ভাইরাল হওয়া দৃশ্যটির কথা

0
257
সুবর্ণা মুস্তাফা ও হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত দ্বিতীয় জন নাটকের এ দৃশ্যটি ভাইরাল হয়েছিল

নাটকের ওই একটি দৃশ্য দেখলাম বহু বছর পর। ফেসবুকে ভাইরাল হলো হুমায়ুন ফরীদি আর সুবর্ণা মুস্তাফা অভিনীত নাটকটির ওই অংশটাই।

নাটকটির নাম দ্বিতীয় জন। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন। দৃশ্যটি নাটকের প্রথম দিককার। এরপর আরও অনেক ঘটনা ঘটবে, রহস্যময় ব্যাপার থাকবে, কিন্তু সে তো অন্য কথা।

সেই দৃশ্যটিতে হুমায়ুন ফরীদি যখন হাতে পুতুল নিয়ে এদিক–ওদিক ঘোরাচ্ছেন, তখনই মনে হলো, এবার আসবে সেই নির্মম সংলাপগুলো। যা কিছু গোপন ছিল, তা উন্মোচিত হবে আরেকটু পরেই। সুবর্ণা মুস্তাফা, মানে নাটকে ফরীদির স্ত্রী, পর্দার আড়াল থেকে ফরীদিকে দেখছিলেন। ফরীদি টের পাচ্ছিলেন তা। এরপর স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে সেই কথাগুলো বলে দিচ্ছিলেন, যা তিনি ধারণা করেন। দুজনই তখন সংলাপে সংলাপে খুলে ধরছেন নিজেদের। দৃশ্যের একেবারে শেষে ‘তুমি কি এখনো আমাকে ভালোবাস’ বলার পর স্ত্রীর ইতিবাচক উত্তরে আস্থা রাখতে পারেন না ফরীদি। নিজেকে ‘ভেজিটেবল’ বলে আক্ষেপ করেন, নিজেকে অর্ধমানব বলেন। আর হ্যাঁ, হুইলচেয়ারে দু হাত দিয়ে আঘাত করে ফরীদি যখন ‘আমি দশ বছর ধরে এই হুইলচেয়ারে বন্দী হয়ে আছি’ সংলাপটা বলেন, তখন পাল্টে যায় দর্শকের মনের অবস্থা। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, সংলাপের প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ এমন এক বেদনার জন্ম দেয়, প্রতি মুহূর্তের অভিব্যক্তি এমন এক সুচারু শৈল্পিক সৌকর্যকে মহান করে তোলে যে কয়েকটি শব্দই যেন পুরো নাটকের ঘ্রাণ নিয়ে হাজির হয় দর্শকের সামনে। সেই কবে দেখেছি নাটকটি, কিন্তু এখনো এই দৃশ্যটা জাজ্বল্যমান হয়ে রয়েছে মনে।

ফেসবুকে কোনো কিছু ‘ভাইরাল’ হয় তখনই, যখন তার সঙ্গে একটা আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়। রুচির প্রশ্নটা এখানে আনছি না এই কারণে যে, ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া অনেক কিছুই নৈতিকতার দৃষ্টিতে প্রকাশ হওয়ারই যোগ্য নয়। ইতিবাচক, শৈল্পিক কিছু ভাইরাল হওয়ার অর্থ হলো, বহু মানুষের আবেগের জায়গা প্রচণ্ডভাবে নাড়া খেয়েছে দৃশ্যটায়।

কেন এটা হলো, তার কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলে কত কিছুই না বলা যায়। তার কয়েকটি বিষয়ের কথা এখানে তুলে ধরছি। যাঁরা পড়ছেন, তাঁরা এর সঙ্গে যোগ করতে পারবেন আরও অনেক কারণ।

১. ১০ বছর গৃহবন্দী স্বামী ও তাঁর স্ত্রীর সংলাপগুলো। প্রতি মুহূর্তের দ্বন্দ্ব এবং তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা। সংলাপই আগ্রহী করে তোলে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য।

২. সাবলীল অভিনয়। দৃশ্যটায় একবারের জন্যও মনে হচ্ছিল না, ফরীদি বা সুবর্ণা অভিনয় করছেন। মনে হচ্ছিল সত্যিকারের স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে ঘটছে এ ঘটনা।

৩. কাহিনিটা। ঝিমুনিভাব থেকে একেবারে মুহূর্তের মধ্যে মনের তন্ত্রীগুলোকে টান টান করে দেয় এ কাহিনি।

৪. নয়নাভিরাম। যেভাবে ক্যামেরা ধরা হয়েছে, যেভাবে ক্যামেরার সামনে ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে, তাতে দর্শক জমে যায়। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

৫. সেকালে অভিনয়শিল্পীরা স্ক্রিপ্ট পেতেন অন্তত এক সপ্তাহ আগে। ভালো শিল্পীরা চরিত্রটি নিয়ে রীতিমতো গবেষণাই করতেন। তারপর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগেই ঢুকে যেতে পারতেন চরিত্রটির মধ্যে। তারই প্রতিফলন থাকত অভিনয়ে, তারই কারণে দর্শক বুঝতেই পারত না যাঁকে দেখা যাচ্ছে, তিনি অমুক শিল্পী নাকি অমুক চরিত্র।

আরও অনেক কিছুই বলা যায়। কিন্তু এখন আরও জরুরি একটা কথা না বললেই নয়। মৃত্যুর অল্প কয়েক দিন আগে অভিনয় প্রসঙ্গে হুমায়ুন ফরীদি আমাকে বলেছিলেন, এখনকার নাটক তাঁকে টানে না। নাটকের নামগুলোও হয় অরুচিকর। সেসব নাটক এড়িয়ে চলতেন ফরীদি।

তাঁর সম্পর্কে আরেকটি কথা, প্রচলিত ধারার নায়কের ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছিলেন ফরীদি। অভিনেতার জন্য অভিনয়ই যে প্রধান, চেহারা নয়, সেটা প্রমাণও করেছিলেন। জানিয়ে রাখি, বিটিভিতে নিখোঁজ সংবাদ নামে একটি নাটকে প্রযোজক আতিকুল হক চৌধুরী ফরীদিকে নিতে চেয়েছিলেন প্রধান চরিত্রে। স্ক্রিপ্ট দেখে ফরীদি বললেন, মূল চরিত্রে তিনি অভিনয় করবেন না। একটামাত্র দৃশ্যে যে বিপ্লবী ছেলেটা রয়েছে, তার চরিত্রেই অভিনয় করবেন তিনি। প্রযোজককে তিনি বাধ্য করেছিলেন সে চরিত্রটি ফরীদিকে দেওয়ার জন্য।

ফরীদির বলা কথাগুলো এখনো কতটা সত্য, তা দেখুন। প্রথম আলোর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তখনকার টিভি নাটকের পরিবেশ নিয়ে বলেছিলেন, ‘তিন ধরনের শিল্পী আছে পৃথিবীতে। ভালো শিল্পী, বিপদগ্রস্ত শিল্পী, অশিল্পী। বিপদগ্রস্ত শিল্পী সব সময় মনে করেন এই বুঝি আমি পড়ে গেলাম। এ কথা মনে করার দরকার নেই তো! চরিত্রটা ঠিকমতো করো। বেশি কাজ করার দরকার কী? মাসে ২০ দিন কাজ করলেই যথেষ্ট। আমাদের টিভি নাটকে এখন তাড়াহুড়া ঢুকে গেছে। এই তাড়াহুড়াটা বন্ধ করতে হবে। না হলে হঠাৎ করেই এরা পড়ে যাবে। একই ধরনের বৈচিত্র্যহীন অভিনয় করে যাবে। এখনকার শিল্পীরা ত্রস্ত। দৌড়াচ্ছে। এই দৌড়টা বন্ধ করে হেঁটে যাও। টাকার পেছনে না ছুটে ভালো অভিনয় করো। টাকা আপনিই আসবে। আগে শিল্পী হতে হবে তো!’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে