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের একজন বলেন, স্টার হোটেল থেকে বের হওয়ার পর গলির মাথায় আজিজুর ও সুফিয়ানের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। কুশল বিনিময়ের পর তাঁরা গলি দিয়ে সামনে এগিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখেন, আজিজুর ও সুফিয়ান গুলিবিদ্ধ হয়ে দৌড়াচ্ছেন। একপর্যায়ে দুজনই পড়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। আজিজুর তখন শুধু বলেছিলেন, ‘আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যা।’
অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি
আজিজুর রহমান হত্যার ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার। তিনি বলেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর স্বামী বিভিন্ন সময় বলেছেন, তিনি অনেক জনপ্রিয়। মানুষ তাঁকে অনেক ভালোবাসে। এ কারণে তাঁর শত্রুও তৈরি হয়েছে। তাঁকে যেকোনো সময় মেরে ফেলা হতে পারে।

এদিকে ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গতকাল দুপুরে আজিজুর রহমানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা বলেন, হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আগামীকাল শনিবার ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে মহানগর ও জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এমন রোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি: মির্জা ফখরুল
দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে, যার নির্মম বহিঃপ্রকাশ আজিজুর হত্যাকাণ্ড বলে মনে করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের রোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে।
গতকাল আজিজুর হত্যাকাণ্ডে শোক জানিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে এ কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব।

















