লিডারসহ বখাটে গ্রুপের ২২ জন আটক

0
265
গ্যাং গ্রুপ নিয়ে সমকালে রিপোর্ট প্রকাশের পর রোববার মোহাম্মদপুরে ব্লকরেইড দিয়ে 'লাড়া দে' গ্রুপের প্রধান তামিমুর রহমান মীমকে আটক করে পুলিশ । সংগৃহীত

ঢাকার মোহাম্মদপুর ও আদাবরকেন্দ্রিক বখাটে গ্যাং গ্রুপের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।

গতকাল রোববার দুপুরে বাঁশবাড়ি এলাকায় ব্লকরেইড দিয়ে আটক করা হয়েছে গ্যাংস্টার গ্রুপ ‘লাড়া দে’র লিডার তামিমুর রহমান মীম ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড নাঈমকে। এ ছাড়া গ্যাং গ্রুপ ‘লেভেল হাই’সহ আরও কয়েকটি গ্রুপের ২০ জনকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ।

গতকাল রাত ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে মোট ২২ জন। আটকদের ব্যাপারে আরও যাচাই-বাছাইয়ের পর গ্রেফতার দেখিয়ে মামলা করা হবে। গতকাল সমকালের প্রথম পাতায় ‘ঢাকায় বখাটেদের ৩২ গ্রুপ, ওরা নয়ন বন্ডের চেয়ে দুর্ধর্ষ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপরই গ্যাং গ্রুপের সক্রিয় সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত অ্যাকশনে নামে পুলিশ।

এদিকে, প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনুসন্ধান করে সব গ্যাং গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে লিখিত নির্দেশনা জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনা গতকালই পুলিশের সব ক্রাইম বিভাগে পাঠানো হয়।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘ঢাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় উঠতি কিশোর-তরুণরা গ্যাং গ্রুপ তৈরি করেছে।

মাদক ব্যবসা, ইভটিজিং ও খুনের মতো অপরাধে তারা জড়াচ্ছে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব বখাটে তরুণ-কিশোরকে সংশোধনের জন্য অভিভাবকদের বড় ভূমিকা আছে। গ্যাং গ্রুপ পরিচালনার সঙ্গে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না।’

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি আনিসুর রহমান বলেন, মোহাম্মদপুর ও আদাবরকেন্দ্রিক গ্যাং গ্রুপের ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ‘লাড়া দে’ গ্রুপের প্রধান মীমও রয়েছে। যে অভিভাবক তার সন্তানদের শোধরাতে ভূমিকা রাখবেন না, তারা এলাকায় থাকতে পারবেন না। বখাটে সন্তানরা এলাকা কলুষিত করবে, এটা হতে দেওয়া যাবে না। সোমবার মোহাম্মদপুরের সোনালী সংঘ মাঠে কমিউনিটি পুলিশের সভা ডাকা হয়েছে। সেখানে এলাকাবাসী তাদের মতামত তুলে ধরবে। পুলিশের কোনো সদস্য যদি গ্যাং গ্রুপকে সহায়তা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ডিসি আনিসুর রহমান আরও বলেন, ‘কীভাবে দীর্ঘদিন মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন সড়কে গ্যাং গ্রুপ দেয়ালে দেয়ালে লিখে ও নানা বেআইনি কাজে জড়িয়ে এলাকায় এক ধরনের ভীতিকর অবস্থা তৈরি করেছে, সমকালে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে জড়িতদের বিরুদ্ধে অনেক তথ্য উঠে এসেছে। তাই দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া গেছে। গ্যাং গ্রুপের বিরুদ্ধে এমন অভিযান চলমান থাকবে।’

জানা গেছে, রোববারের অভিযানে মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকা থেকে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা হলো- ‘লাড়া দে’ গ্রুপের লিডার মীম ও তার সহযোগী নাঈম, জিসান, অভিক, বিচি হৃদয়, লেভেল হাই গ্রুপের প্রধান মানিক, শাকিল, রায়হান। বাঁশবাড়ি এলাকা থেকে গ্রেফতারের পরপরই মীমের মাথায় বুলেটপ্রুফ হেলমেট ও হাতকড়া পরানো হয়। এ সময় তার পরনে ছিল কালো প্যান্ট ও সাদা গেঞ্জি। এ ছাড়া গতকাল সকাল থেকেই মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় টহল দেয় পুলিশ। তাই কোনো সড়কে বখটেদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

মোহাম্মদপুর এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, ঈদের আগে গ্যাং গ্রুপের সদস্যদের গ্রেফতার করায় এলাকার সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবেন। কারণ, প্রায় প্রতিদিন দিনদুপুরে এসব গ্যাং পার্টির সদস্যরা ছিনতাই ও চুরি করে আসছিল। এতে তাদের সহায়তা করছিল কয়েকজন অসাধু পুলিশ সদস্য। গ্যাং পার্টির সক্রিয় সদস্যরা গ্রেফতার হওয়ায় এখন চুরি, ছিনতাই ও মাদক কারবারে জড়াতে সাহস পাবে না তারা।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকায় গ্যাং গ্রুপ তাদের বখাটেপনা চালিয়ে গেলেও পুলিশ ছিল নির্বিকার। কোথাও কোথাও পুলিশের অসাধু সদস্যরা গ্যাং গ্রুপ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সহায়তা করে আসছিল। অভিযানে বখাটে কিশোর-তরুণদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পুলিশের কারা-কীভাবে তাদের সহায়তা করেছে, বেরিয়ে আসবে তা।

‘লাড়া দে’ গ্রুপের সদস্য সংখ্যা তিন শতাধিক। ফেসবুকেও গ্রুপ রয়েছে তাদের। এ গ্রুপের অধিকাংশের বয়স ১২-৩০ বছরের মধ্যে। ‘লাড়া দে’ নামের অর্থ বলতে তারা বোঝাচ্ছে ‘নাড়িয়ে দেওয়া’ বা ‘ঝাঁকুনি দেওয়া’। এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে তামিমুর রহমান মীম। তার বাবা একরামুল। মীমের বাসা মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি এলাকায়। তবে মীম বর্তমানে নবোদয় হাউজিংয়ের লোহার গেট এলাকায় বসবাস করে আসছিল। তার নামে মাদক ব্যবসা, ছিনতাইয়ের একাধিক অভিযোগ ও মামলা রয়েছে।

পুলিশকে ৯ নির্দেশনা : গ্যাং গ্রুপ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডিএমপির সব ইউনিটকে ৯টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাং গ্রুপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত বিষয়বস্তু অনুসন্ধান করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো এলাকায় গ্যাং কালচারের অস্তিত্ব থাকলে নিতে হবে অনুসন্ধানপূর্বক দৃশ্যমান ব্যবস্থা। উঠতি কিশোর-তরুণদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট প্রদানের জন্য বিট অফিসারদের দায়িত্ব দেওয়া। কোনো গ্যাং কালচার সম্পর্কে তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে বিট অফিসারের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে উঠতি অপরাধীদের সখ্য থাকলে অনুসন্ধানমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, অধীনস্থ এলাকায় মাদক ব্যবসা বন্ধ, ইভটিজিং প্রতিরোধ, গ্যাং গ্রুপের দেয়াললিখন অপসারণ ও অপরাধপ্রবণ তরুণ-কিশোরদের সংশোধনে অভিভাবকদের সমন্বয়ে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে