৭ বছরে শতকোটি ডলারের কোম্পানি

0
41
রিতেশ আগারওয়াল

ভারতের ওডিশা রাজ্যের রায়গড়ায় ছোট্ট একটি শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা রিতেশের। বাবার ছোটখাটো ব্যবসা ছিল। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বোনের কাছ থেকে প্রথম ‘উদ্যোক্তা’ শব্দটি সম্পর্কে জানতে পারেন রিতেশ। সেই থেকেই তাঁর মনে গেঁথে যায় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন। তবে শৈশব খুব সহজ ছিল না রিতেশের। ২০০৬ সালে যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বছর, তখন থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য সিম কার্ড বিক্রি শুরু করেন রিতেশ। অবশ্য কম্পিউটারের সফটওয়্যার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা শুরু করেন আরও আগে, মাত্র ৮ বছর বয়সে।

২০০৯ সালে ওডিশা থেকে রাজস্থানে চলে যান তিনি। উদ্দেশ্য ছিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়ার। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং বেশি দিন ভালো লাগেনি তাঁর। প্রায় সময় দিল্লি যেতেন রিতেশ। সেখানকার বিভিন্ন স্টার্টআপে ইন্টার্নশিপ করতেন। এর মাধ্যমে সুযোগ হয় বিভিন্ন উদ্যোক্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার। আর এতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নটি। একসময় বুঝতে পারেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ায় কোনো মনোযোগ নেই তাঁর। তাই ২০১১ সালে পাকাপাকিভাবে দিল্লিতে চলে যান। দিল্লিতে যাওয়ার পর কিছুদিন প্রস্তুতি নেন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করার। ভর্তি হন বিভিন্ন কোর্সে। এমনকি পড়ার উদ্দেশ্যে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ইন্ডিয়া ক্যাম্পাসে ভর্তিও হয়েছিলেন। তবে সেখানেও মন বসেনি। একসময় বুঝতে পারলেন আর যা–ই হোক তাঁকে দিয়ে আর পড়ালেখা হবে না। সে সময় রিতেশ আগারওয়ালের বেড়ানোর বেশ শখ ছিল। সুযোগ পেলেই ট্রেনে চেপে ভ্রমণ করতেন ভারতের শহরগুলো। বিভিন্ন সময় হোটেলে রাত কাটাতে হতো। কিন্তু থাকার মতো হোটেল খুঁজে পেতে তাঁর বেশ সমস্যা হতো, কারণ পকেটে তেমন অর্থ থাকত না। বাজেটের মধ্যে হোটেল খুঁজে পেতে খুব কষ্ট করতে হতো তাঁকে। আবার বাজেটের মধ্যে পেলেও তাতে থাকত না তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা। আর তাতে তাঁর মাথায় আসে চমৎকার এক আইডিয়া।

৭ বছরে শতকোটি ডলারের কোম্পানি

২০১২ সালে রিতেশের ওয়ো রুমস আইডিয়া ভেঞ্চার নার্সারি নামক এক্সিলারেটর প্রোগ্রামে বিচারকদের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। আইডিয়াটা ছিল বিভিন্ন পর্যটন ও বিনোদনমূলক স্থানে অনলাইনের মাধ্যমে আরামদায়ক ও বাজেট হোটেল, বাড়ি, খালি জায়গা খুঁজে পাওয়ার এক প্ল্যাটফর্ম। অবশ্য এর আগে পশ্চিমে এ আইডিয়া নিয়ে গড়ে ওঠে এয়ারবিএনবি প্ল্যাটফর্ম। তবে ভারতে এটি ছিল একদমই নতুন। ওই বছরই ‘ওরাভেল স্টেইস’ নামের একটি ওয়েবসাইট খোলেন রিতেশ। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিনি সাশ্রয়ী হোটেলের তালিকা তৈরি ও বুকিংয়ের ব্যবস্থা করেন। কয়েক মাসের গবেষণার পর ২০১৩ সালে এই ওয়েবসাইটের যাত্রা শুরু হয় ‘ওয়ো’ নামে।

ওওয়াইওর পূর্ণরূপ ‘অন ইয়োর ওউন’। অর্থাৎ যার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ছোটবেলায় ভাইবোনদের সঙ্গে টিভি দেখার সময় রিমোটের নিয়ন্ত্রণ পেতেন না। তখন থেকেই শব্দটি মাথায় ছিল তাঁর। আর তাই নিজের কোম্পানির নাম দিলেন এটি। কোম্পানিকে দাঁড় করাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন রিতেশ আগারওয়াল। এমনকি বিভিন্ন হোটেলে তিনি নিজেই রুম সার্ভিস বয় থেকে শুরু করে বেবি সিটারের কাজও করেছেন। হোটেলে আসা পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁরা কেমন সুযোগ-সুবিধা চান, এসব বোঝার চেষ্টা করতেন। অনেকে তো তাঁকে হোটেল বয় মনে করে বকশিশও দিয়েছেন। তবে সাফল্য পেয়েছেন রিতেশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন হোটেলে ওয়োর মাধ্যমে পছন্দের হোটেল বাছাই ছাড়াও হোটেল বুকিং দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে নিজের কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ৮০টি দেশে ব্যবসা বিস্তৃত ওয়োর। ওয়োর অধীনে অন্য কোম্পানির অসংখ্য হোটেল রয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির নামে রিতেশও তৈরি করেছেন অসংখ্য ওয়ো রুম। রিতেশের কোম্পানিতে এখন কাজ করছেন দেড় হাজার কর্মী। সফটব্যাংক, হিরো এন্টারপ্রাইজ, চায়না লজিং গ্রুপ, রাইড-হেইলিং কোম্পানি গ্র্যাবের মতো কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে ওয়োতে।

২০১৮ সালের শেষ দিকে ওয়ো নাম লেখায় ১০০ কোটি ডলার কোম্পানির তালিকায়। এরপর ২০০ কোটি ডলারের কোম্পানি হতে সময় নেয় মাত্র এক বছর। বর্তমানে কোম্পানির মূল্যমান ২৫০ কোটি ডলার। ২০১৮ সালে হুরুন ইন্ডিয়া ধনীর তালিকায় রিতেশ আগারওয়াল ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী সেলফ-মেড উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি পান। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস–এর ৩০ বছরের কম বয়সী সেলফ মেড উদ্যোক্তার তালিকায়ও রয়েছেন রিতেশ।

সম্প্রতি শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত হতে চাইছে কোম্পানিটি। মুম্বাইয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের জন্য আবেদন করেছে তারা। এর মাধ্যমে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে চায় কোম্পানিটি। এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি জানিয়েছে, এ অর্থ কিছু ঋণ পরিশোধ করতে এবং কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে