মঞ্চেই যেন মৃত্যু হয়: আবুল হায়াত

0
700
পঞ্চসপ্ততিতে আবুল হায়াত উদ্‌যাপন পর্ষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘সার্থক জনম তোমার হে শিল্পী সুনিপুণ’ শিরোনামে স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

১৯৪৭ সালের কথা। মুর্শিদাবাদের একটি গ্রামের আলপথ। দুপাশে ধানখেত। কয়েকটি পালকিতে চড়ে যাচ্ছেন একটি পরিবারের সদস্যরা। তারপর ট্রেনে চেপে তাঁরা চলে আসেন এই বাংলায়, চট্টগ্রামে। সংস্কৃতিমনা বাবার সান্নিধ্যে রবির নাটক গেঁথে যায় মনে। মঞ্চে অমলেন্দু বিশ্বাসের নাটক দেখে ঠিক করেন, এটাই করবেন। তা-ই করলেন সারা জীবন। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম মঞ্চে ওঠেন। ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে নাটকেই ঢেলে দিয়েছিলেন মনপ্রাণ, তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে অভিনয়।

গতকাল রোববার রাতে দেশভাগের সময়ে বাংলাদেশে আসা এবং অভিনয়ে স্থায়ী হওয়ার গল্পটি বলতে বলতে আবুল হায়াতের কণ্ঠ যেন চেপে আসছিল। তিনি জানালেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অভিনয় করতে চান। তাঁর ইচ্ছা, মঞ্চেই যেন তাঁর মৃত্যু হয়। আর তাঁর স্বজনেরা তাঁকে মঞ্চে ফিরে আসার আহ্বান জানান। মেয়ে বিপাশা হায়াত বাবাকে নিয়ে লেখা পড়তে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হন।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত, নৃত্যকলা ও আবৃত্তি ভবনের মিলনায়তনে অনুভূতি জানিয়ে বক্তৃতা দেন আবুল হায়াত।

কীর্তিমান অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকর আবুল হায়াত ৭ সেপ্টেম্বর তাঁর সফল, সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় জীবনের ৭৫ বছর পূর্ণ করেছেন। তাঁকে নিয়ে লেখা বই ‘সার্থক জনম তোমার হে শিল্পী সুনিপুণ’-এর মোড়ক উন্মোচন হলো গতকাল সন্ধ্যায়। রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত, নৃত্যকলা ও আবৃত্তি ভবনের মিলনায়তনে আবুল হায়াতের ‘পঞ্চসপ্ততি’র আয়োজন করেন তাঁর সহ ও অনুজ অভিনয়শিল্পীরা। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হলেও শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনদের নিখাদ শ্রদ্ধা ও হৃদয়ের নিবিড় প্রীতিতে উষ্ণ জয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে দেখানো হয় আবুল হায়াত অভিনীত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘গিন্নি’। তার আগে মঞ্চে এসে প্রিয়জনদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন তিনি। প্রতিক্রিয়ার শুরুতে নিজেই একটি দৃশ্যকল্পের বর্ণনা দেন। সে দৃশ্যকল্পে দর্শক জানতে পারে দেশভাগের সময় মা- বাবার সঙ্গে জন্মস্থান মুর্শিদাবাদ ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসার গল্প। সংগীতানুরাগী বাবা আবদুস সালাম ছিলেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক। স্কুলজীবন কেটেছে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট ও রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে অমলেন্দু বিশ্বাসের নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। কী দাপিয়ে বেড়াতেন মঞ্চে! সেই পোকা মাথায় ঢুকে গেল, আমি তো অভিনয় করব। সে পোকা মাথায় আছে আজ অবধি। আজও রাক্ষসের মতো বংশবৃদ্ধি করে চলেছে।’

বিপাশা হায়াত বাবাকে নিয়ে লেখা পড়তে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হন।

লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ১৯৬২ সালে বুয়েটে ভর্তি হন। বুয়েটে পড়ার সময় শেরেবাংলা হলে থাকতেন। এরপর বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ১৯৬৭ সালে পাস করে ১৯৬৮ সালেই ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। বুয়েটে পুরকৌশলে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে ওয়াসা, পরে আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শক হিসেবে তিনি লিবিয়া ও লাউসে দীর্ঘদিন কাজ করেন।

আবুল হায়াত জানান, বিদেশের উচ্চাভিলাষী জীবন তাঁকে টানেনি। অর্থকড়ির মোহ ভুলে তিনি নাটকের টানে চলে আসেন বাংলাদেশে। তাঁর ভাষায়, ‘লিবিয়ার ডলার আমাকে ধরে রাখতে পারেনি। ওয়াসায় থাকলে চেয়ারম্যান বা সচিব হয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু ওসব তো আমার ধাতে নাই।’ তিনি বলেন, ‘আমাকে প্রশ্ন করেন অনেকে, “আপনি তো ইঞ্জিনিয়ার, অভিনেতা হলেন কেমন করে?” আমি উল্টো বলি, ভাই প্রশ্নটা ভুল করলেন। বলেন, আমি অভিনেতা, ইঞ্জিনিয়ার হলাম কেমন করে?’

শুভেচ্ছা জানাতে এসে সহ-অভিনেত্রী দিলারা জামানের সঙ্গে এক মুহূর্তের নৃত্য পরিবেশনা।

অনুষ্ঠানে অন্য বক্তারা সবাই আবুল হায়াতের সাবলীল অভিনয়ের প্রশংসা করেন। এ নিয়েও মজার অভিজ্ঞতা আছে। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় একটা নাটকে অভিনয় করলেন। সে নাটকে জামালউদ্দিন হোসেনও অভিনয় করেছিলেন। নাটক শেষে সবাই খুব প্রশংসা করলেন জামালউদ্দিন হোসেনের। আবুল হায়াতের বিষয়ে বললেন, ‘তুমি তো অভিনয় করেছ মনেই হয়নি।’ তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল। পরে ভুল ভাঙে। বুয়েটের শিক্ষাজীবন শেষ দিকে। তখন জিয়া হায়দার গ্রুপ থিয়েটার করবেন বলে জানান। তাঁর সঙ্গে থেকে তিনি অভিনয়ের ব্যাকরণ, খুঁটিনাটি নানা বিষয় জানলেন। রুশ পরিচালক, অভিনেতা, নাট্যতাত্ত্বিক সেরগেয়েভিচ স্তানিস্লাভস্কির সঙ্গে মিলিয়ে জিয়া হায়দার শিখিয়েছেন, টু অ্যাক্ট ইজ নট টু অ্যাক্ট, বাট টু রিঅ্যাক্ট। আবুল হায়াতকে এর আগে এমন করে কেউ বলেননি। সেদিন জানলাম, ‘আমাকে ধরে রাখার কেউ নাই। আমি অভিনয় করব।’

ডলি জহুর পরামর্শ দিলেন, ‘শরীরে প্রতি যত্ন নিন, অবসর কাটান।

আবুল হায়াত বলেন, ‘জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয় করে যেতে চাই। আমি চাই মঞ্চেই আমার মরণ হোক। আমি কখনো অভিনয় ছাড়ব না, নাটক থেকে দূরে যাব না। এখান থেকে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ আমাকে সরাতে পারবে না।’

জানালেন, তাঁরা বাবা ছিলেন সংস্কৃতিমনা, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মিল রেখে বাবা তাঁকে ‘রবি’ নামে ডাকতেন। বাবা ছিলেন সব্যসাচী। ভালো ছবি আঁকতে পারতেন। কাগজ থেকে ছবি বানাতে পারতেন। ছেলের প্রথম নাটক দেখে বাবা বলেছিলেন, তাঁর নাকি মনে হয়নি আবুল হায়াত অভিনয় করেছেন।

ইনামুল হক জানালেন, আবুল হায়াতের কাছে অভিনয় শিখেছেন।

বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় স্ত্রী মাহফুজা খাতুন শিরিনের পাশাপাশি এ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তাঁর দুই মেয়ে বিপাশা হায়াত ও নাতাশা হায়াত। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে এসেছিলেন দুই জামাতা তৌকীর আহমেদ ও শাহেদ শরীফ খান। মেয়ে নাতাশা হায়াতকে নিয়ে আবুল হায়াত বলেন, ‘আমি আমার অভিনয় আমার মেয়েদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার ছোট মেয়ে নাতাশা খুব ভালো অভিনেত্রী। কিন্তু সে তার অস্থিরতা ও নিজস্ব ধ্যানধারণার কারণে অভিনয় করল না। নাতি-নাতনিরা এখন এ পথে আসবে কি না, জানি না।’

আবুল হায়াতকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেন আতাউর রহমান, মামুনুর রশীদ, দিলারা জামান, ডলি জহুর, জাহিদ হাসান, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, খায়রুল আলম সবুজ, নওয়াজিশ আলী খান, অধ্যাপক আবদুস সেলিম, ইনামুল হক, মুনিরা ইউসুফ মেমী প্রমুখ।

আবুল হায়াতকে শুভেচ্ছা জানান সারা যাকের।

আতাউর রহমান বলেন, ‘আবুল হায়াত আট-দশজনের মতো অভিনয় করেন না, সহজিয়া অভিনয় তাঁর। বলতে দ্বিধা নেই, মঞ্চে এমনও হয়েছে যে তাঁর অভিনয় দেখে সংলাপ ভুলে গেছি। তিনি অভিনয়ের কাছে পুরোপুরি সমর্পিত। মামুনুর রশীদ আবুল হায়াতকে মঞ্চে ফিরে আসার অনুরোধ জানান।’

সারা যাকের বলেন, ‘তাঁর অভিনয়ের পরিমিতিবোধ দারুণ। কোনটা মঞ্চের, কোনটা টেলিভিশনের, চলচ্চিত্রের কিংবা কোনটা বিজ্ঞাপনের জন্য, তা খুব ভালো ভাবেই বোঝেন। আমাদের ব্যর্থতা আমরা তাঁকে মঞ্চে পাচ্ছি না।’

বুয়েটের সাবেক শিক্ষক ইনামুল হক বলেন, ‘আমি তাঁকে পড়ানোর সুযোগ পাইনি। কেননা আমি যখন বুয়েটে যোগ দিই, তখন তিনি শেষ বর্ষের ছাত্র। কিন্তু নাটকে আমি তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি।’

অনুষ্ঠানে গান শোনান ফারহীন খান জয়িতা।

দিলারা জামান জানালেন ‘গোপন কথা’। সব সময় শুটিং থেকে ফেরার সময় স্ত্রীর জন্য ফুল কিনতেন আবুল হায়াত। ডলি জহুর পরামর্শ দিলেন, ‘শরীরে প্রতি যত্ন নিন, অবসর কাটান।’

আবুল হায়াতের জন্মদিন উপলক্ষে পঞ্চসপ্ততিতে আবুল হায়াত উদ্‌যাপন পর্ষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘সার্থক জনম তোমার হে শিল্পী সুনিপুণ’ শিরোনামে একটি স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির লেখা নিয়ে বইটি সম্পাদনা করেছেন জিয়াউল হাসান। প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিপাশা হায়াত। অনুষ্ঠানে বাবাকে নিয়ে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করেন বিপাশা হায়াত।

নিমা রহমান ও আহসান হাবিব নাসিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে গান শোনান ফারহীন খান জয়িতা, নৃত্য পরিবেশন করেন নওমি কামরুন বিধু।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.