স্বামী নয়, সন্তান চাই এসব নারীর

0
140
দাতার শৈশবের ছবি দেখে শুক্রাণু পছন্দ করেন চীনা নারীরা। স্বামী ছাড়াই সন্তান গ্রহণের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ছবি: এএফপি

যিনি বাবা হবেন, তিনি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস দূরের কথা, তাঁর সঙ্গে কোনো দিন দেখা না-ও হতে পারে। আর যে সন্তান জন্ম নেবে, সে কোনো দিন না-ও পেতে পারে বাবার সান্নিধ্য। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ আবার কেমন আজব সম্পর্ক? তা সম্পর্ক যা-ই থাকুক, এই বিচিত্র ঘটনাকে বাস্তবে নিয়ে এসেছে বিজ্ঞান। আর স্বামী ছাড়াই, কোনো পুরুষের সংস্পর্শে না এসে মা হচ্ছেন চীনের কিছু একলা থাকা নারী। যাঁরা কখনো বিয়ে করেননি।

শিয়াওগুনঝু (৩৯) ছবির অ্যালবাম দেখছিলেন। একটার পর একটা পাতা ওলটাচ্ছেন আর ছবি দেখছেন। কিন্তু কোনো প্রশংসা নেই। হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে গেল গাঢ় দুটি নীল চোখে। মুখে হাসি। ছেলেটি ফরাসি বংশোদ্ভূত আইরিশ। আসলে শিয়াওগুনঝু খুঁজছিলেন তাঁর পছন্দসই এমন শুক্রাণুদাতাকেই।

চীনে অবিবাহিত নারীদের শুক্রাণু সংগ্রহ বা ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) চিকিৎসা নিষিদ্ধ। তাই তাঁরা বিদেশি দাতাদের দিকেই ঝুঁকছেন।

শুক্রাণুদাতা পছন্দ করার পর প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মার্কিন মুলুকে উড়াল দেন শিয়াওগুনঝু। তিনি বলেন, ‘অনেক নারী আছেন, যাঁরা বিয়ে থা করেন না। তাঁরা জৈবিক চাহিদার মৌলিক এই দিকটি পূরণ না–ও করতে পারেন। কিন্তু আমি ভিন্ন রাস্তা খুঁজে নিয়েছি।’

শিয়াওগুনঝুর সন্তানের বয়স এখন নয় মাস। নাম অস্কার। ফরাসি বিপ্লবের একটি কমিক চরিত্রের নাম। যেখানে অস্কারকে ফরাসি রাজবংশের শুক্রাণু সংগ্রহে সম্মতি দিতে দেখা যায়।

পাঁচ বছর ধরে চীনে বিয়েশাদির হার অনেক কমেছে। সরকারি হিসাবে, গত বছর সেখানে এক হাজার নারীর মধ্যে মাত্র সাতজন নারী দাম্পত্য সম্পর্কে জড়িয়েছেন।

জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেকায়দায় পড়েন দেশটির শিক্ষিত নারীরা। সমাজবিজ্ঞানী স্যান্ডি টুর ব্যাখ্যা হলো, শিক্ষিত নারীদের বৈষয়িক চাহিদা বেশি। তাই উচ্চশিক্ষিত নারীদের জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণে ঘোরতর আপত্তি ছেলেবন্ধুদের। কিন্তু অনেক নারীই মনে করেন, সঙ্গী না পাওয়ার মতো ঠুনকো একটা বিষয় মাতৃত্বের-স্বাদ গ্রহণ থেকে তাঁদের বঞ্চিত রাখতে পারে না।

শিয়াওগুনঝুও তাই মনে করেন। বলেন, সংসার জীবনে একজন বাবার অস্তিত্ব থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, কেন সবাই এভাবে চিন্তা করে যে শিশুরা বড় হয়ে তাদের বাবা সম্পর্কে জানতে চাইবে। বলবে, ‘কেন আমার বাবা নেই?’

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চীনে ২০২২ সালের মধ্যে শুক্রাণু কেনাবেচার বাজার দেড় শ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে চীনাদের এই শুক্রাণু সংগ্রহের চাহিদাও বাড়ছে। বাজারটি ধরতে বিদেশিরাও বসে নেই। ড্যানিশ শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যাংক ক্রিস ইন্টারন্যাশনাল একটি চীনা ওয়েবসাইট চালু করেছে। নিয়োগ দিয়েছে চীনা ভাষাভাষী কর্মী। আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান শুক্রাণু ব্যাংকও জানিয়েছে, তাদের প্রতিষ্ঠানের চীনা ক্রেতা বেড়েছে।

কিন্তু চীনের বাস্তবতায় পুরুষের সঙ্গ ছাড়া সন্তান নেওয়ার রাস্তাটা মোটেই সহজ ও সস্তা নয়। বেইজিংয়ের একটি ফার্টিলিটি হসপিটালের পরিচালক লিউ জিয়ান বলেন, ‘আমরা এসব একলা নারীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। এটা পরিতাপের।’

খরচের দিকটাও চীনা নারীদের মাথাব্যথার কারণ। কারণ, বিদেশ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল। কোনো বিদেশির শুক্রাণু থেকে গর্ভে সন্তান ধারণ করতে শুরুতেই ঢালতে হয় অন্তত দুই লাখ ইউয়ান (২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার)। চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে বেশ কয়েক দফা বিদেশে পাড়ি জমাতে হবে। কারণ, চীনা আইনে মানুষের শুক্রাণু আমদানি নিষিদ্ধ। তা ছাড়া চীনা সংস্কৃতিও একটা বাধা। চীনা সমাজে এখনো সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে বিয়েকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

প্রচলিত নিয়মনীতির কারণে শুক্রাণুদাতার পরিচয় চীনে প্রকাশ করা যাবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক শুক্রাণু ব্যাংকগুলো শুক্রাণু বেচাকেনার ক্ষেত্রে ব্যক্তির চুলের রং, তাঁর শৈশবের ছবি ও নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাস বিস্তারিত প্রকাশ করে।

চীনের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস ক্যারির (৩৫)। ক্যারি বলেন, চীনের শুক্রাণু ব্যাংকগুলোর চেয়ে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো অনেক আধুনিক। তারা ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে সক্ষম।

ক্রিস ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী (সিইও) পিটার রিসলেভ বলেন, পছন্দের সুযোগ থাকলে চীনা নারীরা ককেশিয়ান অঞ্চলের দাতাদের শুক্রাণু গ্রহণ করেন। তবে বিদেশে এখনো চীনা শুক্রাণুদাতার সংখ্যা কম। ক্রিস জানান, ৯০০ দাতার মধ্যে মাত্র ৯ জন চীনা দাতা পেয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মিশ্র জাতির সন্তানই বেশি পছন্দ চীনা নারীদের। আর পছন্দ করা শুক্রাণুর বেশির ভাগ দাতা শ্বেতাঙ্গ।

শুক্রাণু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বকেই প্রাধান্য দিয়েছেন শিয়াওগুনঝু। একজন হাসিখুশি মানুষের শুক্রাণু গ্রহণ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে চামড়ার রঙে বিশ্বাসী না। বড় চোখে আমার বড় দুর্বলতা। চেহারাও প্রাধান্য দিই।’ তথ্যসূত্র: এএফপি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে