ভেনেজুয়েলায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ চান ট্রাম্প, তেল কোম্পানিগুলো সতর্ক

0
24
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো, ফাইল ছবি: এএফপি

তেল কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা ট্রাম্পের প্রস্তাবে তেমন একটা সাড়া দিলেন না। গতকাল শুক্রবার মার্কিন তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ট্রাম্পের সেই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তাঁরা বললেন, ভেনেজুয়েলায় এখন বিনিয়োগ করার মতো পরিস্থিতি নেই।

গতকাল তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তেল কোম্পানিগুলো সেই আহ্বানে তেমন একটা সাড়া দেয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মার্কিন তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারাও জানেন, ভেনেজুয়েলা রীতিমতো তেলের ওপর বসে আছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুত এখন সে দেশে। ফলে সেখান থেকে তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা আছে।

কিন্তু তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে যথেষ্ট পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা বড় ধরনের বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেননি। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। এরপর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম আরও কমবে—হোয়াইট হাউসে গতকালের বৈঠকে এমন প্রত্যাশার কথা জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি লাভবান হবে।

তেল কোম্পানিগুলো সতর্ক

তবে বৈঠকে উপস্থিত তেল কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা সতর্ক অবস্থান নেন। এক্সনের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস বলেন, অতীতে ভেনেজুয়েলায় তাঁদের সম্পদ দুবার জব্দ করা হয়েছে। ফলে তৃতীয়বার সেখানে বিনিয়োগ করার আগে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ও বিদ্যমান বাস্তবতায় এটা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

উডসের ভাষ্য, এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলা বিনিয়োগের জন্য উপযোগী নয়। এক শতাব্দীরও বেশি আগে তেল আবিষ্কারের পর থেকেই আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক জটিল। অর্থাৎ তাদের মধ্যকার এই টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র শেভরনই ভেনেজুয়েলার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি স্পেনের রেপসোল ও ইতালির এনিসহ কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি এখনো সেখানে সক্রিয়। হোয়াইট হাউসের ওই বৈঠকে এসব কোম্পানির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

ট্রাম্প জানান, কোন কোন কোম্পানিকে ভেনেজুয়েলায় কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তাঁর প্রশাসন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে নয়; বরং সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রিতে যেসব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলোর কিছু অংশ শিথিল করার প্রক্রিয়া চলছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশটির দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁরা সমন্বয় করছেন। এই প্রশাসনের নেতৃত্বে আছেন মাদুরোর সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ।

একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের স্পষ্ট বার্তা, তেল বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখতে চান তারা, রদ্রিগেজ সরকারের ওপর চাপ ও প্রভাব বজায় রাখার কৌশল হিসেবেই এ ব্যবস্থা।

এদিকে সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অপরিশোধিত তেল বহনকারী কয়েকটি ট্যাংকার জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেলের বিক্রয়লব্ধ অর্থ যেন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন হিসাবে জমা হয়, বিক্রয়ের প্রক্রিয়া সেভাবে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা ব্যবসার জন্য প্রস্তুত।’

গত কয়েক দশকে বিনিয়োগের ঘাটতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করছে দেশটি। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহে দেশটির হিস্যা ১ শতাংশেরও কম।

মূল শঙ্কা নিরাপত্তা

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আভাস ও বিনিয়োগের আশ্বাসে ভেনেজুয়েলার তেল খাত নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে ঠিক, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে বড় তেল কোম্পানিগুলো এখনো সাবধানী। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনি ঝুঁকি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে তারা সম্ভাবনার কথা বলছে ঠিক; কিন্তু বড় অঙ্কের বিনিয়োগে যাওয়ার আগে বাস্তবতা যাচাইয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তারা।

ভেনেজুয়েলার মোট উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ করছে মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন। সেই তারাও পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক। বলেছে, এখন ভেনেজুয়েলায় তাদের যে কার্যক্রম, তার ভিত্তিতে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে এক্সন বলেছে, পরিস্থিতি মূল্যায়নে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা কারিগরি দল পাঠাতে চায়।

স্পেনের রেপসোল জানিয়েছে, যথাযথ পরিবেশ তৈরি হলে আগামী কয়েক বছরে ভেনেজুয়েলায় তাদের উৎপাদন তিন গুণ বাড়ানের সম্ভাবনা আছে। অন্যান্য কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাও বলেন, পরিবর্তনের যে আশ্বাস ট্রাম্প দিচ্ছেন, তাতে বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়ছে, তাঁরা এই সুযোগ কাজে লাগাতে চান।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব অর্থে উৎপাদন বাড়াতে হলে বড় ধরনের প্রচেষ্টা দরকার হবে।

জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গোল্ডউইন গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ দূত ডেভিড গোল্ডউইন বলেন, ‘তারা যতটা সম্ভব সহযোগিতামূলক আচরণ করছে, কিন্তু বাস্তব বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এখনই দিচ্ছে না।’
গোল্ডউইনের ভাষায়, নিরাপত্তা, আইনি নিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতামূলক করকাঠামো ছাড়া এক্সন বা শেলের মতো কোম্পানি হাজার হাজার কোটি ডলার তো দূরের কথা, কয়েক শ বিলিয়ন ডলারও বিনিয়োগ করবে না। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি খুব একটা ভালো নয় ঠিক, কিন্তু পরিবেশ এখনো যথাযথ নয়।
গোল্ডউইনের মতে, ছোট কোম্পানিগুলো আগামী এক বছরে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন কিছুটা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে, তবে সেসব বিনিয়োগের পরিমাণ সম্ভবত ৫ কোটি ডলারের আশপাশেই থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্প যে ‘অলৌকিক’ ১০০ বিলিয়ন ডলারের কথা বলেছেন, তার ধারেকাছেও নয়।

রিস্টাড এনার্জির হিসাব অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে উৎপাদন তিন গুণ করতে হলে প্রতিবছর ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন বা ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি ডলার নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

রিস্টাডের প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিম্বের্তি বলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়তে পারে, যদিও তা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।

গালিম্বর্তির মতে, শুধু ভর্তুকি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার শর্ত পূরণ হলেই কেবল এত পরিমাণ বিনিয়োগ সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে তাঁর সতর্কবার্তা, অদূরভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম কমে যাবে—এমন প্রত্যাশা মার্কিন জনগণের করা উচিত নয়।

গালিম্বের্তির ভাষায়, ‘পূর্ণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত কেউ বড় বিনিয়োগ করবে বা সে রকম প্রতিশ্রুতি দেবে, এমন সম্ভাবনা কম। আবার সেটা কবে হবে, তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না।’

বিবিসি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.