‘সাংবাদিকদের বিভক্তিই সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতায় বড় বাধা’

0
391
বক্তৃতা দিচ্ছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান।

‘ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে তো বটেই, এমনকি স্বৈরাচার এরশাদ আমলেও ঐক্যবদ্ধভাবে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করেছে সাংবাদিক সমাজ। কিন্তু বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বআরোপিত সেন্সরশিপ। অনেক সাংবাদিক ব্যক্তিস্বার্থের কাছে নীতি ও নৈতিকতা বিসর্জন দিয়েছেন। ফলে সাংবাদিকতায় মূল্যবোধ ও পেশাদারিত্বের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। তাই এখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। তা করতে হলে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে।’

‘সংবাদমাধ্যম, রাষ্ট্র ও রাজনীতি’ শীর্ষক এক একক বক্তৃতায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির অষ্টাদশ মাসিক সাধারণ সভা উপলক্ষে এ বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। সোমবার রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তৃতায় ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সংবাদপত্রের বিকাশ ও সাংবাদিকতার চিত্র তুলে ধরে সমকালের উপসম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের কালাকানুন প্রণীত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। পাকিস্তান আমলে সংবাদপত্র জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পক্ষালম্বন করেছিল। তবে দেশ স্বাধীনের পর সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি।’

‘সংবাদমাধ্যম, রাষ্ট্র ও রাজনীতি’ শীর্ষক এক একক বক্তৃতায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান।

 

তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের দশক বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের যৌবনকাল। বৃহৎ পুঁজি ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রবেশের ফলে এ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এতে সংবাদপত্র বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এখন উদ্বেগের বিষয় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংবাদকর্মীর নিরাপত্তা। আগে সংবাদপত্রের মালিক ছিলেন সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা বা সমাজসেবী। এখন ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা সংবাদমাধ্যমের মালিক। আজকাল সম্পাদকদের পুঁজির স্বার্থের কথা ভাবতে হয়। এখন সংবাদমাধ্যমের বড় চ্যালেঞ্জ নির্ভয়ে সরকার, প্রশাসনসহ নানা ক্ষেত্রের অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরা ও স্বাধীন মত প্রকাশ করা। তবে লাগামহীন স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। কলম আছে বলেই যা খুশি লেখা যায় না।’

জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক তার বক্তৃতায় আরও বলেন, ‘সাংবাদিকরা সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, মাস্তান সবার আক্রমণের নিশানা। গত তিন দশকে দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ জন সাংবাদিক। সব সরকারের আমলেই সাংবাদিকরা হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। তবে হয়রানির রকমফের আছে। এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের হয়রানির সুযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ৪০ জন এবং সে বছরই অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১৫ জন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়েছেন। সংবাদপত্রে স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮০ দেশের মধ্যে ১৪৬। যদিও সরকারের দাবি, সংবাদমাধ্যমের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তার দরকারও নেই। সাংবাদিকেরা স্বআরোপিত সেন্সরশিপে আক্রান্ত।’

এশিয়াটিক সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মেজবাহ উস সালেহীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ। বক্তৃতা শেষে আবু সাঈদ খান দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে