হঠাৎ ‘নমনীয়তা’র পেছনে সিটি নির্বাচন ও সম্মেলন

0
174
মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পর উত্তেজনা হঠাৎ থেমে গেলেও কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের দিকে চেয়ে আছে একটি পক্ষ। আরেকটি পক্ষ মনে করছে, ‘অহেতুক ভুল–বোঝাবুঝির’ অবসান হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দুই পক্ষের বিবাদ এখনো চলছে।

দলীয় সূত্র জানায়, আসন্ন সিটি নির্বাচন এবং নগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের কথা ভেবে দুই পক্ষই হুঙ্কার দিয়ে হঠাৎ থেমে গেছে। টানা তিন দিন স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে উত্তেজনাকর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাতে দুই পক্ষের নেতারা আগুনে পানি ঢেলে দেন।

গত রোববার চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার মঞ্চ থেকে প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী ও নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনকে নামিয়ে দেন মেয়র নাছির উদ্দীন। রোববার চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন একটি কমিউনিটি সেন্টারে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিনিধি সভায় ওবায়দুল কাদেরসহ একাধিক মন্ত্রী ও সাংসদ ছাড়াও ছয়টি সাংগঠনিক জেলার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

মঙ্গলবার মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন তাঁর অনুসারীদের পাল্টা কর্মসূচি না দিতে নির্দেশ দেন। একই দিন প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনের নির্দেশে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম নিজেদের কর্মসূচি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। যদিও সোমবারের এক বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে মেয়র নাছিরকে হাসিনা মহিউদ্দিনের কাছে ক্ষমা চাইতে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। আপাতত দুই পক্ষই পিছিয়ে আসায় পরিস্থিতি শান্ত হয়।

রাজনীতিতে নবীন বনাম প্রবীণ
নগর আওয়ামী লীগে দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেন প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী। রাজনীতিতে তখন অনেকটাই নবীন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর রাজনীতির মাঠ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে নেন নাছির। নানাভাবে তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনেক অনুসারীকে ভাগিয়ে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু একঝাঁক তরুণ মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে আছেন, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

রাজনীতিতে মেয়র নাছিরের তুলনায় হাসিনা মহিউদ্দিন কিছুটা নবীন হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে হাসিনা মহিউদ্দিনের প্রভাব বাড়তে শুরু করে ১৯৯৪ সাল থেকে। ওই বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র হন। টানা ১৭ বছর মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এই সুযোগে রাজনীতির পাঠ শুরু করেন হাসিনা মহিউদ্দিন। তিনি নগর মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে আসেন ১৯৯৮ সালে। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হন।

গত রোববার বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার মঞ্চ থেকে হাসিনা মহিউদ্দিনকে নামিয়ে দেওয়ার জের ধরে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই দিন হাসিনা মহিউদ্দিন বসেছিলেন মঞ্চের নিচে প্রতিনিধিদের আসনে। কিন্তু নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী তাঁকে ইশারা দিয়ে মঞ্চে উঠতে বলেন। মিনিট বিশেক পরে তাঁকে নেমে যেতে বলেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র নাছির উদ্দীন। একই সঙ্গে সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামকেও মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বলা হয়। গণমাধ্যমে সংবাদটি প্রকাশিত হলে আগুনে ঘি ঢালার মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনীতি।

দলীয় একটি সূত্র জানায়, উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মেয়র নাছির পাশে পান চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও সম্পাদককে। কারণ, মঞ্চে কারা উঠবেন কিংবা কারা উঠতে পারবেন না, তা আগেই নির্ধারিত ছিল। কেন্দ্র সেটা অনুমোদন দেয়। মঞ্চ থেকে তিনজনকে নামিয়ে দেওয়া কাগজে–কলমে অযৌক্তিক ছিল না। কিন্তু মেয়র সেদিন তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত নগরের দুই সাংগঠনিক সম্পাদক নোমান আল মাহমুদ ও হাসান মাহমুদ হাসনিকে মঞ্চ থেকে নামতে বলেননি। ফলে মেয়রের এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা। একইভাবে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী কেন হাসিনা মহিউদ্দিনকে মঞ্চে তুলেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

জানতে চাইলে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, অহেতুক ভুল–বোঝাবুঝির অবসান ঘটেছে। আসলে ভাইবোনের মধ্যেও ঝগড়া হয়, আবার তাঁরা মিলেও যান।

হাসিনা মহিউদ্দিন মেয়র নাছিরের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে কী ঘটেছে, তা প্রধানমন্ত্রী জানেন। তিনি আমাদের আস্থার শেষ ঠিকানা। তিনি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত দেবেন।’

যে কারণে নমনীয়
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, কয়েক মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন এবং সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নিজেদের পছন্দের মানুষকে আনতে চাইছে মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবার। একইভাবে মহিউদ্দিন চৌধুরীর কোনো অনুসারীকে মেয়র পদেও প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায় এই পরিবার। বিপরীত ধারার মেয়র নাছির দলীয় সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদটি ধরে রেখে সিটি নির্বাচনে আবার মেয়র প্রার্থী হতে চাচ্ছেন। এ কারণে দুই পরিবারের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে।

নগর আওয়ামী লীগের দুই নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, সিটি নির্বাচন ও সম্মেলনের বিষয়টি দুই পক্ষের মাথায় আছে। যারা এ মুহূর্তে উত্তেজিত হবে, তারা হেরে যাবে। বিষয়গুলো মাথায় রেখে দুই পক্ষ নমনীয় হয়েছে।

ফেসবুকে বিবাদ
মেয়র নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগের কর্মী মো. জিয়া উদ্দিন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রয়াত নেতা, মুরব্বি কী শিখিয়েছিলেন? আর এখন তারা কী করছে? মুরব্বির কথা শোনে না…। এদের বেয়াদব বললেও ভুল হবে। এরা আসলে জাতীয় শ্রেষ্ঠ বেয়াদব।’

অপর দিকে প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নাহিদ হোসেন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘হোক প্রতিবাদ, হোক প্রতিরোধ। রাজপথে স্লোগান হোক এক সুরে। বীর মহিউদ্দিন জনতার/ রুখে মহিউদ্দিন সাধ্য কার?’

একরামুল হক, চট্টগ্রাম

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে