রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি হতাহতদের পরিবারের

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

0
339
নিহত লিটন মুন্সীর স্ত্রী ও মেয়ে

আমার প্রথম জন্মদিন ছিলো ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর। মায়ের মুখে শুনেছি, বাবা ঢাকা থেকে নতুন জামা নিয়ে আসবে। সেই জামা পরে কেক কাটা হবে। কিন্তু বাবা আর ফিরে আসেননি। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আমার বাবা মারা যান। তখন হয়তো কিছুই বুঝিনি। আস্তে আস্তে বড় হওয়ার পর সব বুঝতে পেরেছি।

বাবাকে নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামের যুবলীগ নেতা নিহত লিটন মুন্সির মেয়ে নুসরাত জাহান মিথিলা।

মিথিলা বলেন, এ বছর ১ সেপ্টেম্বর আমার ১৫ বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু এতো বছর পার হলেও বাবাসহ বহু মানুষের অকাল মৃত্যুর কোনো বিচার হয়নি। আজও অপরাধীরা এই দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই সরকারের কাছে আমার একটাই দাবী, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অপরাধীদের রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। তাহলে এই ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের আত্মা শান্তি পাবে।

ওইদিন হামলায় লিটন মুন্সিসহ মাদারীপুরের আরও তিনজন নিহত হন। নিহত শ্রমিক লীগ নেতা নাসির উদ্দিনের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কয়ারিয়া ইউনিয়নের রামপোল গ্রামে। নাছিরউদ্দিন থাকতেন ঢাকার হাজারীবাগে। তিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এক সময়ে হাজারীবাগের শ্রমিক লীগের সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

গ্রেনেড হামলায় নিহত যুবলীগ নেতা মোস্তাক আহম্মেদ ওরফে কালা সেন্টুর বাড়ি কালকিনি উপজেলার ক্রোকিরচর গ্রামে। গ্রেনেড হামলায় অন্যদের মধ্যে নিহত সুফিয়া বেগমের বাড়ি রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের মহিষমারি গ্রামে। ওইদিন নারী নেত্রীদের সঙ্গে প্রথম সারিতেই ছিলেন সুফিয়া। নিহত সুফিয়া সপরিবারে ঢাকায় থাকতেন।

অন্যদিকে কালকিনি পৌরসভার বিভাগদী গ্রামের মোহাম্মাদ আলী হাওলাদারের ছেলে হালান হাওলাদার গ্রেনেড হামলায় আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় থাকেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে হালান হাওলাদার বলেন, ২১ আগস্ট আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য শুনতে যাই। হাজারো মানুষ ঠেলে ঠেলে মঞ্চের খুব কাছাকাছি আসতেই বোমার বিকট শব্দ হয়। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখনও দুই হাত পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক স্প্লিন্টার নিয়ে যন্ত্রণায় বেঁচে আছি।

কালকিনির ঝাউতলা গ্রামের ওয়াহেদ সরদারের ছেলে সাইদুল হক সরদার শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে যন্ত্রণাকর জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে চোখে ঝাপসা দেখছেন। বাঁচার তাগিদে বিভিন্ন কাজকর্ম করেও ভালো কিছু করতে না পারায় মালোশিয়ায় যান। শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে বিদেশ গেলেও শরীরে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে সেখানেও কিছু করতে পারেননি। ফিরে আসতে হয়েছে দেশে।

আহত সাইদুল হক সরদার বলেন, সমাবেশ শুরু হয়। আমি ছিলাম অনেক পেছনে। শেখ হাসিনাকে দেখার জন্য আস্তে আস্তে মঞ্চের ১০ থেকে ১২ হাত দূরত্বে চলে আসি। দাঁড়িয়ে মন দিয়ে নেত্রীর বক্তব্য শুনতে থাকি। বক্তব্য প্রায় শেষ। এরইমধ্যে বোমা ফাটানোর শব্দ। পরপর দুটি বোমা বিস্ফোরণের শব্দ পেলাম। চারদিকে কালো ধোঁয়া। মানুষজনের আর্তনাদ। চিৎকার আর চিৎকার। ছোটাছুটি। আমিও কোনো কিছু না বুঝে দৌঁড় দিতে যাবো। ঠিক তখনি তৃতীয় বোমাটি বিস্ফোরণ হয়। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। বুঝতে পারি অসংখ্য মানুষ আমার শরীরের উপর দিয়ে যাচ্ছে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ভাবিনি বেঁচে যাবো।

সাইদুল বলেন, সারা শরীরে যন্ত্রনা বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনও রায় কার্যকর হয়নি। আমি দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি জানাই।

এছাড়াও গ্রেনেড হামলায় কালকিনির কৃষ্ণনগর গ্রামের কবির হোসেনের ডান হাত বাঁকা হয়ে গেছে। তিনি ঢাকার এক বস্তিতে থাকেন। সেখানে দিনমজুরের কাজ করেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে