খালেদা জিয়ার অবস্থা সংকটাপন্ন, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

0
36

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবস্থা সংকটাপন্ন। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি বরং মাঝেমধ্যেই অবনতি হচ্ছে। চিকিৎসকরা তার আরোগ্যের বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন খালেদা জিয়ার পরিবার ও দলের নেতাকর্মীরাও।
৭৬ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনায় গতকাল বুধবার বিকেলে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড বৈঠক করে। এতে বোর্ডের আট সদস্যের সঙ্গে আরও পাঁচ চিকিৎসক যোগ দেন।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খালেদা জিয়ার লিভারের ক্ষত সম্পর্কে জানতে কলোনস্কপিসহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য জানান, খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। যা যকৃতের ক্রনিক রোগ। এতে লিভারের সাধারণ আকৃতি নষ্ট হয়। এ কারণে তার অরুচি, ওজন হ্রাস, বমি ভাব বা বমি হচ্ছে। বমি ও মলের সঙ্গে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। জ্বর জ্বর ভাব, শরীরে পানি আসা, খনিজে অসমতা সমস্যা দেখা যায় লিভার সিরোসিসে।

ওই চিকিৎসক সমকালকে জানান, গত সোমবার রাত থেকে খালেদা জিয়া দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকেন। তার দেহে খনিজ অসমতা চরমে পৌঁছেছে। প্রধান ইলেকট্রোলাইট, অর্থাৎ সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম,

পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ক্লোরিন কমে যাওয়ায় শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। মাঝে তা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সোমবার রাত থেকে তা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। কিডনির ক্রিয়েটিনিন বর্ডার লাইন অর্থাৎ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি। তার পরও ডায়াবেটিস ১২-১৩ এর মধ্যে ওঠানামা করছে।

চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে রক্তবমিসহ খালেদা জিয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এতে রক্তে হিমোগ্লোবিন মাত্রাতিরিক্ত কমে যেতে শুরু করে। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক রাখতে জরুরি রক্ত দেওয়া প্রয়োজন হলেও খালেদা জিয়ার শরীর তা গ্রহণের অবস্থায় ছিল না। এতে খালেদা জিয়ার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। পরে রাত ১০টার দিকে তার শরীরে রক্ত দিতে সক্ষম হন চিকিৎসকরা। এর ফলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে আসতে শুরু করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন ডা. এফএম সিদ্দিকী, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ডা. মোহাম্মদ আল মামুন, ডা. আরেফিন আহমেদ, ডা. নিশাত, ডা. ফাহমিদা বেগম ও ডা. মনসিং। ভার্চুয়ালি যোগ দেন দেশি-বিদেশি পাঁচ চিকিৎসক।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত খালেদা জিয়ার অবস্থা আগের মতোই রয়েছে। তিনি কথা বলতে পারছেন। তবে মল ও বমির সঙ্গে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তা বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। খালেদা জিয়ার গলায় সেন্ট্রাল ভেনাস ক্যাথেটার লাইন বা সিভি লাইন লাগানো আছে। বহুবিদ রোগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেই যা লাগানো হয়। কেন্দ্রীয় রক্তনালিকে সংযুক্ত এই লাইনের তিন-চারটি চ্যানেলের মাধ্যমে একসঙ্গে সব ধরনের ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয়।

দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ২৫ মাস কারাগারে ছিলেন খালেদা জিয়া। সে সময়ে তার সুচিকিৎসা না হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয় বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। তবে আওয়ামী লীগ বলছে, সরকার কারাগারে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছে খালেদা জিয়াকে।

বিএনপি ও পরিবার খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে চেষ্টা করছে। আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইনমন্ত্রীর কাছে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দেওয়া স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। খালেদা জিয়ার পরিবারের আবেদনও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের মতামত দেওয়া হবে। তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিএনপি নেতা ও চিকিৎসকদের।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুজব চলছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের অবস্থার অবনতি ঘটলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। নেতাকর্মীরা হাসপাতাল ও দলীয় কার্যালয়ে জমায়েত হতে শুরু করেন। গতকালও এ ধারা অব্যাহত ছিল। বিধিনিষেধ থাকার পরও অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।

দলীয় প্রধানের আরোগ্য কামনায় তারা দোয়া-প্রার্থনা করছেন, অনেকে রোজা রাখছেন। তাকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। গতকাল বুধবার যৌথ বিবৃতিতে সরকারের প্রতি একই আহ্বান জানিয়েছেন দুই হাজার ৫৮২ জন সাংবাদিক।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক নজরদারি ও সেবা দিচ্ছেন। সরকার গত তিন বছরে তাকে চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। সরকার গণতন্ত্রকে হরণ করতে খালেদা জিয়ার মতো ক্যারিশম্যাটিক নেত্রীকে বন্দি করে রেখেছে। তাকে নিয়ে একটি মহল গুজব ছড়াচ্ছে। গুজবে কান না দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন বিএনপি মহাসচিব।

খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিদেশে পাঠানো খুবই জরুরি। সরকারের কাছে আকুল আবেদন করছি- যদি নমনীয় হয়ে অনুমতি দেয়, তাহলে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব। বহু বছর জেলে তিনি চিকিৎসা পাননি। এ কারণে তার রোগ বেড়েছে। নতুন রোগ রয়েছে। গুজবে কান না দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন খালেদা জিয়ার বোন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে