মধু আনার ‘অপরাধে’ ৮২ দিন কারাগারে

0
625
এই তিন বোতল মধুকে তরল মাদক ভেবেছিলেন বাল্টিমোর বিমানবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তারা। ছবি: মেরিল্যান্ড সড়ক পরিবহন পুলিশের সৌজন্যে

চায়ের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেতে ভীষণ পছন্দ করেন লিওন হটন। ক্যারিবীয় দ্বীপ জ্যামাইকা থেকে আমেরিকায় ফেরার সময় তাই সঙ্গে এনেছিলেন তিন বোতল মধু। কিন্তু এই মধু আনার ‘অপরাধে’ ৮২ দিন জেল খাটতে হয়েছে তাঁকে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিন কার্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে বসবাস করেন হটন। প্রতি বছর বড়দিনের সময় জ্যামাইকায় নিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি। ফেরার সময় প্রতিবারই মধু নিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু গত বছরের ২৯ ডিসেম্বরে ফেরার সময় বাঁধে বিপত্তি। মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর বিমানবন্দরে তাঁকে আটক করেন শুল্ক কর্মকর্তারা। হটনের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, বোতলের ওপর মধুর লেবেল লাগিয়ে তরল মাদক পাচার করছিলেন তিনি।

এরপর বিমানবন্দরেই হাতকড়া পরিয়ে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে রাখা হয় হটনকে। ঘটনার আকস্মিকতায় সেখানেই অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চেতনা ফিরলে তাঁকে কারাগারে নেওয়া হয়।

বিমানবন্দরে কী হয়েছিল তাঁর সঙ্গে, তা নিজেই বলেছেন হটন, ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম সঙ্গে থাকা উচ্ছিষ্ট মুরগির মাংসের লোভে হয়তো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরগুলো আমার পেছনে আসছে। কিন্তু এরপরেই দেখতে পেলাম, কয়েকজন অফিসার আমার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছেন। কিছুক্ষণের জন্য তাঁরা আড়ালে চলে গেল। একটু পর ফিরে এসে আমাকে আটক করে নিয়ে গেল। আমার ব্যাগও পাইনি। আমি বারবার তাঁদের বলছিলাম, আমি শতভাগ নিশ্চিত ব্যাগে কোনো মাদক নেই। কেবল তিন বোতল মধু আছে। কিন্তু তাঁরা আমার কোনো কথাই শোনেননি।’

প্রতি বছর জ্যামাইকা থেকে কেন মধু নিয়ে আসেন, সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন হটন। চিনি খাওয়া ছেড়ে দিলেও চায়ে মধু মিশিয়ে খেতে পছন্দ করেন তিনি। সে কারণে জ্যামাইকার একটি খামার থেকে প্রতি বছরই বিশেষ ধরনের মধু নিয়ে আসতেন তিনি। দামে সস্তা এবং মান ভালো বলে তাঁর বন্ধুরাও তাঁকে জ্যামাইকা থেকে মধু এনে দেওয়ার অনুরোধ করতেন।

শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন হটন, কারাগার থেকে মুক্তিও পেয়েছেন। কিন্তু এর আগে ৮২ দিন হাজতবন্দী অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। যে দুটি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, কারাবন্দী থাকায় সেই কাজও হারাতে হয়েছে তাঁকে।

বিনা দোষে কারাবাসে নিজের ক্ষোভ লুকাতে পারেননি হটন। ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ‘তারা আমার জীবন তছনছ করে দিয়েছে। আমি চাই পুরো বিশ্ব জানুক, কাউকে এভাবে হেনস্তা করা ঠিক নয়। যদি আমার কয়েকজন প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে আলাপ না থাকত, আমাকে হয়তো সারা জীবন জেলেই থাকতে হতো। আপনি এই সিস্টেমের মধ্যে পড়ে চিরতরে হারিয়ে যাবেন।’

অথচ আটকের সপ্তাহ তিনেক পরেই মুক্তি পেতে পারতেন হটন। বিমানবন্দরে আটক হওয়ার ২০ দিনের মাথায় মাদক সন্দেহে আটক মধুর বোতলগুলোকে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা যায়, বোতলগুলোতে কোনো মাদকের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু তারপরেও ৪৫ বছর বয়সী হটনকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরেও প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকতে হয় তাঁকে।

হটনের বান্ধবী ক্যারি ফিলিপস বলেছেন, সফর শেষে নির্ধারিত সময়ে হটন যুক্তরাষ্ট্রে না ফেরায় তিনি ভেবেছিলেন, হটন হয়তো ফিরতে দেরি করছেন। কিন্তু পরে যখন পুলিশ ফোন করে জানাল হটনকে আটক করেছে পুলিশ, বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। ফিলিপস বলেছেন, ‘হটনকে আটকের কথা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। আমার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছিল এটি। কেউ অপরাধ করলে তাঁকে অবশ্যই আটক করতে হবে। কিন্তু যে নির্দোষ, এভাবে তাঁর সময় নষ্ট করার অধিকার কারও নেই।’

অযথা এভাবে হেনস্তা হতে হওয়ায় ভবিষ্যতে আর স্বাভাবিকভাবে ভ্রমণ করতে পারবেন কি না, সেটি নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন হটন। তিনি বলেছেন, ‘আমার এখন ভ্রমণ করতেও ভয় লাগে। কারণ দিন শেষে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও আপনাকে কারাভোগ করতে হতে পারে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.