রাজবন বিহারে ৪৬তম দানোত্তম কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান

0
1356
কঠিন চীবর উৎসর্গকালে রাজা দেবাশীষ রায় ও রাণী ইয়েন ইয়েন।

রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে ৪৬তম দানোত্তম কঠিন চীবর দান দেশ বিদেশের ভিক্ষুসংঘ ও পূণ্যার্থীদের অংশ গ্রহণে মহাসমারোহে উদযাপিত হয়েছে। ঐহিত্যবাহী বৌদ্ধ সংস্কৃতির রীতি নীতি মেনে রাজবন বিহারে সাধনানন্দ মহাস্থবির ভান্তে এই পূণ্যানুষ্ঠান চালু করেন।

মঞ্চে উপবিস্থ রাজবন বিহারের ভিক্ষুসংঘ

বিশাখা প্রবর্তিত এ দানানুষ্ঠান বাংলাদেশে সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তে সর্ব প্রথম ১৯৭৩ সালে তিনটিলা লংগুদু বনবিহারে শুরু করেন। তুলা হতে সুতা আর সেই সুতা রঙ করে কাপড় বুনে চীবর সেলাই করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভিক্ষু সংঘকে দান করা হয়।

ধর্মদেশনা প্রদান করেছেন শাসন রক্ষিত মহাস্থবির ভান্তে।

এবারের অনুষ্ঠানে ভারতের মহারাস্ট্র হতে বিপুল সংখ্যকভিক্ষুনী ওউপাসক উপাসিকা এবং থাইল্যান্ড হতে ভিক্ষু উপাসক উপাসিকা যোগদান করেন। এ ছাড়াও সারাদেশ হতে পূণ্যার্থী, দর্শনার্থী ‍উপস্থিত ছিলেন।

বর্মা হতে আগত চারিপুত্র মগগলায় ভান্তের ধাতু প্রজ্ঞালংকার ভান্তেকে হস্তান্তর করছেন।

দুই দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে রাতে চীবর বুনন প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়। সকালবেলায় সংঘদান, অষ্টপরিস্কারদান, বুদ্ধপূজা, পিন্ডদান, বুদ্ধ মুর্তিদান, বিশ্বশান্তি প্যাগোডার উদ্দেশ্যে টাকাদানসহ নানাবিধ দানকার্য সম্পাদিত হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রাক্তন উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান ও ভারত হতে আগত অতিথি বিজয় মেথ্থা সাবেক সচিব ইন্ডিয়ান রেলওয়ে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন তিন পার্বত্য জেলার মহিলা এমপি বাসন্তি চাকমা।

মনিস্বপন দেওয়ান বলেন, ‘১৯৯৬সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী সেই সময় বনভান্তের কাছে এসেছিলেন। ভান্তের কাছে উপদেশ প্রার্থনা করলে বনভান্তে বলেছিলেন জ্ঞান বুদ্ধি কৌশল থাকলে ক্ষমতায় ঠিকে থাকা যায় বেভাবে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষকে দুইশ বছর শাসন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বনভান্তেকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখিয়েছেন। আমি আশা করি সেই শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বর্তমানেও আপনার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা নির্মাণ বনভান্তে স্বপ্ন আর পার্বত্যবাসীর উদ্যোগ এ প্যাগোডা বিশ্বের মাঝে তৃতীয় দেশ হিসেবে এটি নির্মিত হচ্ছে ও হবে। এ সুনাম শুধু পার্বত্য বাসীর নয় ষোলকোটি মানুষের ও আপনার হবে। তাই যদি হয়, আপনি চাইলে ব্যক্তিগত বা প্রাষ্ঠান্তিকভাবে দান বা অনুদান প্রদান করলে আমরা সাদরে গ্রহন করবো ‘

বক্তব্য করছেন প্রাক্তনমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান। কিন্তু দুঃখের বিষয় পার্বত্য মন্ত্রী বীরবাহাদুর উশৈসিংয়ের সাথে যোগযোগ করে ব্যর্থ হন, যে তাকে রাজবন বিহার কমিটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে। তাঁর কাছে অনুদান চাইতে নয় বরং সম্মান দেখাতে।

ধর্মদেশনা প্রদান করেন জ্ঞানপ্রিয় মহাস্থবির ও বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির ভান্তে।

