বাড়ি যদি মানুষ হতো? যে বাড়িতে অনেক মানুষ থাকে, সেটাই কি সুখী বাড়ি? জানালা জোরে বন্ধ হলে কি বাড়ির ব্যথা লাগে? বাড়িকে একটা চরিত্র ধরে নিয়ে রচনা লিখতে লিখতে এভাবেই ভাবে একটি শিশু। শুরুর এ দৃশ্যই ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র সারকথা।
টাইটেল কার্ডের পরের দৃশ্যেই আমরা এক মঞ্চ অভিনেত্রীকে দেখতে পাই। শো শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে হঠাৎই তার নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়। মঞ্চ থেকে পালাতে চায়। হঠাৎ সে নিজের মতো করে ‘দ্য সিগাল’–এর লাইন আওড়াতে থাকে। শুনতে বিষয়টি নাটকীয় লাগতে পারে। আপনি এখনো নোরাকে ভালো করে চেনেননি। সে ভীষণ উদ্বিগ্ন, স্নায়ুচাপে ভোগা একজন মানুষ, যার মঞ্চভীতি এতটাই তীব্র যে নাটকের উদ্বোধনী প্রদর্শনী প্রায় ভেস্তে যেতে বসে। নোরা নিজের পোশাক ছিঁড়ে ফেলতে চায়, সহ–অভিনেতার কাছে ওষুধ চায়, না হলে তাকে থাপ্পড় মারতে অনুরোধ করে।
একনজরে
সিনেমা: ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’
ধরন: ড্রামা
পরিচালক: ইয়েকিম ত্রিয়ের
অভিনয়: রেনাতে রেইনসভে, স্টেলান স্কারসগার্ড, ইঙ্গা ইবসডটার লিলেয়াস ও এল ফ্যানিং
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২১ মিনিট
স্ট্রিমিং: মুবি
একটি বাড়ি, ইতিহাস, স্মৃতি, শিল্প আর ট্রমা মিলিয়েই ইয়েকিম ত্রিয়েরের শ্বাসরুদ্ধকর ড্রামা ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’। ছবির অনেক দৃশ্যই ইঙ্গমার বার্গম্যানকে মনে করিয়ে দেয়। ‘দ্য ওর্স্ট পারসন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’–এর কথা মনে রেখেও বলা যায়, এটিই নির্মাতার সবচেয়ে পরিণত কাজ।
নোরা (রেনাতে রেইনসভে—ত্রিয়েরের প্রশংসিত ‘দ্য ওর্স্ট পারসন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর চেয়েও এখানে আরও উজ্জ্বল) মঞ্চ অভিনেত্রী। ছবির শুরুতেই তার মা মারা যান। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন সম্পর্কের পর আবার তার জীবনে ফিরে আসেন বাবা গুস্তাভ (স্টেলান স্কারসগার্ড—ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়)। নোরার বোন আগনেস (ইঙ্গা ইবসডটার লিলেয়াস) স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসারী। নাটকের দলের এক বিবাহিত সহ-অভিনেতার সঙ্গে নোরার প্রেম। নোরা বা আগনেস কেউই বাবাকে আশপাশে চাইছে না। তারা জানতে পারে, গুস্তাভের এখনো বাড়িটির ওপর আইনি অধিকার আছে।

গুস্তাভ ১৫ বছর ধরে সিনেমা বানান না, ক্যারিয়ার পড়তির দিকে। নতুন ছবি করতে চান বটে, কিন্তু লগ্নি পাচ্ছেন না। শেষমেশ নিজের মেয়ে নোরাকে প্রস্তাব দেন তাঁর নতুন ছবির প্রধান অভিনেত্রী হতে। জানান, চিত্রনাট্য নোরাকে ভেবেই লেখা। সোজা না করে দেয় নোরা, সে চিত্রনাট্য পড়তেও রাজি নয়। চরিত্রটি আদতে গুস্তাভের মাকে নিয়ে লেখা, যিনি নাৎসির নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর এ বাড়িতেই আত্মহত্যা করেছিলেন।
এরপর গুস্তাভ চলে যান দোভিল চলচ্চিত্র উৎসবে—যেখানে তাঁর একটি ছবির প্রদর্শনী চলছে। সেখানে এক খ্যাতনামা মার্কিন অভিনেত্রী র্যাচেল কেম্প (এল ফ্যানিং) ছবিটি দেখে এতটাই আবিষ্ট হন যে সৈকতে নৈশভোজে গুস্তাভকে আমন্ত্রণ জানান; দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত নোরার জন্য লেখা চরিত্রটি র্যাচেলই করেন।

এখানেও বার্গম্যানের ‘পারসোনা’র ছায়া পরিষ্কার। বিশেষ করে যখন পরিচালকের মেয়ের মতো দেখাতে চুল রাঙান র্যাচেল। গুস্তাভ যখন র্যাচেলকে নিয়ে ছবির কাজে ব্যস্ত, ইচ্ছা করেই তাদের এড়িয়ে চলে নোরা। আর ইতিহাসবিদ আগনেস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্যাতন ও তাঁর দাদির আত্মহত্যার পেছনের সত্য খুঁজতে থাকে।
‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ধীরে ধীরে আবেগ তৈরি করে। এখানে মেলোড্রামা নেই; গল্পের বাঁকবদল আসে বিশ্বাসযোগ্যভাবেই। শেষে শক্তিশালী মুহূর্তে কোনো সংলাপ নেই—তার প্রয়োজনও পড়ে না।
ছবির সাফল্যের জন্য বিশ্বাসযোগ্যতা জরুরি। এ ছবিতে স্কারসগার্ড, রেইনসভে ও লিলেয়াস—তিনজনই চরিত্রে পুরোপুরি মিশে যান। একটি দৃশ্যে গুস্তাভ যখন নাতির বয়সের অনুপযোগী ডিভিডি কিনে ফেলে তখন নোরা যে হাসিটা দেয়, তা অসাধারণ। অল্প পরেই দুজন সিগারেট ধরায়—হাসিমুখে। টানাপোড়েনের সম্পর্ক মানেই শুধু টানাপোড়েন নয়; অনেক সময় কথা থামলেই পুরোনো বন্ধন একটু নতুন করে জোড়া লাগে। অনেক হলিউডি ছবিতেই দেখা যায়, জটিল পারিবারিক সম্পর্ক মানেই কেবল একরৈখিক যন্ত্রণা, তখনই জন্ম নেয় মেলোড্রামা; ত্রিয়ের সে পথে হাঁটেন না।

‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ অভিনয় ও চিত্রনাট্যের কৃতিত্বে এতটাই সফল যে এর কারিগরি সৌন্দর্য আড়ালে পড়ে যায়; কিন্তু কাসপার টুক্সেনের চিত্রগ্রহণ ও অলিভিয়ে বুগে কুতের নিখুঁত সম্পাদনার প্রশংসা না করলে অন্যায়ই করা হবে। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সংলাপনির্ভর ছবিটিকে গতিময় রাখতে ত্রিয়ের তাঁদের সঙ্গে এমন ভিজ্যুয়াল গড়ে তোলেন, এককথায় যা দুর্দান্ত। কয়েক মিনিট পরপর কালো পর্দায় ‘হার্ড কাট’ দিয়ে অধ্যায়ভিত্তিক গঠন বড় কোনো উপন্যাসের স্বাদ দেয়।
পর্দায় গুস্তাভ যে ছবিটি বানাতে চান তা এক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়—ত্রিয়েরের ছবিটিও থাকে না। ওপরে ওপরে এটি তাঁর মাকে নিয়ে; গভীরে মেয়েকে নিয়ে, নাতিকে নিয়ে, নিজেকে নিয়েও। ছবির কেন্দ্রে দুই নারী—একজন অভিনেত্রী, অন্যজন ইতিহাসবিদ। তাঁরা শিল্পীসত্তা ও ঐতিহাসিক কৌতূহলের প্রতিনিধিত্ব করেন—শিল্প কীভাবে জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। এল ফ্যানিং অভিনেত্রী হিসেবে চমৎকার। যিনি গুস্তাভের নায়িকা হয়ে ওঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।; কিন্তু নির্মাতা যেখানটায় চান, সেখানে পৌঁছাতে পারেন না। কারণ, তিনি সেই জীবনটা কাটাননি।

স্টেলান স্কারসগার্ড এতটাই শক্তিশালী অভিনেতা যে ছবিটিকে শুধু বাবা–মেয়ের গল্প হিসেবে দেখার প্রলোভন জাগে—এবং র্যাচেলের আগমনকে নোরাকে প্রতিস্থাপনের প্রতীক ভাবতে ইচ্ছা করে; কিন্তু ত্রিয়ের আসলে অন্যদিকে মনোযোগী। ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি নোরা ও অ্যাগনেসের। বহু বছর আগে গুস্তাভের চলে যাওয়া এবং মায়ের অসুস্থতা নোরার কাঁধে অকালেই দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল। এখন সেই নোরার দেখভাল করছে অ্যাগনেস।
সিনেমায় বাড়িটিকে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। পুরোনো বাড়িতে ফাটলের অভাব নেই। মনে হয়, এই ভেঙে পড়বে। ছবিটি ইঙ্গিত দেয়, যদি ভেঙেই পড়ে, হয়তো সেটাই ভালো। শিল্পচর্চা কীভাবে অনুশোচনা, প্রায়শ্চিত্ত আর সম্পর্কের ফাটল জোড়া লাগায়, সেটাই দেখায় ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’। এতটাই তীব্রভাবে যে শেষ হওয়ার পরেও ভোলা যায় না।
লতিফুল হক
ঢাকা

















