ম্যাজিকের বাংলাদেশে ‘এই আছে এই নেই’

0
444
ডেঙ্গু জ্বরে ১৫ দিন ধরে ভুগছে ছয় বছরের শিশু মুশনান। হাসপাতালের মশারিঘেরা বিছানাটিই তার এখন পুরো জগৎ। আছে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা। পায়ে ছবি এঁকে সময় কাটাচ্ছে সে। গতকাল শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু সেলে। ফাইল ছবি

এই আছে এই নেই—কোথায় এমন হয়? কেন, জাদুর মঞ্চে। এই যেমন বিখ্যাত জাদুকর জুয়েল আইচ (কত দিন দেখি না তাঁকে), হাতে সুন্দর সাদা বল দেখিয়ে চোখের সামনেই তো কতবার উধাও করে দিয়েছেন। তেমন আরকি। জাদুর কথা এল কেন? বাস্তবতা। পুরো দেশটাই যে এখন জাদুর মঞ্চ। নানা কসরত দেখানো হচ্ছে। সবাই দমবন্ধ করে সেই কসরত দেখে যাচ্ছে; আর ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় দিচ্ছে তীব্র করতালি। সবই করতালিময়।

কেন এত কথা আসছে? উল্টো প্রশ্ন আসবে না-ই বা কেন? ডেঙ্গু আছে ডেঙ্গু নেই, দুধে ক্ষতিকর পদার্থ আছে আবার নেই; সন্ত্রাস আছে, শান্তিও আছে—এমন হাজারটা উদাহরণ টানা যাবে এই ম্যাজিক বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝাতে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন জানালেন ১১টি ওয়ার্ড ‘ডেঙ্গুমুক্ত’। অথচ সেই ১১টি ওয়ার্ডেই পাওয়া গেল বেশ কিছু ডেঙ্গু রোগী। ডেঙ্গু নিয়ে এই ‘আছে এবং নাই’–এর শুরু অবশ্য আরও কিছুটা আগে। শুরুতে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলেও নগর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন দায়িত্বশীল (!) মহল বলল, ডেঙ্গু হচ্ছে, তবে এর প্রকোপ এতটা নয়। ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে যা বলা হচ্ছে, তা গুজব। অবশ্য পরে আর বিষয়টি সামাল দেওয়া গেল না। ফলে আবার ‘ডেঙ্গু আছে’ এবং এ–সম্পর্কিত ‘সতর্কবার্তা’ এসে হাজির হলো।

এ তো গেল ডেঙ্গুর কথা। আসা যাক দুধের কথায়। কম তো ‘দুধঘোলা’ হলো না এ নিয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে চলল এই ম্যাজিক। প্রথমে আ ব ম ফারুক এলেন ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ হিসেবে। সবাই তেড়েফুঁড়ে এল। তারপর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেল কিছুটা। আদালত দায়িত্ব নিলেন। নতুন করে পরীক্ষা করে নিষেধাজ্ঞা এল, আবার এক দিনের মাথায় এই নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার শুরু হলো। সরকারের বিভিন্ন পক্ষ থেকে এল নানা ‘বাণী’। তারপর হুড়মুড় করে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলো। দুধে ক্ষতিকর পদার্থ আছে, আবার নেই। ম্যাজিক না? তো কী এটা! মায়া? তাও বললে চলে অবশ্য।

বিষয়টা অনেকটা সুকুমার রায়ের অ্যাবসার্ড গল্পের মতো, যেমনটা আছে ওই ‘হযবরল’-তে। ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বিড়াল।’ ঘাম মুছতে গিয়ে পাশে রাখা রুমাল তুলতে গিয়ে দেখা গেল সে আসলে বিড়াল। শুধু বিড়ালই না, কথা বলা বিড়াল, যে চন্দ্রবিন্দু থেকে চশমার হদিস দিয়ে দিতে পারে অনায়াসে। গরম থেকে বাঁচতে মাত্র সোয়া ঘণ্টায় কলকাতা থেকে তিব্বত যাওয়ার পথের হদিসও দিতে পারে, তবে সবিস্তারে নয়।

হাসপাতালগুলোতে এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি।

 

বাংলাদেশেরও সেই একই দশা। সবাই সব বাতলে দিচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ে পুরো দেশ যখন নাজেহাল, তখন নগর কর্তৃপক্ষ চকিতে ডেঙ্গুমুক্ত এলাকার সুসংবাদ দিতে পারে। এমন সুসংবাদদাতাই তো চাই। রাতে অন্তত ঘুমটা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার ডেঙ্গু রোগীও অন্তত ভাবতে পারেন যে আদতে তাঁর এমন কিছুই হয়নি, ‘সকলই ভ্রম’। মাত্র ‘সোয়া ঘণ্টায়’ না হোক, চোখের পলকেই বলা যায়, সমস্যার নিরসন হয়ে যাচ্ছে এখানে। আর অগণিত বেচারার দল হাঁফ ছেড়ে বলছে, ‘যাক, বাঁচা গেল’। কিন্তু এই ‘বাঁচা গেল’ বলে, হাসপাতাল ছাড়া যাবে না একদম। এটা পূর্বসতর্কতা। কখন যে সেই অবধারিত ‘বড় মামা’ এসে বলবে, ‘যা যা, সব স্বপ্ন দেখেছিস’।

বাংলাদেশে অবশ্য ম্যাজিক সব সময় চলে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এ দেশে জন্মালেই পারতেন। জাদু কাকে বলে এবং এর বাস্তবতাই কোন বস্তু—সব আরও ভালো করে বুঝতে পারতেন। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এই জাদুর ঝাঁপি তো সব সময় খোলাই আছে। ‘দেখতে চাইলে দেখ, না দেখলে নাই’; জোর তো করছে না কেউ। সড়কে মানুষ মরবে, শহরে হলে ফুটওভারব্রিজ বানানোর প্রতিশ্রুতি মিলবে। আবার মরবে ‘অসীম সম্ভাবনাময়’ জনতা। বড় কিছু হলে আলোড়ন হবে, না হলে না। ম্যাজিক কিন্তু চলছেই। টিকিট লাগছে না, তাই ট্যাঁকে টান পড়ছে না। ফলে কারও কোনো রা নেই আর।

মশার ঔষধ ছিটানো।

স্বাস্থ্য খাতে ডেঙ্গু নামের অহেতুক এক উপদ্রবে যখন সবাই ব্যতিব্যস্ত, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরলে সাংবাদিক যখন জানতে চান, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’, তখন তাঁর দিকে ছুটে আসে ‘ধমক’। ঠিক একই সময়ে বিমানবন্দর এলাকায় শোভা পায় ডেঙ্গুবিষয়ক সচেতনতামূলক নানা বিলবোর্ড; ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আহ্বান’। যেন এই সব বিলবোর্ড ও আহ্বান দিয়েই রোগটির প্রকোপ কমবে। যেনবা এই বাণী সকলই হচ্ছে সেই বিখ্যাত মন্ত্র, ‘অ্যাবরা কা ড্যাবরা’, কিংবা ‘হিং টিং ছট’। বললেই ‘ল্যাঠা চুকে যায়’। এ–ও তো এক ম্যাজিকই।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিনা টিকিটে এই ম্যাজিক আর কত দিন দেখানো হবে? এবার একটু থামলে হয় না? এই আছে, এই নেই না করে জনগণের টাকাকে ‘গৌরী সেনের’ টাকা না ভেবে, একটু সমঝে খরচ করে ব্যবস্থা নিলে হয় না? একটু ভেবে, গুরুত্ব দিয়ে সমস্যাগুলোর কারণ খুঁজে, সমাধানের পথে এগোলে খুব কি ক্ষতি হয়? তাৎক্ষণিক সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে মস্তিষ্কের ‘ধূসর’ অংশটা একটা কাজে লাগালে কেউ মন্দ বলবে না। একটু ভেবে, মানুষকে জাদুর দর্শক না ভেবে একটু পদক্ষেপ নিতে খুব কি কষ্ট হয়? হয় না। চাইলেই পারা যায়। শুধু জাদুর মঞ্চটি থেকে নেমে আসার ইচ্ছাটা প্রয়োজন।

ফজলুল কবির: সাংবাদিক
ই-মেইল: fazlul.kabir@prothomalo.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে