ঢাকার পথঘাটে সত্যিই অদ্ভুত সব কাজকর্ম করছেন মনিকা কবির। এই তাঁকে দেখা যাচ্ছে পুলিশের সঙ্গে ছবি তুলতে। এই আবার অচেনা পথচারীর হাতে তুলে দিচ্ছেন রাশিয়ার পতাকা। কখনো ঘুরে বেড়াচ্ছেন রিকশা-ভ্যানে চেপে। আবার কখনো মাথায় ফুলের মালা জড়িয়ে নিচ্ছেন অচেনা কিশোরীর হাতে। আর এসবের ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফলে তিনি এখন পরিচিত মুখ।
এসব ভিডিওর সূত্র ধরে খোঁজাখুঁজি করছিলাম মনিকার সঙ্গে আলাপ করব বলে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে ‘আনজারা গার্ল’ পরিচয় দিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। তাই যোগাযোগ করলাম ‘আনজারা’ নামের সেই ফ্যাশন ব্র্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক নওরীন ইরার সঙ্গে। তিনি জানালেন, মনিকা সম্প্রতি বাংলাদেশি ফ্যাশন ব্র্যান্ড আনজারার সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। আর সেই সূত্রেই পেয়ে গেলাম মনিকার খোঁজ।
২৩ মার্চ দুপুরে গেলাম বনানীতে আনজারার অফিসে। মনিকা কবির তখন ফটোশুট নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সামান্য বিরতি মিলতেই শুরু হলো আলাপচারিতা। ইংরেজিতে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত আড্ডাটা জমে উঠল বাংলায়। দুপুর গড়িয়ে তা ঠেকল বিকেলে।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মনিকার জন্ম রাশিয়ায়। বেড়ে উঠেছেন মস্কো শহরে। বেড়ে ওঠা বললে ভুল হবে, জন্মের পর থেকে থেকেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। নিজের সম্পর্কে মনিকা জানালেন এভাবে, ‘আমার মায়ের নাম ম্যারিয়া গোজেন। আমার রুশ নাম মারিয়া ভ্যালিরিয়েভনা। আমার রুশ ডাকনাম মনিশকা। বাবার ব্যবসাসূত্রে কখনো এশিয়া, কখনো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছি। ছেলেবেলায় বাড়িতেই পড়াশোনা করেছি, মানে হোম স্কুলিং আরকি।’

বয়স পাঁচ হলে একেবারে সরাসরি ক্লাস ফাইভে ভর্তি হন মনিকা। ১২ বছরে শেষ করেন কলেজের পড়াশোনা। এরপর ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে। অনুবাদে আগ্রহ আছে বলে পড়তে শুরু করেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সলেশন বিষয়ে। মাতৃভাষা রুশসহ ছয়টি ভাষায় (বাংলা, হিন্দি, পোলিশ, আজারবাইজানি, তুর্কি ও ইংরেজি) অনর্গল কথা বলতে পারেন। পড়তে ও লিখতেও পারেন কিছুটা। মনিকা বললেন, ‘বাংলা শিখেছি আমার ন্যানির (আয়া) কাছে। আগামী কয়েক মাসে হয়তো বাংলা পুরোপুরি শিখে ফেলব।’
বাংলাদেশে আসার কারণ
আপনার রুশ নাম মনিশকা থেকে মনিকা রেখেছেন, এটা তো বুঝতে পারছি; কিন্তু নামের শেষাংশে ‘কবির’ যুক্ত করলেন কী ভেবে? মনিকা বললেন, ‘নামের শেষাংশের “কবির” নিয়েছি আমার দাদার কাছ থেকে। দাদা ও দাদি ভারতের নয়াদিল্লির মানুষ। আমার বাবা সেখানেই বড় হয়েছেন। বাবা ব্যবসার খাতিরে রাশিয়ায় যান, সেখানেই আমার মায়ের সঙ্গে পরিচয়। বাবা বাংলাদেশে চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে অনেক দিন যুক্ত ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে আসি ২০১২ সালে। তখন থেকেই এখানে আছি। বাড়িতে ন্যানির কাছে বাংলা শিখেছি। আমার বড় এক ভাই রাশিয়ায় থাকে, আর ছোট ভাই থাকে তুরস্কে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো অনেক কিছুই করছেন। নিজেকে কী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন? মনিকা বললেন, ‘নিজেকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালো লাগে। তুরস্কে থাকার সময় লাতিন নাচ শিখেছিলাম। একদিন আমার এক বন্ধুকে নিয়ে কফি খেতে গিয়েছিলাম। সেখানে এক তুর্কি আমাকে নাচ শেখার কথা বলেন। তারপর থেকেই মূলত নাচ শেখার শুরু। তুরস্কে একটা আন্তর্জাতিক নাচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১৭তম হয়েছিলাম।’
ভাইরাল জীবন কেমন লাগে
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনিকার নাচের ভিডিও, মানুষের সঙ্গে গল্প করা, মেট্রোরেলে ঘুরে বেড়ানোর ভিডিও আলোচিত। এ প্রসঙ্গে মনিকা বলেন, ‘মানুষ ভালো লাগে আমার। অন্যদের মনোযোগ পেতে ভালো লাগে। আমার চলাফেরা ও কাজের মাধ্যমে নারীর স্বাধীনতা ও এগিয়ে চলার গল্প বলতে চাই। রাস্তায় যানজটে দাঁড়িয়ে থাকলে অনেক মানুষের দেখা পাই। তাঁরা আমার কাজ সম্পর্কে জানতে চান। সবাইকে এগিয়ে চলার বার্তা দিই, সবাইকে ভালো থাকার অনুপ্রেরণা দিতে চাই।’
এসব কর্মকাণ্ড বা ভিডিও দেখে লোকে কী বলে? মনিকা হাসেন, ‘ফেসবুকে অনেকেই অনুপ্রেরণা দেন, আবার অনেকেই নেতিবাচক কথা বলেন। আমি নেতিবাচক মন্তব্যে গুরুত্ব দিই না। আমি আমার মতো কাজ করে যাচ্ছি।’
কথাবার্তায় বোঝা গেল, বাংলাদেশের মানুষকে খুব আপন করে নিয়েছেন মনিকা। সিলেটের একজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয়পর্ব–বিষয়ক একটা ভিডিও চোখে পড়েছিল। আরেকটি ভিডিওতে দেখেছিলাম, এক কিশোরীর কাছ থেকে মাথায় জড়িয়ে নিচ্ছেন ফুলের মালা। আবার মানুষের করতালির জবাব দিচ্ছেন হাসিমুখে। আরেকটি ভিডিওতে তাঁকে দেখা যায় একদল শিশু–কিশোরের সঙ্গে রাতবিরাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশি শিশু-কিশোরদের সঙ্গ নাকি বেশ উপভোগ করেন।
বাংলাদেশের যা ভালো লাগে
এই দেশটা কেমন লাগে? মনিকা বললেন, ‘বাংলাদেশ বিশ্বের কিউটেস্ট কান্ট্রি।’ তারপর বাংলা ভাষায় বললেন বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালো লাগার কথা, ‘আমার ইলিশ মাছ খুব ভালো লাগে। প্রায় সব বাংলাদেশি খাবারই আমার প্রিয়। একবার কক্সবাজার গিয়ে ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তখন ট্যুরিস্ট পুলিশ অনেক কষ্ট করে আমার ব্যাগ খুঁজে বের করে দিয়েছিলেন। আমি থাইল্যান্ডে গিয়েছিলাম; কক্সবাজারের অভিজ্ঞতা আমার থাইল্যান্ডের চেয়েও ভালো। বাংলাদেশের মানুষ খুব আন্তরিক। যখন রাস্তায় হাঁটি, সবাই খুব কৌতূহল নিয়ে আমার দিকে তাকায়।’
কোথায় কোথায় ঘুরলেন
মনিকা বলেন, ‘ফ্রান্স ছাড়া ইউরোপের সব দেশেই গেছি। আমার ঘুরতে খুব ভালো লাগে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, রাজশাহীসহ অনেক জেলায় গিয়েছি। অনেক কিছু শিখেছি। আগেই বলেছি, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত আমার খুব ভালো লেগেছে। সিলেটের পাহাড়, চা-বাগান আর সবুজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছি। সেখানকার মানুষকেও খুব ভালো লেগেছে। বাংলাদেশ সত্যিই খুব সুন্দর।’
এখন যা নিয়ে ব্যস্ত
শুরুতেই বলেছি, মনিকা কবির এখন ফ্যাশন ব্র্যান্ড আনজারার সঙ্গে কাজ করছেন। ‘আনজারা গার্ল’ পরিচয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন ফ্যাশন অনুষঙ্গ জনপ্রিয় করে তুলতে কাজ করবেন। তাই আনজারার লেহেঙ্গা, শাড়িসহ বিভিন্ন পোশাক–আশাক নিয়ে বিভিন্ন ফটোশুট ও মডেলিংয়ে বেশ ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে তাঁকে। বিভিন্ন ফ্যাশন আয়োজনেও মনিকা হাজির হচ্ছেন নিয়মিত। বাংলাদেশি সিনেমা খুব একটা দেখেননি; তবে সুযোগ পেলে ঢালিউড বা বলিউডের সিনেমায় অভিনয় করার ইচ্ছা আছে তাঁর।
মনিকা বলেন, ‘আমার বাংলাদেশে থাকতে ভালো লাগে। বিভিন্ন ফ্যাশন শোতে অংশ নিয়েছি। শাড়ি ও বিভিন্ন পোশাক দারুণ আনন্দ নিয়ে পরি। প্রথমবার যখন বাংলাদেশের শাড়ি পরি, তখন আমাকে জলপরির মতো লাগছিল। আর আমি যে এত সুন্দর, তা শাড়ি না পরলে এত ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম না।’