স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে বিশেষ পরিকল্পনা

0
44
গ্যাস অনুসন্ধানে বিশেষ পরিকল্পনা

ইউরোপে যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও দেশের ভেতরে নিজস্ব গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির ফলে উদ্ভূত সংকটের পটভূমিতে দেশীয় খনিজসম্পদ অনুসন্ধানে জোর দিয়েছে সরকার। স্থলভাগে গ্যাসের খোঁজ ও উত্তোলনে বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি ২০২৫ সালের মধ্যে ৪৬টি কূপ খননের মাধ্যমে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ৬২ কোটি ঘনফুট বাড়াতে চায়। এর মধ্যে ১৭টি অনুসন্ধান, ১২টি উন্নয়ন এবং ১৭টি ওয়ার্কওভার (সংস্কার) কূপ খনন করা হবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ চালানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও শক্তিশালী খনন যন্ত্রসহ (রিগ) আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি থাকলে অনুসন্ধান সক্ষমতা আরও বাড়ত বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, বিভিন্ন সময়ের জরিপের তথ্যই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গ্যাসপ্রবণ এলাকা। দেশে তিনটি কূপ খুঁড়লেই একটিতে গ্যাস মেলে। যেখানে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে এই হার ৫:১। তার পরও দেশে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম চলেনি। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চেয়ে বাংলাদেশ আকারে ১৪ গুণ বড়। ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার ত্রিপুরায় এ পর্যন্ত ১৭০টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। আর বাংলাদেশে গত ১১২ বছরে মাত্র ৯৬টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর ৫২ বছরে খনন করা হয়েছে ৪১টি। তিনি বলেন, সুরমা বেসিনের বৃহত্তর সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী অঞ্চলেই মূলত গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। সে তুলনায় বেঙ্গল বেসিনে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান তেমন হয়নি। বদরূল ইমাম এই বেসিনের বরিশাল, ফরিদপুর, ভোলাসহ আশপাশের দ্বীপাঞ্চল, মেঘনা নদীবক্ষ প্রভৃতি এলাকাকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন। এই বেসিনে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেন, দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, খুব কম সময়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। এতে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বছর অনুসারে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ অনুসারে সারাবছর কাজ হবে।

বর্তমানে দেশে ২১টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দিনে ২৩২ কোটি ঘনফুট গ্যাস মিলছে। দেশীয় তিনটি কোম্পানির ১৭ ক্ষেত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৮৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস। বিদেশি দুই কোম্পানি শেভরন ও তাল্লোর মালিকানাধীন চার ক্ষেত্র থেকে মিলছে ১৪৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর বাইরে আমদানি করা এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৫৮ কোটি ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা :তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আবার সক্রিয় হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি। এ বছরের মধ্যে বাপেক্সের গ্যাসক্ষেত্রে পাঁচটি আর সিলেট গ্যাসফিল্ডস কোম্পানির (এসজিএফএল) ফিল্ডে একটি কূপ খনন করা হবে। এতে বছর শেষে দিনে ছয় কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়তে পারে। আগামী বছর বাপেক্সের ৫টি, এসজিএফএলের ৬টি এবং বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ডস কোম্পানির (বিজিএফসিএল) ৪টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ১৫ কূপে দৈনিক ২১.৭ কোটি ঘনফুট উৎপাদন বাড়ার আশা করছে পেট্রোবাংলা। ২০২৪ সালে বাপেক্স ৬, বিজিএফসিএল ৪ এবং এসজিএফএল ৪ কূপ খনন করতে পারে। এতে সেই বছর দিনে ১৭.৬ কোটি ঘনফুট উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৫ সালে বাপেক্স ৪, বিজিএফসিএল ৪ এবং সিলেট গ্যাস ৩টি কূপ খনন করবে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৬.৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে।

এর বাইরে বিদেশি কোম্পানি শেভরন বিবিয়ানার অনাবিস্কৃত অংশে একটি অনুসন্ধানী কূপ চলতি বছরের শেষে খনন করতে পারে। ফল ইতিবাচক হলে এখানে তিনটি উন্নয়ন কূপ খনন করবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানিটি। বিবিয়ানা দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র। এখানে ২৬টি কূপ থেকে দিনে ১২৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস তোলা হয়। এ ছাড়া ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসির আগামী বছর অগভীর সমুদ্রের ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে দুটো অনুসন্ধান কূপ খনন করার কথা রয়েছে। সিলেট গ্যাসক্ষেত্রের ১০ নম্বর কূপ চীনের কোম্পানি সিনোপ্যাকের খোঁড়ার কথা রয়েছে।

চলমান কার্যক্রম :পরিকল্পনা অনুসারে গত শুক্রবার ভোলায় বাপেক্সের গ্যাসক্ষেত্রে টগবি-১ নামে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন শুরু করেছে রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রম। বাপেক্সের শ্রিকাইল গ্যাসক্ষেত্রে উত্তর-পূর্ব-১ কূপ খননের প্রস্তুতি চলছে। বিজয়-১২ রিগ দিয়ে এই অনুসন্ধান কূপটি খোঁড়া হবে। বিজয়-১৮ রিগ দিয়ে বাপেক্সের সেমুতাং ৫ কূপের ওয়ার্কওভার চলছে। এটি শেষ হলে একই রিগ সেমুতাং-৬ কূপে ওয়ার্কওভার শুরু করবে। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে বিজয়-১০ রিগটি শরীয়তপুরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ বছর। এখানে শরীয়তপুর-১ নামে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে। বিজয়-১১ রিগ দিয়ে বিয়ানীবাজারে ওয়ার্কওভারের কাজ শুরু হবে সেপ্টেম্বরে।

সাম্প্রতিক কার্যক্রম :গত এক বছরে একটি অনুসন্ধান এবং একটি উন্নয়ন ও ৫ ওয়ার্কওভার কূপের মাধ্যমে ৩-৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে সিলেট ৯ নম্বর কূপে নতুন গ্যাস মিলেছে। এখান থেকে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মিলছে। ফেঞ্চুগঞ্জ ৩ ও ৪ নম্বর কূপে ওয়ার্কওভারে ১.৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। কৈলাসটিলা ৭ নম্বর কূপ থেকে এক কোটি ঘনফুট গ্যাস তোলা হচ্ছে। শ্রিকাইল ৪ নম্বর কূপ থেকে দুই কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।

সাইসমিক সার্ভে :নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার, বিদ্যমান ক্ষেত্রের মজুত ও নতুন স্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ কার্যক্রম চালাচ্ছে বাপেক্স। বর্তমানে ব্লক ১৫ ও ২২-এর আওতায় ফেনী ও চট্টগ্রামে টুডি সাইসমিক সার্ভের কাজ চলছে। নভেম্বরে ব্লক ৬বি ও ১০ এর আওতায় বরিশাল-চাঁদপুর অঞ্চলে গ্যাসের খোঁজে টুডি ভূকম্পন জরিপ চলবে। সিলেটের জকিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের পাথারিয়ায় এ বছর ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ কার্যক্রম চালাবে বাপেক্স।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.