মেসি–ম্যারাডোনার দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

0
206
ঐক্যের ডাক দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছেন আলবার্তো ফার্নান্দেজ। ছবি: রয়টার্স

ডিয়েগো ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনার নাম উঠলেই যুগলবন্দী হিসেবে ফুটবলের কথা আসবে—এ তো স্বাভাবিক। এও স্বাভাবিক যে, এই এখন আর্জেন্টিনার নাম উঠলে বাংলাদেশি মাত্রই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোবে—কারণ লিওনেল মেসি আসছেন না ঢাকায়। এও তো ফুটবলই।

বাংলাদেশে, ফুটবল যেখানে এক দীর্ঘশ্বাসের নাম, সেখানে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মানেই ফুটবল। এ দুই দেশের কথা বলা হলো তাদের সমর্থকের আধিক্যের কারণেই। ফুটবলের অন্য সব দেশের সমর্থক থাকলেও, তাদের অন্য পরিচয়ও এখানে বর্তমান। কিন্তু লাতিন পতাকাবাহী এ দুই দেশের ফুটবল ছাড়া আর কোনো পরিচয় যেন নেই। অথচ, এই কিছুদিন আগেই ব্রাজিল আলোচনায় উঠে এল এক কর্তৃত্ববাদী শাসকের বদৌলতে, যার নাম জায়ের বোলসোনারো, যাকে বলা হয় লাতিন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই কিছুদিন আগেই ধুকপুক করতে করতে সারা বিশ্ব তাকিয়ে থাকল মহাপ্রাণ আমাজনের দিকে, তার আগুনের দিকে। এই সব শীর্ষ সংবাদ অতীত হতে না হতেই আবার ফুটবলেই ফিরে যায় চিরায়ত ব্রাজিল।

কিন্তু স্মরণে থাকুক আর না-ই থাকুক এ ফুটবলময় দেশগুলোতে অন্য বাস্তবতাও বিদ্যমান। সেখানে শাসন থাকে, শাসনের বদল হয়। সেখানেও সেনা অভ্যুত্থান ঘটে, আসে স্বৈরশাসন। এই যেমন আর্জেন্টিনা—বিশ্বখ্যাত নাচ ট্যাঙ্গোর এ জন্মভূমি যে গরুর মাংসের জন্য বিখ্যাত, তা কজনই বা জানে? কজনই বা জানে যে, গত শতকের একই সময়ে যে দেশ ছিল বিশ্বের প্রথম দশ অর্থনৈতিক শক্তির একটি, সে দেশের অর্থনীতিই এখন তলানিতে? গত দুই দশক ধরে দেশটির অর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা ২০০১ সালে মাত্র ১০ দিনে পাঁচজন প্রেসিডেন্ট উপহার দিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে।

এই ফুটবল ও ট্যাঙ্গোর দেশেই নির্বাচন আগামীকাল ২৭ অক্টোবর। আর এই নির্বাচন ঘিরেও তৈরি হয়েছে নানা ধরনের অনিশ্চয়তার। মোটাদাগে অর্থনীতি সংস্কারের প্রতিশ্রুতিই এ নির্বাচনের ফল গড়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে পেরোনিস্টরাই। এই পেরোনিস্ট আবার কী? এও এক রাজনৈতিক তত্ত্ব, যা একান্তই আর্জেন্টাইন। হুয়ান ডোমিঙ্গো পেরোনকে মনে আছে? সাবেক এই জেনারেল ১৯৪৬ সালে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী ইভা পেরোন ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন মানুষের মধ্যে। পরপর দুই মেয়াদে নির্বাচিত হন পেরোন। ১৯৫৫ সালে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারানোর আগ পর্যন্ত টানা নয় বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে ১৯৭৩ সালে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত এই হুয়ান ডোমিঙ্গো পেরোনের নির্দেশিত রাজনৈতিক পথই মূলত পেরোনিজম নামে পরিচিত, যা পুঁজিতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র থেকে সমান দূরত্ব রেখে চলার নীতি অনুসরণ করে। বুঝতে সমস্যা হয় না যে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় ধীরে ধীরে আকার পাওয়া এ পথ মূলত সবদিকে ভারসাম্য রেখে চলার নীতি অনুসরণ করেছিল।

আলবার্তো ফার্নান্দেজের রানিংমেট হিসেবে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ, যার শাসনকালকে দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। ছবি: রয়টার্স

পেরোনিজমের কথা আসছে, কারণ এবারের নির্বাচনে এই পেরোনিজমের পুনরুত্থানের ঘটনাই ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। বুয়েন্স আইরেসের ত্রেস ডি ফেব্রেরো এলাকায় গেলে অন্তত তেমনটাই মনে হবে, যে এলাকার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি যুদ্ধ। ১৮৫২ সালের দিকে এই স্থানটিতেই হয়েছিল এক যুদ্ধ, যার বিজয়ী জেনারেল জাস্তো হোসে উরকুইজা পরে আর্জেন্টিনার ফেডারেল সংবিধান অনুমোদন করেন। আর্জেন্টিনার ভাগ্য নির্ধারণে এই অঞ্চলের গুরুত্ব এখনো অনেক। কারণ, বলা হয় কোনো নির্বাচনে এ অঞ্চল থেকে যিনি বিজয়ী হন, তিনি জাতীয় নির্বাচনেও বিজয়ী হন। আর এবার এই অঞ্চলের ভোটারদের অধিকাংশের মধ্যে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মরিসিও মাক্রির প্রতি স্পষ্ট বিরাগ দেখা যাচ্ছে। প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কারে ব্যর্থতাই এই বিরাগের কারণ। আর এই ব্যর্থতাকেই নিজের প্রচারের মুখ্য অস্ত্র করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আলবার্তো ফার্নান্দেজ, যিনি একজন পেরোনিস্ট।

২০১৫ সালে ত্রেস ডি ফেব্রেরোর ভোটাররা মাক্রিকে ভোট দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি আর্জেন্টিনাকে ১৪ বছরের পেরোনিস্ট শাসন থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর দেশকে অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের করতে পারেননি। যে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা ব্যর্থ হয়েছে পুরোপুরি। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, আর্জেন্টিনার অর্থনীতি এক অনিঃশেষ মন্দার মধ্য দিয়ে চলছে। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫০ শতাংশের বেশি। অবস্থা এতটাই সঙ্গীন যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আর্জেন্টিনা ৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের অনুদান নিতে হয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এ অবস্থায় আর্জেন্টিনার ভোটাররা আবারও পেরোনিজমের দিকেই ঝুঁকছে। শুধু ত্রেস ডি ফেব্রেরো নয়, পুরো আর্জেন্টিনাতেই পেরোনিস্টরাই এগিয়ে এখন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় প্রথম পর্যায়ের ভোটে আলবার্তো ফার্নান্দেজ জয়ী হচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। পেরোনিস্টরা একদল উজ্জীবিত ভোটারের দেখা পাচ্ছেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু তা দেশের ভবিষ্যৎকে কতটা আশার আলো দেখাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে এখনো।

স্বল্প বিরতিতে পেরোনিস্টদের উত্থানে মূলত শঙ্কায় পড়েছে আর্জেন্টিনার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মধ্যবিত্তরা। তাদের ভয় আলবার্তোকে নিয়ে নয়, বরং তাঁর রানিংমেট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজকে ডি কির্চনারকে নিয়ে, যিনি মাক্রির আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্রিস্টিনাকেই মূলত আর্জেন্টিনার বর্তমান অর্থনৈতিক দৈন্যের কারণ হিসেবে দেখা হয়। আট বছর প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি দেশটির কল্যাণ কার্যক্রমের পরিসর ভীষণভাবে বাড়িয়েছিলেন, বিস্তৃত করেছিলেন ভর্তুকি ও সরকারি চাকরির পরিসর। সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে তিনি আয়ের পথ সন্ধান দিতে পারেননি। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি এক ভয়াবহ সংকটের আবর্তে পড়ে। ক্রিস্টিনা যখন মাক্রির কাছে ক্ষমতা ছাড়েন, তখন দেশটি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ ঘাটতি নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এই দুর্গতি থেকে উদ্ধার করতে না পারাতেই এখন আবার মাক্রির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে পেরোনিস্ট ধারার দিকে ঝুঁকছে দেশটি।

ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ নিজে একজন পেরোনিস্ট হলেও তাঁর মূল ঝোঁক অতি বামপন্থার দিকে। আর এটিকেই তাঁর ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে দেখেন তাঁর সমালোচকেরা। আর্থিক খাতের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রবণতাকে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখা হয়। আলবার্তোর সমর্থকদের মধ্যে যতটা সংশয় রয়েছে, তা এই ক্রিস্টিনার কারণেই। অনেকেই মনে করছেন, আলবার্তোকে সামনে রেখে ক্রিস্টিনাই আসলে শাসকের চেয়ারটিতে বসবেন, যদি তাঁরা জয়ী হন।

অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় এবার ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট মরিসিও মাক্রির দিক থেকে। ছবি: রয়টার্স

আলবার্তো ফার্নান্দেজের সামনে এখন নিজের পরিচয়টি তুলে ধরাই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি একদিকে মাক্রির ‘নয়া–উদারবাদি’ পথের সমালোচনা করছেন, অন্যদিকে ‘নিজে ক্রিস্টিনার মতো নন’—এ কথাও তাঁকে বলতে হচ্ছে। তিনি মূলত ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন। নিজেদের জোটের নামও দিয়েছেন ফ্রেন্টে ডি টোডোস (ফ্রন্ট ফর অল)। এ ক্ষেত্রে অবশ্য তাঁর ‘লড়াই নয়, আলোচনায় বিশ্বাসী’ ভাবমূর্তিটি কিছুটা সহায় হচ্ছে। কিন্তু তা ভোটারদের খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারছে না। দেশটিতে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য বলছে, অধিকাংশ ভোটারই মনে করেন যে, জয়ী হলে মূল শাসনটি করবেন ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজই।

এই জনধারণাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে ভোটের দিনে। কারণ, ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজের বিরুদ্ধে ছয়টি দুর্নীতি মামলা চলছে। কিন্তু সিনেটর হওয়ার কারণে তাঁকে জেলে থাকতে হচ্ছে না। ফলে মানুষের মধ্যে এই ধারণা স্বাভাবিক যে, ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি ক্ষমা পেয়ে যাবেন। এ পরিস্থিতিতে আলবার্তো ফার্নান্দেজকে নিজের শক্তিমত্তা ঠিকঠাক তুলে ধরতে অনেক কিছু করতে হচ্ছে। এমনকি বহু নির্বাচনী সমাবেশে ক্রিস্টিনাকে ছাড়াই তাঁকে হাজির হতে হচ্ছে। কিন্তু এটি শেষ পর্যন্ত কতটা কাজ করবে, তা ঠিক বলা যাচ্ছে না।

আলবার্তো ফার্নান্দেজ নিজেকে যত শক্তিশালী হিসেবেই উপস্থাপন করুন না কেন, ক্রিস্টিনার ছায়া শেষ পর্যন্ত এড়াতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ, ক্রিস্টিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে লা ক্যাম্পোরার, যা আর্জেন্টিনার সবচেয়ে শক্তিশালী বামপন্থী সংগঠন। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আবার তাঁরই ছেলে ম্যাক্সিমো কির্চনার। ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ের পাশাপাশি নিম্নকক্ষের ২৫৭ আসনের ভোটও গ্রহণ করা হবে। এতে ক্রিস্টিনাপন্থীরা অন্তত ৪০টি আসনে জয়ী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে ফার্নান্দেজরা নির্বাচিত হলে, কর্তৃত্ব শেষ পর্যন্ত ক্রিস্টিনার হাতে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, যদি না আলবার্তো জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠন করেন। নান্দনিক ফুটবল ও ট্যাঙ্গোর দেশের শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর এ ঐক্য জয়ী হয় কিনা, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে