মিয়ানমার ও সু চির বিচার কতটা করা যাবে

0
177
মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি এবং দেশটার সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। আগামী ডিসেম্বরে সু চি হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে দাঁড়াবেন। ছবি: এএফপি

প্রাক-সক্রেটিস যুগে সোফিস্টরা একটা তত্ত্ব নিত্য বিলাতেন, অপরাধ হবে ঘরে কিন্তু বিচার হবে বাইরে। বাইরে বিচারের অর্থ হচ্ছে: এক. অন্যকে অপরাধ থেকে বিরত রাখা, এবং দুই. পাবলিককে ‘পানিশমেন্টের’ মাধ্যমে লাইনে (ডিসিপ্লিনে রাখা) আনা। এটাই ফরাসি দার্শনিক ফুকোর ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ কিতাবের কেন্দ্রীয় মনোযোগ। তবে, ‘পানিশমেন্ট’ দিয়ে ‘ডিসপ্লিন’ করা যায় কি না, সে জিজ্ঞাসা অমীমাংসিত।

তবে ঘরের মধ্যে অপরাধ করলেও বাইরে তার বিচার হবে, এ-তত্ত্বের একবিংশ শতকীয় নজির অনেক আছে। তার চলতি উদাহরণ মিয়ানমার, সু চি এবং দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য করা মামলার মধ্যে। মিয়ানমার যদি মনে করে থাকে যে সে তার রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বা ঘরের মধ্যে যা ইচ্ছে তা করবে কিন্তু ঘরের বাইরে কেউ কিছু বলবে না বা ঘরের বাইরে তার কোনো বিচার হবে না, এ ধারণা একবিংশ শতাব্দীতে অচল। সুতরাং মুরুব্বির কথা বাসি হলেও ফলে। মিয়ানমার এখন আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায়।

নভেম্বরের ১১ থেকে ১৪ তারিখের মধ্যে মিয়ানমারের বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে মোটাদাগে তিনটি আইনি তৎপরতা লক্ষ করা গেছে: এক. আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস বা আইসিজে) গাম্বিয়ার মামলা, দুই. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসি) মিয়ানমারে সংঘটিত জেনোসাইডের ঘটনা অনুসন্ধানের অনুমতি এবং তিন. সু চি এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার চেয়ে আর্জেন্টিনার আদালতে মামলা। ২০১৭ সালের আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং কিছু চরমপন্থী রাখাইন মিলে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং জেনোসাইড সংঘটিত করেছে, তার বিচার চেয়ে দীর্ঘ দুই বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কোথাও যখন কোনো মামলা-মোকদ্দমার খবর নেই, তখন হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একই সময়ে তিন তিনটি আইনি তৎপরতা বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলেছে এবং বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশেও এসব মামলা-মোকদ্দমার খবরে বেশ উচ্ছ্বাস এবং আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ফলে, মিয়ানমার, সু চি এবং মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন, এটাই এ-মুহূর্তে সবচেয়ে বড় খবর।

মিয়ানমার আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র (স্টেট-পার্টি) না হওয়ায় মিয়ানমারে সংঘটিত জোনোসাইডের বিচার করার এখতিয়ার আইসিসির আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে, আইসিসি কর্তৃক জেনোসাইডের এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের নির্দেশ শেষ পর্যন্ত হালে কতটুকু পানি পাবে, তা দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে অনেক বছর। আর্জেন্টাইন আদালতে ‘সর্বজনীন নীতি’র আওতায় লাতিন আমেরিকার মানবাধিকার সংগঠন ও রোহিঙ্গা ডাইয়াসপোরা অ্যাকটিভিস্টরা যে মামলা করেছেন, সেটাও নানান আইনি গ্যাঁড়াকলে কতটুকু এগোবে, তা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে। এবং মিয়ানমারও এসব বিষয় নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছে না। কিন্তু আইসিজেতে আফ্রিকার একটি ছোট মুসলিম রাষ্ট্র গাম্বিয়া মিয়ানমারে সংঘটিত জেনোসাইডের বিচার চেয়ে যে মামলা করেছে, তাকে মিয়ানমার কোনোভাবে গুরুত্ব না দিয়ে পারবে না। মনে রাখা জরুরি যে, গাম্বিয়া একা এ মামলা করেনি, বরং আন্তর্জাতিক ইসলামিক সম্মেলনের (অর্গানাইজেশন অব ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স ওরফে ওআইসি) ৫৭ সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে এবং পক্ষে গাম্বিয়া আইসিজেতে এ মামলা করে। অধিকন্তু আইসিজে ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের The Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide-এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক আদালত যেখানে গাম্বিয়া এবং মিয়ানমার দুটিই অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র অর্থাৎ স্টেটপার্টি। মিয়ানমার ১৯৫৬ আর গাম্বিয়া ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের এ-জেনোসাইড কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করেছে। কাজেই মিয়ানমার এর ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন’ মানতে বাধ্য।

গাম্বিয়া মামলার পিটিশনের শুরুতেই আবেদনের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আইসিজের স্টেটিউটসের ধারা ৩৬ (১) ও ৪০ এবং আইসিজের কার্যবিধি ৪১-এর উল্লেখ করে, যা স্টেটপার্টি হিসেবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলা করার এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়। মিয়ানমারও আইসিজেতে করা মামলাকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রস্তুতির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরের ১০-১২ তারিখে নেদারল্যান্ডসের হ্যাগে যে প্রাথমিক শুনানি হবে, সেখানে মিয়ানমারের সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলের উপদেষ্টা এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কিন্তু গণহত্যা ও জেনোসাইড সংঘটনের অভিযুক্ত আসামি অং সান সু চি। অতএব, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জেনোসাইড সংঘটনের অভিযোগে মিয়ানমার, সু চি এবং মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এ—বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নাই। এটাই এ মামলার প্রাথমিক সাফল্য।

এ মামলার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ‘অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা’ গ্রহণের জন্য আবেদন। মামলার পিটিশনের একেবারেই শুরুতে (প্রথম পৃষ্ঠায়) এবং ও-অংশের ১৩২ নম্বর আবেদনে (৪৪ পৃষ্ঠায়) অনুরোধ করা হয়েছে যেন মামলার শুনানিকালীন এবং চলাকালীন অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদেশ প্রদান করা হয়, যাতে মিয়ানমারে বর্তমানে বসবাসকারী প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে এ ধরনের মামলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে মামলার বাদীর অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়। ফলে, আমরা আশা করতে পারি, খুব অস্বাভাবিক কিছু না হলে আগামী ডিসেম্বরের ১০-১২ তারিখ এ রকম একটি আদেশ আইসিজে প্রদান করবে।

এ মামলার আরেকটা শক্তিশালী দিক হচ্ছে, মামলার পিটিশনে ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অপারেশন ক্লিয়ারেন্সের আওতায় জেনোসাইডের সব আলামত অত্যন্ত শক্তভাবে লিপিবদ্ধ করা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে: (১) বেশুমার নির্যাতন, (২) নাগরিকত্ব অস্বীকার, (৩) ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, (৪) রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার, (৫) অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, (৬) সহায়-সম্পত্তি এবং স্থাবর সম্পত্তি লুণ্ঠন, (৭) শিশু-নারী-বৃদ্ধদের নির্বিচার নির্যাতন, (৮) গণহারে নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন, (৯) পাইকারি হারে গণহত্যা, (১০) সুপরিকল্পিতভাবে জাতিগত নিধনের জোর প্রয়াস।

বিচারের রায় যা-ই হোক না কেন, গাম্বিয়ার মামলার মধ্য দিয়ে নতুন করে বিশ্ববাসীর সামনে আরও একবার প্রকাশিত হলো মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জেনোসাইড সংঘটনের বাস্তব তথ্যচিত্র।

তবে, এ মামলার বড় দুর্বল দিক হচ্ছে, এ মামলার প্রায় সব তথ্যপ্রমাণ ২০১৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন। কেননা, গাম্বিয়া এ মামলা করার জন্য রাখাইন রাজ্য কিংবা বাংলাদেশ থেকে সরেজমিনের কোনো তথ্য সংগ্রহ করেনি কিংবা মিয়ানমার বা বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কোনো পর্যায়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে হাজির করেনি। ফলে, সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমার ডেলিগেটস যখন আইসিজেতে শুনানিতে অংশ নেবেন, তখন গাম্বিয়ার পক্ষে সাক্ষাৎ তথ্যপ্রমাণ (ফার্স্ট-হ্যান্ড এভিডেন্স) উপস্থাপন করা খানিকটা কঠিন হয়ে যাবে। মিয়ানমার যে অপরাধ করেছে, তার সত্যিকার কতটুকু বিচার হবে, সে প্রশ্নে বলা যায়, এ মামলার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে খোদ আইসিজের এখতিয়ার, পরিধি এবং জুরিসডিকশনের সীমাবদ্ধতা। কেননা, আইসিজের কাজ হচ্ছে প্রধানত দুটি—এক. দুটি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে আইনগত বিরোধ (লিগ্যাল ডিসপিউট) মীমাংসা এবং দুই. কোনো আইনি প্রশ্নে পরামর্শমূলক মতামত প্রদান। ফলে, এতটুকু সামর্থ্য নিয়ে আইসিজে মিয়ানমারের কতটুকু বিচার করতে পারবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তাই, শেষমেশ গ্রিক পুরাণেই সান্ত্বনা। গ্রিক পুরাণে আছে, ‘যদি কারও চুল কাটা না যায়, তার চুল ধরে টান দেওয়াটা চুল কাটার সমান।’ হয়তো বিশ্ববাসীকে চুল টেনেই চুল কাটার সান্ত্বনা পেতে হবে!

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে