যুদ্ধ শেষ হলেও মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের শেষ নয়

0
34
আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি আফগানিস্তানের একটি সেনাঘাঁটিতে। ফাইল ছবি: এএফপি

আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ‘টার্গেট’ হিসেবে বিবেচিত অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজন নেই।

উদারনৈতিক মার্কিন মহলে এই দুই যুদ্ধ সমাপ্তির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। আল–কায়েদার ৯/১১–এর হামলার প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে ইরাকে মার্কিন হামলা ও কার্যকর অধিগ্রহণের শুরু। বাইডেন প্রশাসনের মতে, যে কৌশলগত লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এই দুই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তা অর্জিত হয়েছে। দুই দশক পর মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে অতিরিক্ত আর কিছু অর্জিত হবে না। আল-কায়েদা এখন আর মার্কিন স্বার্থে কোনো হুমকি নয়; বরং তার জন্য অনেক বড় হুমকি চীন, এবার সেদিকেই নজর দেওয়া যাক।

অন্যদিকে মার্কিন রক্ষণশীলদের চোখে এই দুই দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত মস্ত ভুল। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের কথায়, এটি একটি মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। এর ফলে উৎফুল্ল হবে সন্ত্রাসীরা। তারা ধরে নেবে, তাদের হাতে পরাস্ত হয়েই যুক্তরাষ্ট্র পালাচ্ছে। গ্রাহাম এবং অন্যান্য রিপাবলিকান নেতা বাইডেনের সমালোচনা করে বলেছেন, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসবে এবং ইরাকে ইরানের হাত শক্তিশালী হবে। কোনো কোনো মধ্যপন্থী বলে বিবেচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটরও এই সিদ্ধান্তে হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে মার্কিন রক্তপাত বৃথা যাবে।

ইরাক থেকেও সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সম্প্রতি ইরাকের একটি এলাকায়।

ইরাক থেকেও সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সম্প্রতি ইরাকের একটি এলাকায়।
 ফাইল ছবি: এএফপি

সামরিক শক্তিতে ‘জাতি নির্মাণ’ সম্ভব নয়

কিছুদিন আগেও আমরা জানতাম, এক নতুন গণতান্ত্রিক আফগানিস্তান ও ইরাক প্রতিষ্ঠা এই দুই দেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের কারণ। কেউ কেউ এই লক্ষ্যকে ‘জাতি নির্মাণ’ বা ‘নেশন বিল্ডিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেশ দুটি বড় আদিম। আসুন, আমরা তাদের আমাদের আদলে গড়ে তুলি, এই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অলিখিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা। দুই যুগ পরে কয়েক হাজার মার্কিন সৈন্যের মৃত্যু এবং কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার খরচ শেষে এখন মার্কিন প্রশাসনের বোধোদয় হয়েছে, ইরাক বা আফগানিস্তানে তাদের ইচ্ছামতো রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব নয়। আফগানিস্তান প্রসঙ্গে বাইডেন নিজেই বলেছেন, অনেক বিদেশি শক্তি এসে দেশটি দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন উপস্থিতির ফলে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাইডেনের যুক্তিতে, তা অসম্ভব। এটা আমাদের কাজ নয়, আফগানদের নিজেদের সে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

যে কথাটা বাইডেন এখানে বলেননি, তা হলো নিজের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে অস্ত্র ও অর্থের জোরে কোনো দেশ বা জাতিকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তা সে ভিয়েতমান হোক, অথবা আফগানিস্তান বা কিউবা। বিলম্বে হলেও যুক্তরাষ্ট্র এত দিনে সে সত্য মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

এখনই বিদায় নয়

তবে সৈন্য প্রত্যাহার করা হচ্ছে—কথাটার অর্থ এই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে বাক্স-প্যাটরা গুছিয়ে একেবারে বিদায় নিচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুসারে আফগানিস্তানে হাজারখানেক মার্কিন সৈন্য রয়ে যাবে। তাদের কাজ হবে কাবুলে মার্কিন দূতাবাস পাহারা দেওয়া এবং আফগান সরকারকে প্রয়োজনমতো পরামর্শ দেওয়া। আফগান সৈন্যদের প্রশিক্ষণেও মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা অংশ নেবে। অন্যদিকে ইরাকে কমপক্ষে আড়াই হাজার মার্কিন সৈন্য রয়ে যাবে। তারা ‘সামরিক অভিযানে’ অংশ নেবে না, তবে আফগানিস্তানের মতো সামরিক উপদেষ্টা ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করে যাবে। এখানে তাদের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকবে গোয়েন্দা তৎপরতা। মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার হলে ইরাকে প্রতিবেশী ইরানের উপস্থিতি বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। ইরানি তৎপরতার ওপর নজরদারি করা হবে অবশিষ্ট মার্কিন সৈন্যদের একটি বাড়তি দায়িত্ব।

বিদেশে সামরিক ঘাঁটির পক্ষে–বিপক্ষে যুক্তি

ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন ‘সামরিক মিশন’ শেষ হয়ে এলেও বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বন্ধ হচ্ছে, একথা ভাবার কোনো কারণ নেই। এ দুই দেশ ছাড়াও সারা বিশ্বের ৭০টির মতো দেশে ৮০০-এর মতো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এই ঘাঁটিগুলো ইউরোপের জার্মানি ও ইতালিতে যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে। মার্কিন গবেষক অধ্যাপক ডেভিড ভাইন হিসাব করে দেখিয়েছেন, ২০১৪ সালে এসব ঘাঁটি পুষতে যুক্তরাষ্ট্রকে বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে। পরবর্তী বছরগুলোতে এই ব্যয় বেড়েছে বৈ কমেনি।

দেশের বাইরে এসব ঘাঁটি এখনো কেন, সে বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে পণ্ডিত মহলে দীর্ঘদিন থেকেই চলে আসছে। এই বিতর্কে ঘৃতাহুতি দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তিনি বিদেশে, বিশেষত ইউরোপে মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি কমিয়ে আনার পক্ষে কিছু উদ্যোগও নিয়েছিলেন। এর ফলে লাভ হবে রাশিয়ার, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে ইউরোপীয় মিত্ররা, এই যুক্তিতে মার্কিন সামরিক কর্তারাই সে চেষ্টার বিরোধিতা করেছিলেন। বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর অবশ্য সে নীতি পাল্টানো হয়েছে। নতুন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এসব ঘাঁটি ও মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি প্রয়োজন। তা ছাড়া শুধু যুক্তরাষ্ট্র একা নয়, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও একাধিক ইউরোপীয় দেশ বিদেশে সৈন্য ধরে রেখেছে। তাদের মোকাবিলা করতেও এসব ঘাঁটির প্রয়োজন রয়েছে। যে কথাটা এখানে ঊহ্য রয়ে যায়, তা হলো বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের দৃশ্যমান প্রতীক এসব বিদেশি ঘাঁটি। তাদের বন্ধ করে দেওয়া মানে সবাইকে ঢাকঢোল পিটিয়ে একথা জানান দেওয়া যে যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বের পুলিশম্যান নয়। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান স্মিড মনে করেন, এই অবস্থা বদলানোর কোনো সম্ভাবনা নেই।

যাঁরা বিদেশে সামরিক ঘাঁটি বন্ধের পক্ষে, তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে বিদেশের মাটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। বিদেশে সামরিক ঘাঁটি তুলে নিলে মার্কিন টাঁকশাল থেকে বড় রকমের অপচয় বন্ধ হবে, একথাও বলেছেন কেউ কেউ। এঁদের একজন হলেন মার্কিন যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল মার্ক মিলি। তিনি মনে করেন, মিত্রদের আশ্বস্ত করতে বৈদেশিক ঘাঁটি ধরে রাখার কোনো বিকল্প বর্তমানে নেই, তবে দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে বিদেশে বড় ধরনের ঘাঁটি টিকিয়ে রাখার বিষয়টি নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।

যাঁরা বিদেশে সামরিক ঘাঁটি রাখার বিপক্ষে, তাঁরা মনে করেন, এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ। যেমন লিবার্টারিয়ান হিসেবে পরিচিত ক্যাটো ইনস্টিটিউট এক দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে বিদেশের মাটিতে মার্কিন সৈন্য ও ঘাঁটি রাখলে অনেক সময়েই স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ জন্মায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সে অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। ক্যাটোর মতে, যে নিরাপত্তার যুক্তিতে বিদেশে ঘাঁটি রাখা হয়, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় অবস্থানরত বিমানবাহী জাহাজ অথবা মার্কিন ভূমিতে পরিচালিত সামরিক কমান্ড থেকেই তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ জন্য একসময় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে বিদেশের মাটিতে ঘাঁটি ও সৈন্য রাখা যুক্তিসংগত মনে হলেও এখন সে যুক্তি আর গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুত, ক্যাটোর বিবেচনায়, মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল ও বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে মার্কিন ঘাঁটি রাখার অর্থ স্থানীয় পর্যায়ে মার্কিন বিরোধী শক্তিসমূহকে চোরাগোপ্তা হামলার সুযোগ করে দেওয়া।

কিন্তু র‍্যান্ড করপোরেশনের মতো দক্ষিণপন্থী গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে করে, দ্রুত আত্মরক্ষামূলক সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমূহে মার্কিন ঘাঁটি রাখার কোনো বিকল্প নেই। র‍্যান্ড ২০১৪ ও ২০১৫-তে একাধিক সম্ভাব্য ‘সমর ক্রীড়া’ পরিচালনার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে রাশিয়া মাত্র ৬০ ঘণ্টার মধ্যে বাল্টিক সাগর এলাকার ক্ষুদ্র দেশসমূহে নিজ বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হতে সক্ষম। এমন অবস্থা সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলা প্রতিরোধের জন্য এই অঞ্চলে মার্কিন ও ন্যাটোর নিজস্ব বাহিনীর মোতায়েন অপরিহার্য।

বিদেশে সামরিক তৎপরতা বাড়ছে

মুখে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক তৎপরতাও লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। এ নিয়ে কোথাও তেমন কোনো কথা শোনা না গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার সোমালিয়ায় মার্কিন সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। সিরিয়ায় এবং ইরাকেও মার্কিন বিমান হামলা বন্ধ হয়নি। মার্কিন তরফ থেকে বলা হয়েছে, সোমালিয়ার সরকারের সম্মতি ও অংশগ্রহণেই ‘সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা’র অধীনে এসব সামরিক হামলা পরিচালিত হয়। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার ঘোষণার পর সে দেশে মার্কিন বিমান হামলা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। সেটিও আফগান সরকারের সম্মতি ও অংশগ্রহণেই হচ্ছে।

সোজা কথায়, ইরাকে ও আফগানিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক মিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করলেও যে অবশিষ্ট সামরিক উপদেষ্টারা রয়ে যাচ্ছে, তারা মূলত সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই যুক্ত থাকবে। সামরিক প্রশিক্ষণ অব্যাহত থাকবে, সে কথা বাইডেন প্রশাসন থেকেই বলা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক সাম্প্রতিক প্রমাণ মিলেছে হাইতি থেকে। যেসব ভাড়াটে সৈন্যের হাতে সে দেশের প্রেসিডেন্ট কয়েক সপ্তাহ আগে নিহত হন, তাদের অধিকাংশ মার্কিনদের কাছেই সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করে।

হাসান ফেরদৌস

নিউইয়র্ক থেকে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে