
বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক বলতে তারা কী বোঝাতে চাইছে, সে বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস। আজ রোববার দুপুরে ঢাকার একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রত্যাশা তুলে ধরে ইভার্স ইজাবস বলেন, আসন্ন নির্বাচন হবে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট আয়োজন ভোটারদের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা অটুট রাখবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সাংবাদিক জানতে চান, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও সবার অন্তর্ভুক্তি বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন। জবাবে ইইউর প্রধান নির্বাচন পর্যবেক্ষক বলেন, ‘আমাদের প্রেক্ষাপট থেকে অংশগ্রহণমূলক মানে সব সামাজিক গোষ্ঠীকে যুক্ত করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন নারী, সব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ। আর অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা ভোটারের বিশ্বাসযোগ্য অংশগ্রহণ বোঝাই।’
অতীতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের ওপর জোর দিতেন ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ইভার্স ইজাবস বলেন, ‘আমরা জানি দলের নিবন্ধন একটা ইস্যু এবং জাতীয়ভাবে বিরোধের মীমাংসা (রিকনসিলিয়েশন) এবং রূপান্তরকালীন বিচারের বিষয়টি এখানে ঐতিহাসিকভাবে জটিল বিষয় বলেও আমরা জানি। আমরা এসব ইস্যুতে কোনো মন্তব্য করছি না। তবে নির্বাচন, ভোটার উপস্থিতির মতো বিষয়ে এসবের কী প্রভাব, সেদিকে আমরা নজর রাখব। সুতরাং নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলার জন্য আমরা এখানে আসিনি। অবশ্য আমরা সেটা জানি এবং সেটাকেও বিবেচনায় নেব।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে গত বছর। নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করায় দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের উপযোগী কি না, সে প্রশ্নের জবাবে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান বলেন, ‘অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটা বিষয় এবং সেখানে মনোযোগ দিচ্ছে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন। আমার প্রাথমিক আভাস হচ্ছে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুরূহ বিষয় হচ্ছে, একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকরভাবে মোতায়েন করা এবং অন্যদিকে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়া। এই দুয়ের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে, সেদিকে আমরা মনোযোগ রাখব।’
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় ঝুঁকি থাকছে বলে মনে করছেন কি না—সে প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইজাবস বলেন, ‘একই দিনে দুটো ভোট সাধারণত হয় না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। গণভোট নয়, আমরা মূলত সংসদীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করব। কেননা ওটা আমাদের ম্যান্ডেটের বাইরে। তবে যেহেতু দুটো বিষয় পরস্পর সংযুক্ত, নাগরিকেরা ঠিকমতো জেনে তাদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কি না, সেদিকে আমরা নজর দেব। গণভোট যেহেতু অনেক দেশের জন্য একটা ইস্যু এবং সে কারণে এতে বিশেষ মনোযোগ দেব আমরা।’
ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) দেখছে কি না, সে প্রশ্নে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনপ্রধান বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয়টি আমরা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে দেখব। উদাহরণস্বরূপ, গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকারের বিষয়ও আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।’ তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মিডিয়ায় প্রত্যেক প্রার্থী কতটা প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন, সেটা বহু দেশেই একটা ইস্যু। ভোটে প্রার্থীদের নিবন্ধনের মতো বিষয়ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ আরেকটি দিক। প্রার্থিতার বিষয়ে আপিল চলছে। এ দিকটাও পর্যবেক্ষণ করবেন তাঁরা।
নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগের বিষয়ে ইইউর পর্যবেক্ষক দল নজর রাখছে বলে জানান ইভার্স ইজাবস। গণমাধ্যম কীভাবে কাজ করতে পারছে, সে বিষয়টিও তাদের দৃষ্টিতে থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি জানান, নির্বাচনের দুই দিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ইইউ ইওএম একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে এবং ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করবে। প্রায় দুই মাস পর একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইইউ ইওএমের সব পর্যবেক্ষক কঠোর আচরণবিধির অধীন এবং মিশনটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নীতিমালার ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ পরিচালনা করে।
বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ মিশন শুরু করেছে। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে এই মিশন স্বাধীনভাবে, কোনো রকম পক্ষপাতিত্বহীনতা ছাড়া ও কোনো রকম হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে—তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
পূর্ণ সক্ষমতায় এই মিশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকছেন। এর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ১১ জন বিশ্লেষক নিয়ে একটি কোর টিম, ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক, যাঁদের ভোটের ঠিক আগে মোতায়েন করা হবে এবং ইইউ সদস্যরাষ্ট্র ও অংশীদার দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনের পর্যবেক্ষকেরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল এই মিশনে যোগ দিয়ে এর কার্যক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে।
প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস বলেন, এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারত্বের গুরুত্বকে তুলে ধরছে।
মিশনটি তাদের কার্যক্রম চলাকালে নির্বাচনের প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও তার বাস্তবায়ন, নির্বাচনী প্রচারণা এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যে নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। এ ছাড়া নারী, তরুণ প্রজন্ম ও ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য জনগোষ্ঠীসহ সবার রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের সামগ্রিক পরিসর মূল্যায়ন করবে। ভোটারদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য ইইউ ইওএমের পৃথক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ইইউ ইওএম নির্বাচন জাতীয় আইন অনুযায়ী কতটা পরিচালিত হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানদণ্ড গ্রহণ করেছে, সেগুলোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হলো, তা মূল্যায়ন করবে।

















