শীতকে কিভাবে স্বাগত জানাবেন

0
1478
প্রকৃতির পাশাপাশি শীতের আগমনী বার্তা এখন অনুভূতিতেও। শীতকালে প্রতিদিনের অভ্যাসে, জীবনযাপনে আসে পরিবর্তন । মডেল: শ্রাবণ্য তৌহিদা
আমাদের দেশে শীত খুব কম সময়ের জন্য আসে। শীতের পাখির মতো শীতকালও যেন এ দেশে এক বিশেষ অতিথি। বাইরে গরম থাকলেও শীতের কুয়াশার প্রথম চিহ্ন দেখলে আলমারি থেকে গরম কাপড় বের করে স্বাগত জানাই শীতকে। জীবনযাপনে শীত নিয়ে থাকে আবেগ, চলতে থাকে প্রস্তুতি। লিখেছেন ইরেশ যাকের

 

সম্প্রতি নেপাল থেকে ঘুরে এলাম। ওখানে অনেক ঠান্ডা। সূর্যাস্তের পর আর বাইরে থাকা যায় না। ঠান্ডায় রক্ত জমে যায়। তবে ওখানকার অনুভূতি দেশে শীতের অনুভূতির মতো নয়। শীতের অনুভূতি বলতে আমরা যা বুঝি, তার সঙ্গে ঠান্ডার একটা সম্পর্ক থাকলেও ঠান্ডা আর শীত হয়তো এক নয়। আমার কাছে শীত একধরনের আবেগ। অথবা হয়তো অনেক ধরনের আবেগের সংমিশ্রণ। ঠান্ডা না পড়লেও শীতের আবেগ আমি অনুভব করি।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন বাইরে বেশ গরম। হালকা ঘেমে গিয়েছিলাম বলে ফ্যানটা বাড়াতে হলো। কিন্তু বাইরে তাকালে মনে হয় শীত চলে এসেছে। একধরনের লাজুক ধূসরতায় ছেয়ে গেছে চারদিক। এই ধূসরতা হৃদয়বিদারক এক অজানা আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। যেন আমার সব স্মৃতি, সব খিদে খুব কাছে কোথাও লুকিয়ে আছে। নাগালের বাইরে, দৃষ্টির বাইরে। খুব কাছে থেকেও যেন যোজন যোজন দূরে।

শ্রাবণ্য তৌহিদা। হালকা শীতের বিকেল বা সন্ধ্যায় একটা হালকা চাদর দেবে উষ্ণতা

শীত আমাদের এখানে খুব কম সময়ের জন্য আসে। শীতের পাখির মতো শীতকালও যেন আমাদের এই দেশে এক বিশেষ অতিথি। অতিথি বেশি দিন থাকে না বলেই অতিথির জন্য সব ব্যবস্থা আমরা খুব আগ্রহ নিয়েই করি। বাইরে গরম থাকা সত্ত্বেও শীতের কুয়াশার প্রথম চিহ্ন দেখলে আলমারি থেকে গরম কাপড় বের করে ফেলি। সকালবেলা যদি মনে হয় তাপমাত্রা দু–এক ডিগ্রি কম, তাহলে গায়ে সোয়েটার, জ্যাকেট চাপাই। অক্টোবর মাস শেষ হতে হতেই আমরা শীতের চিহ্ন খুঁজি। শীত যেন দূরদেশ থেকে আসা খুব প্রিয় এক আত্মীয়। মনে হয়, কেন আসছে না। এলে মনে হয়, কেন তার এত জলদি চলে যেতে হবে।

প্রকৃতিও যেন শীতকে একজন বিশেষ অতিথি হিসেবেই দেখে। শীতকে স্বাগত জানাতে নিয়ে আসে খেজুরের রস, নতুন সবজি, আরও কত কিছু। শীতের আগমন উপলক্ষে প্রকৃতির উপহার আমরা দুহাত বাড়িয়ে বুকে তুলে নিই। নতুন ফুলকপি আর মটরশুঁটি দিয়ে রুই মাছ খেতে খেতে সাধারণ নৈশভোজকেও উৎসবের মতো মনে হয়। শীতের রাতে এক কাপ চা মনে হয় অনেক দিনের অপেক্ষার পর পাওয়া কোনো স্বর্গীয় পানীয়।

সব উৎসব এবং ভালো লাগার মধ্যেও কেন জানি শীতে আমার মধ্যে এক মারাত্মক আকুলতার উদয় হয়। আকুলতাটা বেশির ভাগ মানসিক। শীতের রাতে যখন ট্রেনের বাঁশি শুনি অথবা হিমেল হাওয়ায় সোডিয়াম বাতির হলুদ ভাসতে দেখি, মনের গহিনে থাকা অনেক স্মৃতি বেরিয়ে আসে। এমনভাবে বেরিয়ে আসে যে মনের মধ্যে এক পরম বেদনার জন্ম হয়। যেন শীতের মতোই প্রিয় স্মৃতিগুলো, স্মৃতির মানুষগুলো খুব কম সময়ের জন্য আমার কাছে এসেছে। আবার কবে আসবে অথবা আদৌ আসবে কি না, কে জানে। অনেক দিনের হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা, মুহূর্তের কথা, জায়গার কথা যখন অকস্মাৎ মনে আসে, তখন ইচ্ছে করে শীতের রাতে গরম চাদরের মতো স্মৃতিগুলোকেও জাপটে ধরে রাখি। আর কখনো যেন হারিয়ে না যায়।

আমার জন্য অবশ্য এবারের শীত অন্যবারের মতো হবে না। আমি ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছি। এত দিন ছিল শীত অতীত এবং এখনকার ভাবনা নিয়ে ভরপুর। বাবা হওয়ার পর মনে হচ্ছে, শীত আসছে এখন এবং আগামীর জন্য। আগে যে রকম ঠান্ডার বিষয়টি খুব মজা লাগত। এখন একটু ভয় লাগছে। আমার মেয়ে তো কখনো ঠান্ডা অনুভব করেনি। সে ঠান্ডাকে মোকাবিলা করতে পারবে তো? অবশ্য নেপালে গিয়ে মনে হলো যে ঠান্ডার মুখোমুখি সে বেশ দাপুটে। গরম কাপড় পরার ব্যাপারে অভ্যস্ত না বলে মোটা কোট বা চাদর পরানোর পর একটু আপত্তি করেছে। কিন্তু সেটা খুব যে চিন্তার বিষয় হবে, সে রকম বলে মনে হয়নি।

এখন ভাবি, ওর জন্য আগামী শীতগুলো কেমন হবে? ও একটু বড় হলে ওকে নিয়ে কোথায় কোথায় যাব। ছোটবেলায় শীত এলেই আমরা চিড়িয়াখানায় যেতাম। আমার মেয়ে শীতের দুপুরে হাতির পিঠে চড়বে। শীত এলে বাবা আমাদের গ্রামে নিয়ে যেত। শীতের দিনে গ্রামে খেজুরের রস খাওয়া, খেতের মধ্যে দৌড়ে বেড়ানো আমার পুরোনো এবং মধুর স্মৃতি। আমার মেয়েকে সেই স্মৃতি দিতে চাই। ও যখন আরেকটু বড় হবে। ও আর আমি ব্যাডমিন্টন কোর্ট কাটব। আমরা ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট খেলব। প্রথমে আমি জিতব অথবা আমি ওকে জিততে দেব। পরে ও নিজের জোরেই আমাকে হারাবে। হয়তো ওর একটু খারাপ লাগবে যে বাবা ওর সঙ্গে খেলায় আর পারছে না।

ও যখন আরেকটু বড় হবে, তখন পিকনিকে গিয়ে বরইগাছে চড়ে বরই পাড়তে চাইবে। ওর মা হয়তো মানা করবে। আমি বলব, চড়তে দাও। এরপর বরইয়ের কাঁটায় ব্যথা পাওয়ার পর বাবা–মেয়ে দুজনই মায়ের কাছে বকা খাব। পরে হয়তো ও নিজেই বন্ধুদের সঙ্গে শীতে কোথাও যেতে চাইবে। আমি চিন্তা করব। প্রথমে ইচ্ছা না করলে পরে যেতে দেব। সারাটা দিন দুশ্চিন্তায় কাটবে। পরে যখন ও ঠিকঠাক বাসায় ফিরবে, তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচব।

শীতের কিছু বিশেষ গান আমার শুনতে ভালো লাগে। সেই গানগুলো আমার মেয়েকে শোনাব। হয়তো ওর সব গান ভালো লাগবে না। তত দিনে আরও নতুন নতুন গান বের হয়ে যাবে। ও সেই গান আমাকে শোনানোর চেষ্টা করবে। শীতের রাতে ড্রাইভে বের হয়ে কোন গান শুনব, তা নিয়ে বাবা–মেয়ের মধ্যে মনোমালিন্য হবে। একসময় হয়তো আমি হার মেনে নেব। ও বলবে, থাক বাবা, তোমার গানটাই দাও।

আমার মামণি বড় হতে হতে এ রকম আরও কত শীতের স্মৃতি তৈরি হবে। একদিন হয়তো সে–ও আমাকে এসে বলবে, ‘বাবা, মনে আছে?’

আগামী দিনের উৎসবেও শীতের স্মৃতির মিষ্টি কোনো বেদনা পিছু ছাড়বে না।

অতীতের আকুলতা আর আগামীর সব সৌন্দর্যের সোনালি সংমিশ্রণেই মধুর হোক আমাদের সবার শীতকাল।

লেখক:  ইরেশ যাকের, অভিনেতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে