মাউশির আঞ্চলিক উপপরিচালকদের ক্ষমতা কমলো

0
249

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির ক্ষমতা এতদিন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের আঞ্চলিক উপপরিচালকদের হাতে ছিল। এবার সে ক্ষমতা কিছুটা খর্ব করা হয়েছে। এখন থেকে বেসরকারি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আঞ্চলিক পরিচালকদের হাতে। আর উপপরিচালকরা কেবল বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করবেন।

এ নিয়ে গত বুধবার পরিপত্র জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে মাউশির আঞ্চলিক পরিচালকরা কিছু ক্ষমতা পেলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেসিপ প্রকল্পের আওতায় মাউশির আঞ্চলিক অফিসগুলোতে পরিচালক পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই পরিচালকরা এতদিন মাউশি ও মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া বিভিন্ন তদন্ত, পরিদর্শন করে সময় পার করতেন।

মাউশির আঞ্চলিক পরিচালকরা বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা। তারা অধ্যাপক পদমর্যাদার। অন্যদিকে, আঞ্চলিক উপপরিচালকরা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মূলত শিক্ষক হলেও এই দুই পদের কর্মকর্তাদের মধ্যে আঞ্চলিক অফিসগুলোতে এক ধরনের ‘ক্ষমতার দ্বন্দ্ব’ চলছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন সিদ্ধান্তে মূলত দু’পক্ষের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি হলো।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, উপপরিচালকরা বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা এবং পরিচালকরা বেসরকারি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করবেন।

এর আগে ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের এমপিও অনলাইনে বিতরণের বিষয়ে পরিপত্র জারি করা হয়। এ পরিপত্রে বলা ছিল, ‘সকল শিক্ষা অঞ্চলের উপপরিচালক বা অঞ্চল প্রধান বিধি-বিধান অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও আবেদন নিষ্পত্তি করবেন।’ এ আদেশ জারির পর আঞ্চলিক উপপরিচালকরাই একচ্ছত্রভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও আবেদন নিষ্পত্তি করতেন। এ নিয়ে মাউশির আঞ্চলিক অফিসগুলোতে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপক অভিযোগ উঠতে শুরু করে।

নতুন পরিপত্রে বলা হয়, বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও বিতরণের বিষয়ে জারি করা পরিপত্রে ‘সকল শিক্ষা অঞ্চলের উপপরিচালক বা অঞ্চলপ্রধান বিধি-বিধান অনুসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও আবেদন নিষ্পত্তি করবেন’ বিষয়টি সুনির্দিষ্ট না থাকায় এ পরিপত্র জারির তারিখ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্ট অঞ্চলের মাধ্যমিক পর্যায়ে উপপরিচালক ও কলেজ পর্যায়ে পরিচালকরা এমপিও কার্যক্রম সম্পাদন করবেন। বিষয়টি সংশোধন করে সুনির্দিষ্ট করা হলো।

অবশ্য, ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এমপিও বিতরণের বিষয়ে জারি করা আগেই ওই পরিপত্রের অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত থাকবে বলেও জানানো হয়েছে নতুন পরিপত্রে।

শিক্ষক-কর্মচারীরা জানান, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির কাজ আগে রাজধানীর শিক্ষা ভবন হিসেবে পরিচিত মাউশিতে নিষ্পত্তি করা হতো। শিক্ষকদের যেন সময় কষ্ট করে ঢাকায় আসতে না হয়, সেজন্য

২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল থেকে সারাদেশে অনলাইনে এমপিওভুক্তি কার্যক্রম শুরু করে মাউশি। একই বছরে এমপিও সারাদেশের মাউশির নয়টি আঞ্চলিক অফিসে এই কাজ বিকেন্দ্রীয়করণ করা হয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। অভিযোগ, এখন ঘুষের টাকা নিয়ে মাউশিতে না এলেও মাঠপর্যায়ে বিতরণ করতে হয়। এতে মাউশির আঞ্চলিক অফিসগুলো ঘুষের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। এমপিওভুক্তির জন্য আগে শুধু শিক্ষা ভবনে ঘুষ দিতে হতো। এখন ঘুষ দিতে হচ্ছে ঘাটে-ঘাটে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস ও আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয়ে, এই তিন স্তরে ঘুষ দিয়ে এখন একজন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত হতে হয়।

নিজের এমপিও নিয়ে হয়রানির ভয়ে স্বনামে বক্তব্য দিতে বেশিরভাগ শিক্ষকই ভয় পান। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে প্রায় ২৬ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। প্রতিদিনই শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরে যান। এ কারণেই নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। চাহিদা বিবেচনায় দুই মাস পরপর সারাদেশে প্রায় আড়াই হাজার নতুন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হন। এই এমপিওভুক্তি করা নিয়েই চলে হয়রানি ও ঘুষবাণিজ্য। অভিযোগ আছে, এমপিওভুক্তির ক্ষমতা পাওয়ার পর মাউশির অনেক আঞ্চলিক উপপরিচালক অবৈধভাবে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে গেছেন। এখন আঞ্চলিক পরিচালকদেরও একই ক্ষমতা দেওয়া হলো। তবে তারা শুধু কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তি করবেন।

নতুন পরিপত্রের বিষয়ে মাউশির ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক সাখায়েৎ হোসেন বিশ্বাস বলেন, অনেক আগে থেকে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে কাজের চাপ অনেক বেশি। আমরা এখন মাদ্রাসা ও বিদ্যালয়ের আবেদনগুলো দেখব। তারা (আঞ্চলিক পরিচালক) কলেজের আবেদন দেখবেন। এতে ভালোই হবে।

খুলনা অঞ্চলের উপপরিচালক নিভা রানী পাঠক বলেন, এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমরা বলার কিছু নেই। উপপরিচালকদের ওপর কাজের চাপ অনেক বেশি। তাই হয়তো সরকার কাজ ভাগ করে দিয়েছে। এতে আমাদের ওপর কাজের চাপ কমবে।

সিলেট অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মন্ত্রণালয়ের আদেশের কথা শুনেছি। যেভাবে তারা বলেছেন, সেভাবেই কাজ হবে।

আরও অন্তত তিনজন উপপরিচালক সমকালের সঙ্গে কথা বললেও নিজেদের উদ্ধৃত করে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে উপপরিচালকরা মূলত সরকারি এ আদেশকে তাদের ক্ষমতা খর্ব হিসেবে দেখছেন। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ ভুঁইয়া বলেন, সমিতির পক্ষ থেকে আমাদের দাবি, শিক্ষানীতি যেন অনুসরণ করা হয়। জাতীয় শিক্ষানীতিতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই মাধ্যমিকের শিক্ষকরা মাধ্যমিক পর্যন্ত সব কাজ করার এখতিয়ার রাখেন। সরকারের কাছে অনুরোধ, মাধ্যমিক শিক্ষা মাধ্যমিক শিক্ষকদের হাতেই যেন থাকে। তিনি আরও বলেন, মাউশির আঞ্চলিক অফিসগুলোতে সেসিপের যে পরিচালক বসানো হয়েছে, তারা কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন তদন্ত- সব কিছুই করছেন। এতে আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে কোনো সমন্বয় থাকছে না। আমরা চাই, মাধ্যমিক অংশটুকু স্বতন্ত্র থাকুক।

তবে বেসরকারি কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, কলেজ শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দায়িত্ব কলেজ শিক্ষকদের হাতে আসায় ভালো হয়েছে। এর আগে একজন চতুর্থ গ্রেডের অধ্যক্ষের এমপিওভুক্তি দিতেন পঞ্চম গ্রেডের একজন উপপরিচালক, যিনি প্রধানত স্কুলের প্রধান শিক্ষক। উপরন্তু কলেজের নিয়োগ, পদোন্নতি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা তাদের ভালোভাবে জানা থাকত না বলে বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা অহেতুক হয়রানির শিকার হতেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে