লাখ ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু জ্বরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা

0
211
ডেঙ্গু মশা।

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। এর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। শুধু তা-ই নয়, কোনো একটি রোগে আক্রান্ত হয়ে এত বেশি মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ইতিহাস বাংলাদেশে নেই। এবারই প্রথম ঢাকাসহ ৬৪ জেলায় এ রোগ ছড়িয়েছে।

তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর তুলনায় প্রকৃত রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সব রোগী যেমন চিকিৎসকের কাছে আসে না, তেমনি চিকিৎসকের কাছে আসা সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতেও বলা হয় না। ঠিক কত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান তো দূরের কথা, অনুমিত সংখ্যাও সরকারের কোনো দপ্তর দিতে পারছে না।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কত মানুষ মারা গেছে, তারও সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় তিন শ। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, এ বছর ১০৭টি মৃত্যু নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গুতে হয়েছে। এই সংখ্যাও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড।

সাধারণত মে-জুন থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়। এখন অক্টোবর শেষ হতে চললেও ডেঙ্গু থামেনি। এই পরিস্থিতি কত দিন চলবে, তা কেউ বলতে পারছে না। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দুজন প্রধান কর্মকর্তা রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তহমিনা এবং আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা একই সঙ্গে দেশের বাইরে আছেন। দুই দপ্তরের অন্য কেউ ডেঙ্গু বিষয়ে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতায় দুই সপ্তাহের বিশেষ কর্মসূচি চলছে। এই কার্যক্রম বছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনার অংশ। দেশের অন্য কোথাও মশা নিয়ে কোনো কাজের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। কীটতত্ত্ববিদেরা আশঙ্কা করছেন, আগামী বছর সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ এ বছরের চেয়ে বেশি হতে পারে।

ডেঙ্গু রোগী লাখের বেশি
গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঢাকা শহরের ১০ সরকারি,২টি স্বায়ত্তশাসিত ও ২৯টি বেসরকারি হাসপাতাল এবং ঢাকার বাইরের ৬৪ জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৯৫ হাজার ৬২০ রোগী ভর্তি হয়। হাসপাতাল ছেড়েছে ৯৪ হাজার ৪৩৭ জন।

এর বাইরে গতকাল ছয়টি বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নেওয়া হয়েছে । জানা গেছে, এসব হাসপাতালে জুন থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৪১৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালগুলো হলো ইবনে সিনার কল্যাণপুর শাখা (রোগী ১,১৭৫), আল-হেলাল হাসপাতাল (৯৩০), এএমজেড হাসপাতাল (৬৫৭), সিটি হাসপাতাল (১,১৩৭), জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল (১০৪) ও কেয়ার (৪১৩)।

এই হিসাব অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ জন রোগী ভর্তির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে তিন শ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে। এখানে মাত্র ৩৫টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

১৯৯৯ সাল থেকে নিয়মিত ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগী ভর্তির দরকার হয় না, ভর্তি করা হয় না। যেসব রোগীর অবস্থা খারাপ, রক্তে প্লাটিলেট কমে যায় বা ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য রোগ থাকে, কিংবা গর্ভবতী নারীর ডেঙ্গু হলে আমরা ঝুঁকি নিতে চাই না। এসব রোগীকেই ভর্তি করানো হয়।’

সরকারি হিসাবে বিএসএমএমইউতে এ বছর ১ হাজার ৬০৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার। একইভাবে ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, সোহরাওয়ার্দীসহ সব সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে ডেঙ্গু রোগীরা চিকিৎসা নিয়েছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা কেউ গণনা করেনি।

মৃত্যুর সংখ্যা কত
প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম এ বছর ডেঙ্গুতে প্রায় ৩০০ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে। কিন্তু সরকার বলছে, মৃত্যু কম।

সাধারণত মে-জুন থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়
এখন অক্টোবর শেষ হতে চললেও ডেঙ্গু থামেনি
ডেঙ্গুতে কত মানুষ মারা গেছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই
সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য আর দেওয়া হচ্ছে না

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য নিয়মিত সরবরাহ করলেও মৃত্যুর তথ্য দেয় আইইডিসিআর। আইইডিসিআর বলছে, তারা এবার ডেঙ্গু সন্দেহে ২৪৮ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭১টি মৃত্যু পর্যালোচনা করে ১০৭টি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

মৃত্যুর এই সংখ্যাও রেকর্ড। এর আগে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ২০০০ সালে, ৯৩ জন। তবে সে সময় মৃত্যু পর্যালোচনায় কোনো কমিটি ছিল না।

ডেঙ্গু থামেনি
গতকাল নতুন ২৪৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ১০৪ জন, ঢাকার বাইরে ১৪৪ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বলেছিলেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসবে।

কিন্তু অক্টোবর শেষ হতে চললেও ডেঙ্গু থামেনি। অনেকে বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না বলে ডেঙ্গুও থামছে না। চলতি মাসে প্রতিদিন আড়াই শর বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় তিন গুণের বেশি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে