বিয়ের কথা বলে অনৈতিক সম্পর্ক

পল্টনের ওসির নারী কেলেঙ্কারি

0
236
পুলিশ

বিয়ের কথা বলে এক তরুণীর সঙ্গে প্রায় দেড় বছর ধরে শারীরিক সম্পর্ক করেছেন পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হক। একপর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন মেয়েটি। এর পরই বিয়ের জন্য চাপ দেন মাহমুদুল হককে। বিয়ে করবেন, তবে অনাগত সন্তানকে নষ্ট করতে হবে, এমন প্রস্তাব দেন তরুণীকে। বিয়ের স্বপ্নে প্রস্তাবে রাজি হয়ে মেয়েটি ওষুধের মাধ্যমে নষ্ট করে ফেলেন গর্ভের সন্তান।

কিন্তু দিন যায়, মাস যায়, বিয়ে আর করেন না পল্টন থানার ওই কর্তা। একপর্যায়ে তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। মাহমুদুলকে বিয়ের জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তরুণী। বিয়ের প্রলোভনে তার সঙ্গে ওসির অনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরে এবং বিচারের দাবিতে গত ১ আগস্ট পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন ওই তরুণী। তদন্তে মাহমুদুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে।

আইজিপির কাছে দেওয়া তরুণীর লিখিত অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ওসি মাহমুদুলের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। মেয়েটির বাড়িও উত্তরবঙ্গে। প্রথমে চাকরির কথা বলে তাকে ঢাকায় ডাকেন তিনি। ছোট বোন পরিচয়ে পল্টনের হোটেল ক্যাপিটেলে ওঠান মেয়েটিকে। খাবারের সঙ্গে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন ওসি। এ নিয়ে মেয়েটির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। ওসি তাকে আশ্বস্ত করেন, তাকে ভালোবাসেন তিনি। স্ত্রী থাকলেও বিয়ে করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এর পর থেকে প্রায়ই ওই হোটেলের ৩১৫ ও ৫১৭ নম্বর কক্ষে নিয়ে লিপ্ত হয়েছেন শারীরিক সম্পর্কে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইজিপির কাছে তরুণীর দেওয়া অভিযোগটি তদন্ত করেন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের  অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোনালিসা বেগম। তদন্ত শেষ করে সম্প্রতি তিনি প্রতিবেদনটি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরে পাঠিয়েছেন। গত বুধবার ডিএমপি থেকে প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। দীর্ঘদিন তরুণীর সঙ্গে ওসি মাহমুদুলের অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কের তথ্য উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। পল্টনের হোটেল ক্যাপিটেলে নিয়ে একাধিক দিন তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক এবং তরুণীর সঙ্গে ওসির কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরারও প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

হোটেল ক্যাপিটেলের ৩১৫ এবং ৫১৭ নম্বর কক্ষ প্রায় প্রতি মাসে এক বা একাধিক দিন ওসি পল্টনের নামে বুকিং দেওয়ার তথ্যও মিলেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এর মধ্যে ৩১৫ নম্বর কক্ষটি ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বুকিং দেন। সেটি চেকআউট হয় ২২ সেপ্টেম্বর। একই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ৫১৭ নম্বর কক্ষটি বুক করেন এবং চেকআউট হয় ৩০ সেপ্টেম্বর। একই বছরের ৪ অক্টোবর ৫১৭ নম্বর কক্ষ বুক করেন। পরের দিনই সেটি চেকআউট করা হয়। এরপর ১৮ অক্টোবর ৩১৫ নম্বর কক্ষ বুক করেন এবং সেটি চেকআউট হয় ২২ অক্টোবর। ৬ ডিসেম্বর একই কক্ষ নেওয়া হয় এবং দু’দিন পর সেটি চেকআউট করা হয়। চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি নেওয়া হয় একই কক্ষ এবং ১২ জানুয়ারি চেকআউট করা হয়। আবার ৫১৭ নম্বর বুকিং নেওয়া হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। ২ মার্চ সেটি চেকআউট করা হয়। সর্বশেষ ১৪ মার্চ আবার ওই হোটেলের ৩১৫ নম্বর কক্ষ নেওয়া হয় ওসি পল্টনের নামে। ১৭ মার্চ চেকআউট করা হয় কক্ষটি।

অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোনালিসা বেগম বলেন, ‘ভুক্তভোগী তরুণী আইজিপির কাছে ওসি মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। সেটির তদন্ত করি আমি। অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন ডিএমপি সদর দপ্তরে পাঠিয়েছি।’

মাহমুদুল হক ২০০১ সালে এসআই পদে পুলিশে যোগদান করেন। চাকরি জীবনে একটি গুরুদণ্ড-ব্ল্যাক মার্ক এবং ২২টি লঘুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। ২০১৭ সালের ২ জুলাই পল্টন থানার ওসি হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ওসির স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে।

ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওসি মাহমুদুল হকের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় ওই তরুণীর। ম্যাসেঞ্জারে কথোপকথন শুরু হয়। একদিন হুট করে মাহমুদুল মেসেঞ্জারে জানান, তিনি নওগাঁয় গেছেন। দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তরুণীর কাছে। নওগাঁ শহরের একটি রেস্টুরেন্টে দু’জন দেখা করেন। সেটি ছিল ২০১৬ সালের ২১ অক্টোবর। এর পর থেকে মোবাইল ফোনে কথা হতো নিয়মিত।

স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা মেয়েটিকে জানাতেন ওসি। নানা ধরনের গিফট পাঠাতেন মেয়েটিকে। ক্রমে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় তাদের। মাহমুদুলকে নিজের জন্য একটি চাকরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি। এক সময় মেয়েটিকে জানানো হয়, তার জন্য ঢাকায় একটি চাকরি ঠিক করা হয়েছে। চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলে ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মেয়েটিকে ঢাকায় আসতে বলেন তিনি। পল্টন থানার অদূরে হোটেল ক্যাপিটেলের একটি কক্ষে তাকে তোলেন ওসি। হোটেল স্টাফদের কাছে মেয়েটিকে ছোট বোন পরিচয় দিয়েছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় হোটেল কক্ষে যান মাহমুদুল। তরুণী কিছু খেয়েছে কি-না জানতে চান।

এর পরই ইন্টারকমের মাধ্যমে স্যুপসহ বিভিন্ন খাবারের অর্ডার দেন। হোটেল স্টাফ খাবার দিয়ে যান। খেতে অনীহা প্রকাশ করলেও স্যুপ খেতে অনুরোধ করেন তিনি। একপর্যায়ে মেয়েটি সেটি খান এবং পরে ঘুম ঘুম ভাব আসে। এরপর ঘুম থেকে জেগে দেখেন রাত পৌনে ২টা এবং পাশেই মাহমুদুল হক শুয়ে আছেন। এরই মধ্যে মেয়েটি বুঝতে পারেন তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা হয়েছে। তখন মাহমুদুলকে তিনি বলেন, ‘ভাইয়া, একি করলেন! আপনাকে বড় ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করেছি। কেন সর্বনাশ করলেন?’ মাহমুদুল তাকে ভালোবাসে বলে জানান। একপর্যায়ে কক্ষ থেকে চলে যান। পরদিন সকালে আবার হোটেল কক্ষে গিয়ে মেয়েটিকে ভালোবাসেন সেটি বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেন। তরুণী হোটেল থেকে বেরিয়ে বাড়ি চলে যান।

তিনি জানান, বাড়ি যাওয়ার পরও মাহমুদুল তাকে ফোন দিতেন। কয়েকদিন ফোন না ধরলেও পরে কথা বলেন মেয়েটি। মাহমুদুল তাকে বিয়ে করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। একপর্যায়ে মেয়েটিও তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। এরপর একাধিকবার হোটেল ক্যাপিটেলে এনে মেয়েটির সঙ্গে ওসি মাহমুদুল শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন। এ ছাড়া দিনাজপুরে মামলার সাক্ষী দেওয়ার নামেও মেয়েটিকে দিনাজপুরে নিয়ে বিভিন্ন হোটেলে রেখে একই সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন একাধিক দিন। দু’জন কক্সবাজারে গেছেন ঘুরতে। অনৈতিক সম্পর্কের একাধিক ভিডিও ও স্থিরচিত্র রয়েছে বলে দাবি করেন মেয়েটি। তাদের দু’জনের সম্মতিতেই এসব চিত্র ভিডিও করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর পরীক্ষা করে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন বলে জানতে পারেন।

তখন তিনি হোটেল ক্যাপিটেলে ছিলেন। বিষয়টি মেসেঞ্জারে মাহমুদুলকে জানান। মাহমুদুল হোটেলে যান তার কাছে। মেয়েটি বিয়ের জন্য চাপ দেন তাকে। ওসি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেন, তবে গর্ভপাত করার প্রস্তাব দেন। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে রাজশাহী চলে যান মেয়েটি। একপর্যায়ে ওসির কথামতো এক রাতে গর্ভপাতের জন্য ওষুধ খান। এরপর সারারাত রক্তপাত হয়।

এ নিয়ে রাজশাহীর হাসপাতালে চিকিৎসাও নিতে হয় তাকে। বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ার একপর্যায়ে গত ২ এপ্রিল থেকে তরুণীর সঙ্গে মাহমুদুল যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। যোগাযোগ করতে না পেরে মেয়েটি পল্টন থানায় চলে আসেন। আবারও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে বুঝিয়ে রাজশাহী পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে মাহমুদুলের বাবাকে বিষয়টি জানান তরুণী। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। ১২ এপ্রিল ২০টি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে।

তরুণী বলেন, ‘বিয়ের কথা বলে দিনের পর দিন আমার সর্বনাশ করেছে ওসি মাহমুদুল হক। আমি তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু এখন আমাকে বিয়ে করতে চায় না। আমাদের সম্পর্কের কথা পরিবারের অনেকেই জেনে গেছে। আমি তাদের কাছে মুখ দেখাব কী করে! আমার একটাই দাবি- আমাকে তার বিয়ে করতে হবে। সে যেহেতু পুলিশ কর্মকর্তা, তাই তার জন্য যেন পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়, সেজন্য কোনো মামলা-মোকদ্দমায় যাইনি। আইজিপির কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছি, বিচারের প্রত্যাশায়।’ মাহমুদুল তাকে বিয়ে না করলে আদালতে মামলা করবেন বলে জানান তিনি।

ওসি মাহমুদুল হক অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি মিথ্যা অভিযোগ।’ এর বেশি কিছু বলবেন না বলে জানান তিনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে