ছয় মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার আবারও কমানো হয়েছে। এর ফলে বিদায়ী বছরের তুলনায় চলতি বছরে এক লাখ টাকা বিনিয়োগে প্রতি মাসে মুনাফা কমবে ১১০ টাকা। গত বছর পরিবার সঞ্চয়পত্রে এক লাখ টাকা বিনিয়োগে পাওয়া যেত ৯৪৪ টাকা। চলতি মাসে বিনিয়োগ করলে পাওয়া যাবে ৮৩৪ টাকা। এর ফলে সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়বে।
আগামী ছয় মাসের জন্য সঞ্চয়পত্রের নতুন মুনাফার হার ঘোষণা করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (ইআরডি)। গতকাল ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মুনাফার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
নতুন হার অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার হবে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন মুনাফার হার হবে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত জুলাই মাসেও মুনাফার হার কমানো হয়েছিল। এখন ছয় মাস পর আবারও কমানো হলো। প্রতি ছয় মাস পরপর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করা হয়।
দেখা যাচ্ছে, কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কম। এ ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ পরিমাণ বা এর কম হলে মুনাফার হার বেশি হবে। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার কমে আসবে। আয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সরকার নিয়মিতভাবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নির্ধারণ করে থাকে।
* সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১০.৫৯% * সর্বনিম্ন মুনাফার হার ৮.৭৪% ► গত বছর পরিবার সঞ্চয়পত্রেএক লাখ টাকা বিনিয়োগে পাওয়া যেত ৯৪৪ টাকা। ► চলতি মাসে বিনিয়োগ করলে পাওয়া যাবে ৮৩৪ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমানোর মূল উদ্দেশ্য ব্যাংকের আমানত বাড়ানো। এ জন্য ব্যাংক আমানতের কাছাকাছি সুদ নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকঋণের সুদ কমে আসবে। যার উপকার পাবে পুরো দেশ। এতে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোয় মধ্যবিত্ত ও অবসরভোগীরা চাপে পড়ে যাবেন। দেশে আর কোনো নিরাপদ বিনিয়োগ পণ্য নেই, এ জন্য এটা তাঁদের জন্য দুঃসংবাদ।
নতুন মুনাফার হার
দেশে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন যত ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এ সঞ্চয়পত্রে এত দিন সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ; এখন তা কমিয়ে করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আগে এক লাখ টাকা বিনিয়োগে যা মিলত, এখন তার চেয়ে ১১০ টাকা কম পাওয়া যাবে।
আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, সেটা কমিয়ে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ করা হয়েছে।
পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পঞ্চম বছর শেষে অর্থাৎ মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফা ছিল ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ; এখন তা করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারও কমানো হয়েছে। এ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এ ছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলেও মুনাফা কমবে। এ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্তিতে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ; এখন থেকে তা হবে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এ ছাড়া ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের আগে ইস্যু হওয়া সব জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের ইস্যুকালীন মেয়াদে ওই সময়ের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। তবে পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুনর্বিনিয়োগের তারিখের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। ছয় মাস পর মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক মূলত দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বিপদের সময় সঞ্চয়পত্র ভেঙে তা সামাল দেয়। আবার প্রতি মাসের সংসার খরচের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আসে।
জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। যদিও কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা ৮-৯ শতাংশের ঘরেই আছে। ফলে সামগ্রিকভাবে নতুন বছরের শুরু থেকে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ আরও বাড়ল। বিশেষ করে যাঁদের পারিবারিক খরচের বড় একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আসে, তাঁরা আরও চাপে পড়বেন।
