বিকেলবেলায় চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়সহ গৌতম দেওয়ান, বৃষকেতু চাকমা ও ভারত হতে আগত অতিথি সুখেলা কুম্ভারী ও সংসদ সদস্য বাসন্তি চাকমা বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়।

চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বক্তব্যে বলেন, ‘প্রতি বছর রাজবন বিহারে বিভিন্ন দেশ হতে পূণ্যার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করে থাকে। এ বছর কেন জানি না অনেক বিদেশীপূণ্যার্থী রাজবন বিহারের কঠিন চীবর অনুষ্ঠানে  আসতে পারেননি।’ সে জন্য উপস্থিত মহিলা আসনের এমপি মহোদয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যেন পরবর্তীতে বিদেশীদের অংশ গ্রহনের ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জ্ঞাত করেন।

ভারতের সংখ্যালুঘুু জাতীয় কমিশনের সদস্য সুলেখা কুম্ভারী।

ভারতের সংখ্যালুঘু জাতীয় কমিশনের সদস্য সুখেলা কুম্ভারী বলেন, ‘ভারতের সাতটি রাজ্য যেমম বুদ্ধগয়া, মহারাস্ট্রসহ বাংলাদেশ শ্রীলংকা,থাইল্যান্ড, বার্মা, ইন্দোনিশিয়া, কুম্বোডিয়া, লাওস যেসব দেশে বুদ্ধের অনুসারীরা আছেন একটি ছাতার নীচে এসে ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহন করতে সহজ হয় এমন প্রক্রিয়া করা উচিত। বুদ্ধের বাণী বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারলে সকলের মঙ্গল ও শান্তি আসবে।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গৌতম দেওয়ান

উপাসক উপাসিকা পরিষদের সভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান বলেন, ‘এত বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়। তথাপি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমাসহ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক, সাংবাদিক ও পূণ্যার্থীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা জানাই। বিদেশ হতে আগত ভিক্ষুসংঘ ও উপাসক উপাসিকাদের বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা।

জেলাপরিষদ চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা বলেন, আমি বিশ্বাস করি বুদ্ধের উপদেশ পঞ্চশীল পালন করতে পারলে সবার মঙ্গল ও শান্তি আসবে। বিশ্বশান্তি প্যাগোডা নির্মাণের লক্ষ্যে সবার প্রতি সাধ্য মত দান দিতে আহবান জানান তিনি।

তিন পার্বত্য জেলার সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি বাসন্তি চাকমা তাঁর বক্তব্যে বলেন,‘ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য জেলাবাসির প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক। প্রতি বছর বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ত্রাস্ট এ অনুদান দিয়ে থাকেন। আমি খাগড়াছড়ির দায়িত্বে এবং রাঙ্গামাটির দায়িত্বে আছেন দীপক চাকমা। রাঙ্গামাটিতে ৭০০ অধিক বিহার রয়েছে, খাগড়াছড়িতে ৬৫০ কাছাকাছি, বান্দরবানে আরো কম। বিদেশ হতে ভান্তে আনার ব্যাপারে তিন পার্বত্য জেলা এমপি জেলাপরিষদ চেয়ারম্যানসহ বিহার কমিটি সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ধর্মদেশনা প্রদান করেন ইন্দ্রগুপ্ত মহাস্থবির, ভৃগু মহাস্থবির, শাসন রক্ষিত মহাস্থবির ও প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির ভান্তে।

সভায় ধর্মদেশনাকালে বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা নির্মাণ করলে কিকি পূণ্যলাভ হবে তার বিস্তৃত বর্ণনা প্রদান ও জীবের সুখ শান্তি এবং মঙ্গল সাধনে করণী বিষয়ে আলোকপাত করেন। প্রত্যেক বক্তা বিশ্বশান্তি প্যাগোডা সম্পর্কে ও সাধ্যমত দান দিতে উপস্থিত পূণ্যার্থী ও বিশ্ববাসীর কাছে আহবান জানান।

চীবর বুননের ছবি।

এ ছাড়াও চারিপুত্র মগগলায় ভান্তের ধাতু বার্মা হতে রাজবন বিহারে হস্তান্তর করা হয়। আর এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছেন মিজ নিয় নিয়। এ উপলক্ষে বনভান্তের জীবনী নিয়ে একটি সিডি এর মোড়ক উন্বোষণ করেন বিহার অধ্যক্ষ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির ও রাজা দেবাশীষ রায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে