শরৎ উদ্‌যাপন

0
920
কাশবনের শুভ্রতা জানান দেয় শরৎ এসেছে প্রকৃতিতে, তার ছোঁয়া থাকল না হয় পোশাকে। মডেল: সায়রা, পোশাক: মার্জিন, সাজ: মিউনিস ব্রাইডাল,
নদীর ধারে কাশফুল ফোটার যে বর্ণনা সাহিত্যে, সে শরৎকালের কল্যাণেই। কিংবা ‘নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা’ এটাও তো শরতের জন্য। বাঙালিজীবনে শরতের উদ্‌যাপন ভালোই হয়। এমনকি শহুরে জীবনেও। পোশাকে নীল–সাদা, কাশবনে বেড়াতে যাওয়া, অন্দরে শিউলির আমেজ—শরৎ মিশে আছে আমাদের জীবনযাপনে।

‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা—

নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা॥’

শরৎকাল যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কতটা কাছের ছিল, সেটা বোঝা যায় তাঁর অজস্র লেখায়। প্রকৃতিকে নতুন করে দেখার বেলা যেন শরৎ। বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গেও দারুণভাবে জড়িয়ে আছে ষড়ঋতুর এই রানি। বাঙালির দিনযাপনে শরৎ আসে নানাভাবে, নানা আবেগ নিয়ে।

নদীর ধারে কাশফুল ফোটার যে বর্ণনা সাহিত্যে এসেছে, সে তো এই শরতের কল্যাণেই। ‘নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা’—এটাও তো শরতের জন্যই। একটানা বর্ষার পর, থেকে থেকে মেঘ-বৃষ্টির যে লুকোচুরি খেলা, তার তুলনা খুঁজতে যাওয়া বোকামি।

এক গোছা কাশফুল ঘরে এনে দেবে শরতের ছোঁয়া। পোশাক অরণ্য

হঠাৎ করেই এই সময়ে মন কেমন করা এক বিকেলে বেরিয়ে পড়তে পারেন নদীর ধার বা খোলা প্রান্তরে ফোটা কাশবনে। গ্রামে তো বটেই, শহুরে জীবনেও এই কাশবন পাবেন হাত বাড়ালেই। যদি ঢাকা শহরের কথা বলি, তাহলে উত্তরার দিয়াবাড়ি, মিরপুর, আফতাবনগর বা কেরানীগঞ্জে গেলেই দেখা পাবেন কাশবনের। হয়তো সেখানে বকের সারি মিলবে না, তবে কাশবনে বৃষ্টি কিন্তু আসতেই পারে। তাই ফররুখ আহমদের ‘বৃষ্টির গান’ ছড়াটির কথা মাথায় রাখলেও ছাতা নিতে ভুলবেন না। হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজতেও পারেন এক বেলা। তবে বৃষ্টির পর ভেজা মাথা মোছার জন্য একটা রুমাল বা তোয়ালে সঙ্গে রাখতে পারেন। কারণ, এই সময়ে বৃষ্টির পর ঝলমলে আকাশে যে রোদের দেখা পাবেন, সেটাও তো দেখার মতো। এই রোদের বর্ণনা দিতে আবারও রবীন্দ্রনাথের কাছে ফেরা, শরৎকালের রোদ নিয়ে তিনি বলছেন, ‘…এই প্রথম বর্ষা অপগমে প্রভাতের প্রকৃতি কী অনুপম প্রসন্ন মূর্তি ধারণ করে। রৌদ্র দেখিলে মনে হয় যেন প্রকৃতি কী এক নূতন উত্তাপের দ্বারা সোনাকে গলাইয়া বাষ্প করিয়া এত সূক্ষ্ণ করিয়া দিয়াছেন যে, সোনা আর নাই কেবল তাহার লাবণ্যের দ্বারা চারি দিক আচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে।’

সকালে ঝরা শিউলিও মনে করিয়ে দেয় শরতের কথা

বর্ষার মতো শরৎকালজুড়ে ফ্যাশন হাউসের তাক দখল করে রাখে নীল রঙের পোশাক। অবশ্য নীলের সঙ্গে সাদাও যুক্ত হয়। অঞ্জনসের সহ–ব্র্যান্ড আর্ট অব ব্লু। যেখানে সব ধরনের পোশাকেই নীলের ছোঁয়া। শরৎ উপলক্ষেও সেখানে এসেছে নতুন নকশার পোশাক। অঞ্জনসের প্রধান নির্বাহী শাহিন আহম্মেদ জানান, ‘পোশাকের সঙ্গে প্রকৃতির ঘনিষ্ঠতা সবচেয়ে বেশি। কারণ, ঋতু ধরেই যেমন সবাই পোশাক পরতে ভালোবাসেন, তেমনি ডিজাইনাররাও পোশাক বানান সময়কে মাথায় রেখে। পোশাকের রং হিসেবে শরৎকালে সাদা-নীলের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। কারণ, এই সময়ে প্রকৃতিতে সাদা-নীলের আধিক্য থাকে। সেটা পরিষ্কার হয় ঝকঝকে নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, দুধসাদা কাশফুল বা শিউলির দিকে তাকালেই।’

আর তাই মেয়েদের টপ, কামিজ বা তুলতুলে নরম শাড়িতে সাদা-নীলের মেলবন্ধন চোখে পড়বে এখন।

নাইওর যাওয়ার উপযুক্ত সময়ও কিন্তু এই শরৎকাল। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের কারনে হয়তো সারা দেশে নাইওর শব্দটির সঙ্গে এই প্রজন্মের পরিচয় কম। তবে যেসব অঞ্চল এখনো পানি–অধ্যুষিত হাওর, বাঁওড় বা বিল-ঝিলে ঘেরা, সেখানে নাইওর প্রচলিত একটি শব্দ। বিবাহিত নারীর স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়াই হলো নাইওর যাওয়া। আবার কৃষিপ্রধান এই দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে শরৎকালে নতুন বিবাহিত নারীদের বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রচলন ছিল। বিশেষ করে পুরো ভাদ্র মাস বাপের বাড়িতে কাটাতেন নারীরা। কবি জসীমউদ্‌দীনের নক্সীকাঁথার মাঠ কাব্যগ্রন্থেও বিষয়টির বর্ণনা আছে।

পোশাক অরণ্য

শরতের রাতে ফোটা শিউলি ফুল ভোরবেলাতেই মিলিয়ে যায়। বলা ভালো ঝরে পড়ে। সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে থাকা শিউলি ফুল কুড়িয়ে আনার অপার আনন্দ যে অন্য কিছুতে মেলে না, সেটা এই মজা যে পেয়েছে, সে-ই জানে। বিশেষ করে বাঙালির কাছে এর যে আবেদন, সেটা বলিউডে তৈরি হওয়া অক্টোবর সিনেমা দেখলেও বুঝবেন। খোদ বলিউডে বসে বাঙালি পরিচালক সুজিত সরকার তাঁর চলচ্চিত্রে শিউলি ফুলের সঙ্গে অক্টোবর মাসকে মিলিয়ে বানালেন মন কেমন করা এক চলচ্চিত্র। জীবনের সঙ্গে প্রকৃতিকে মিলিয়ে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো বাঙালি পরিচালকের পক্ষেই সম্ভব। না দেখা হলে, এই শরতে ঘরে বসেই দেখতে পারেন সিনেমাটি।

আপনার প্রিয় অন্দরও সেজে উঠতে পারে শরতের বর্ণে-গন্ধে। বাইরে যখন কাশফুল বা শিউলির মাখামাখি, সেটা না হয় শোভা পেল অন্দরে। ফুলদানি বা মাটির পাত্রে সাজিয়ে রেখে দিতে পারেন ঘরের এক কোণে। অ্যাস্থেটিকস ইন্টেরিয়রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাবিহা কুমু বলেন, ‘ঘরের অন্দরে শরতের আবহ আনা মানেই মৌসুমি ফুলগুলো অন্দরে সাজিয়ে–গুছিয়ে রাখা। একটা কাঠ বা বাঁশের লম্বা ফুলদানিতে রাখতে পারেন কাশফুল। কাচের ফুলদানি হলে সেটা উজ্জ্বল রঙের বেছে নিন। যেমন লালচে ফুলদানিতে সাদা কাশফুল ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে পারে।’ জানালেন, সেন্টার টেবিল বা ঘরের এক পাশে রাখা যায় কাশফুল, সঙ্গে কিছু চিকন সবুজ পাতা বা ঘাস। মাটির পাত্রে পানি দিয়ে তার ওপরে ভাসাতে পারেন শিউলি ফুল। এই রাখা যায় খাবার টেবিল বা সেন্টার টেবিলের মাঝখানে। একটা মিষ্টি সুবাস আর স্নিগ্ধতা এনে দেবে ঘরে। এ ছাড়া জানালার পর্দা ও সোফার কুশন কাভার হতে পারে সাদা বা হালকা নীল রঙের।

শরতে মাঠজুড়ে থাকে কচি সবুজ ধানের সমারোহ। সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কচি সবুজ ধানের ওপর যে শিশির জমে, সেটাও তো দেখার মতো দৃশ্য।

শরৎ ছুঁয়েছে নীল–সাদা শাড়ি। পোশাক: আর্ট অব ব্লু

এই বেলাতেও সেই রবীন্দ্রনাথে ধরনা দিলে পরিবেশটা বোঝানো সহজ হবে, কবি লিখেছেন—

‘এসেছে শরৎ, হিমের পরশ

লেগেছে হাওয়ার ’পরে,

সকাল বেলায় ঘাসের আগায়

শিশিরের রেখা ধরে।…’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে