সংকটে পোশাক রপ্তানি

0
45
পোশাক শিল্প

ইতালি এবং ফ্রান্সের দুটি ব্র্যান্ডের কাছে পোশাক সরবরাহ করে রাজধানীর মিরপুরের কালশীর অ্যাডাম অ্যাপারেলস। কারখানাটিতে এত দিন জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন ছিল না। তবু নিয়ম অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য জেনারেটর রাখা আছে। গত মাসে লোডশেডিং শুরু হওয়ার পর এখন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত চলছে জেনারেটর। গড়ে প্রতিদিন ২০০ লিটার ডিজেল পোড়াতে হচ্ছে।

আগে তাদের জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন খরচ ছিল ১৬ হাজার টাকা। জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর ব্যয় বেড়ে ২৫ হাজার টাকায় এসে ঠেকেছে। কারখানাটির মাসে বাড়তি ব্যয় এখন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা। বড় কারখানার ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরও বেশি।

উৎপাদন পর্যায়ে এ খরচের বাইরেও কাঁচামাল আমদানি এবং বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে রয়েছে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের চাপ। অনেক কারখানাই নিজস্ব বাসে শ্রমিকদের আনা-নেওয়া করে থাকে। এ জন্যও গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। অর্থাৎ উৎপাদন এবং রপ্তানির প্রতিটি পর্যায়েই এখন অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু জ্বালানির দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর কারণেই পোশাকের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে অন্তত ২০ শতাংশ। তবে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে পাচ্ছে না কারখানাগুলো। কারণ, এখন উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে এরকম পোশাকের দর নির্ধারণ করা হয়েছে অন্তত দুই মাস আগে। তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী দর নির্ধারণ এবং চুক্তি করা হয়। এখন উৎপাদন এবং সরবরাহের পর্যায়ে এসে নতুন করে দর বাড়ানোর প্রস্তাব করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে লোকসান গুনেই পোশাক উৎপাদন এবং সরবরাহ করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

এর বাইরেও ঝক্কি আছে। নতুন চুক্তির ক্ষেত্রেও এত দিনের দরের চেয়ে বাড়তি দর দিতে রাজি নয় ব্র্যান্ড এবং ক্রেতারা। কারণ, বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা এখন কম। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের জোটগত প্রধান বাজার ২৭ জাতির ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সরকারি তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, জুলাই মাস শেষে জোটে মূল্যস্ম্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এটা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আবার বাংলাদেশের পোশাকের একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ইউএস ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিক্সের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ম্ফীতি এখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ। এটা গত ৪১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রেকর্ড মূল্যস্ম্ফীতির কারণে এসব দেশে পোশাকের চাহিদা কমছেই।

কমছে রপ্তানি :জ্বালানি তেলের দর বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে আসার মতো একাধিক কারণে পণ্য রপ্তানি কমছে। আগামীতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা জোরালো। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, জুলাই মাসে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৯৮ কোটি ডলারের পণ্য। এটা জুনে ছিল ৪৯১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক মাসে রপ্তানি কম হয়েছে ৯৩ কোটি ডলার। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আগামী মাসগুলোতেও রপ্তানি কমে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত। উদ্যোক্তাদের হাতে এখন রপ্তানি আদেশও কম।

রপ্তানি আদেশের গতিবিধি বোঝা যায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) তথ্যে। রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর শুল্ক্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানিতে ইউডি সনদ নিতে হয়। সরকারের পক্ষে বিজিএমইএ এই সনদ দিয়ে থাকে। বিজিএমইএর তথ্য বলছে, জুলাইয়ের চেয়ে আগস্টে ইউডি কম নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। সর্বশেষ গত এক সপ্তাহে অর্থাৎ আগস্ট মাসের ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত ইউডির সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ১১৪টি। আগের মাসের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১৩২। অর্থাৎ সপ্তাহে গড়ে ১ হাজারের মতো ইউডি কমছে এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, ইউরোপ-আমেরিকায় মূল্যস্ম্ফীতি পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। সাধারণ পোশাক কিংবা দামি পোশাক কেনার সক্ষমতা কমছে তাদের। বিশ্ববাজার এবং রপ্তানি আদেশের এ বাস্তবতায় জ্বালানি তেলের ব্যবহার এবং অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণে রপ্তানি আদেশ আরও কমছে। শোরুমে অবিক্রীত পণ্যের স্তূপ পড়ে থাকায় বাড়তি দর দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি জানান, জ্বালানির দর বৃদ্ধির কারণে পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার হিসাব করছে বিজিএমইএ।

উৎপাদন কমেছে এক-তৃতীয়াংশ :দিনে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং এবং জ্বালানি তেলের দর অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। আবার মোট উৎপাদনও কমেছে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ। এ বাস্তবতায় কয়েক দিন আগে ইতালির একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অ্যাডাম অ্যাপারেলসের রপ্তানি আদেশ নিয়ে আলোচনা সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে।

কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল হক মুকুল বলেন, আগের দর থেকে নতুন করে এক সেন্টও বাড়াতে রাজি নয় তারা। হতাশ হয়ে তিনি বলেন, আগামী মাসে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাহ অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, রপ্তানি আদেশ কম থাকা, লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে তাঁর কারখানায় উৎপাদন কম হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ। তিনি বলেন, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের কারণে বিদ্যুতের চেয়ে গ্যাসের অভাব বড় সমস্যা। ডাইং এবং ফিনিশিং কারখানায়ও গ্যাসের প্রয়োজন। দিনে গ্যাসের চাপ থাকছে না। ডাইং ও প্রিন্টিংয়ের মান খারাপ হচ্ছে। এতে পরিত্যক্ত পণ্যের পরিমাণ বাড়ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিজেলে জেনারেটর চালিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে আছেন উদ্যোক্তারা। ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী যেভাবে হোক পণ্য তাঁদের হাতে পৌঁছাতে হবে। এভাবে লোকসান হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানার দীর্ঘদিন লোকসান দেওয়ার সামর্থ্য নেই। দেশের ৮০ শতাংশ কারখানাই এ ধরনের।

তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিক অসন্তোষসহ নানামুখী চাপ তৈরি হবে। রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। অথচ চলতি অর্থবছর ৬৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর বড় অংশই আসবে পোশাক খাত থেকে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি খাত চাপে পড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সময় মতো পণ্য ক্রেতাদের হাতে পৌঁছাতে না পারলে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারাবেন ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া সেই ইঙ্গিতই বহন করে।

স্বস্তি শুধু ডলারের বিনিময় হারে :এত সব প্রতিকূলতার মধ্যেও রপ্তানি খাত টিকে আছে শুধু ডলারের বিপরীতে টাকার মান বৃদ্ধির সুবিধায়। এক বছর আগের তুলনায় বর্তমানে প্রতি ডলারে অন্তত ১০ টাকা বেশি পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কয়েকজন উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, ব্যাংক রেট অনুযায়ী ১ ডলারের বিপরীতে ৯৪ টাকা পাচ্ছেন তাঁরা।

অবশ্য ব্যাংকগুলো ১১০ টাকায় ডলার বিক্রি করে থাকে। খোলাবাজারে দাম উঠেছে ১১৯ টাকা। গত কয়েক মাস ধরে বিনিময় হারের এ সুবিধা পাচ্ছেন তাঁরা। এর বাইরে রপ্তানিতে নগদ সহায়তা হিসেবে প্রায় ৯ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যাচ্ছে। এই দুই অস্থায়ী সুবিধায় ভর করে চলছে রপ্তানি খাতের টেকসই করার প্রচেষ্টা।

আবু হেনা মুহিব

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.