বাবাকে হারানোর কয়েক ঘণ্টা পর মাঠে নেমে ফাইনালে তুললেন দেশকে

0
34
মেক্সিকো দলটাই আজ খেলেছে বাবা হারানোর শোক সয়েও ম্যাচ খেলতে নামা জোনাথনের (বাঁয়ে) জন্যছবি: টুইটার

আগামী সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে টানা দ্বিতীয় গোল্ডকাপ শিরোপার পথে তাদের বাধা যুক্তরাষ্ট্র।

বার্সেলোনার সমর্থকেরা জোনাথনকে অনেক ভালো চেনার কথা। তাঁর ভাইকেও। জোনাথন আর জিওভান্নি দস সান্তোস—দুই ভাই–ই যে বার্সেলোনার বড় আক্ষেপ হয়ে আছেন!

বার্সার আক্ষেপটা অবশ্য জিওভান্নিকে নিয়েই বেশি ছিল। দুই ভাই-ই বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমি থেকে বেড়ে উঠেছেন, মূল দলেও খেলেছেন। এর মধ্যে বড় ভাই জিওভান্নির চেহারায় খানিকটা মিল ছিল এই শতকে বার্সার ভাগ্য ফেরানোর সূচনা করে দেওয়া ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদিনিওর সঙ্গে, খেলার ধরনে মিল ছিল বার্সার ইতিহাসের সেরা লিওনেল মেসির সঙ্গে।

জিওভান্নি (ডানে) ও জোনাথন দস সান্তোস

জিওভান্নি (ডানে) ও জোনাথন দস সান্তোস 
ছবি: টুইটার

কিন্তু জিওভান্নি কারও মতোই হতে পারেননি। বার্সায় সাকল্যে খেলেছেন এক মৌসুম, ২০০৭-০৮। তাতে খেলেছেন ২৮ ম্যাচ, ফরোয়ার্ড হলেও গোল করেছেন মাত্র ৩টি।

তাঁর চেয়ে এক বছরের ছোট জোনাথন তো সে তুলনায় আরও নস্যি। ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বার্সেলোনায় ছিলেন বটে, কিন্তু জাভি-ইনিয়েস্তা-বুসকেতসদের টপকে বার্সার মাঝমাঠে খেলার সাধ্য ছিল না এই মিডফিল্ডারের। পাঁচ বছরে তাই খেলতে পেরেছেন মাত্র ১৪ ম্যাচ!

জিওভান্নি বার্সেলোনা ছেড়ে টটেনহাম, ভিয়ারিয়াল হয়ে এলএ গ্যালাক্সিতে খেলেছেন। ২০১৯ সাল থেকে এই মৌসুম পর্যন্ত খেলেছেন মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকায়। জোনাথনও বড় ভাইয়ের পথের অনেকটাই পাড়ি দিয়েছেন। বার্সা ছেড়ে তিনি গেছেন ভিয়ারিয়ালে, সেখান থেকে ২০১৭ সালে গেছেন এলএ গ্যালাক্সি। এখনো সেখানেই খেলছেন ৩১ বছর বয়সী জোনাথন।

মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকার জার্সিতে জিজিনিও

মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকার জার্সিতে জিজিনিও
ছবি: টুইটার

ফুটবলটা অবশ্য বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন দুই ভাই। তাঁদের বাবা জিজিনিও যে মেক্সিকোর ফুটবলে চেনা নাম! ব্রাজিলে জন্ম হলেও ১৯৮০ সালে ক্লাব আমেরিকার হয়ে মেক্সিকোর লিগেই পেশাদার অভিষেক হয়েছিল জিজিনিওর। খেলতেন মাঝমাঠে। আমেরিকা থেকে মেক্সিকোরই ক্লাব লিওন, নেকাক্সা ও মন্তেরেইতে খেলেছেন। মেক্সিকোর লিগে খেলেই ১৯৯১ সালে অবসর তাঁর, মাঝে এক বছর (১৯৮৬-৮৭) খেলেছিলেন এল সালভাদরের ক্লাব এফএএসে।

ফুটবলীয় দক্ষতায়, সাফল্যে বাবাকে ছাপিয়ে গেছেন দুই ভাই জোনাথন ও জিওভান্নি। জিজিনিওর কখনো মেক্সিকোর জার্সিতে খেলা হয়নি। সেখানে মেক্সিকোর জার্সিতে জিওভান্নি ম্যাচ খেলেছেন ১০৯টি, ২০১২ অলিম্পিকে সোনাজয়ী মেক্সিকো দলেরও অংশ ছিলেন, গোল্ডকাপ জিতেছেন তিনবার। জোনাথন অবশ্য অলিম্পিকের দলে ছিলেন না, তবে দুবার গোল্ডকাপ জিতেছেন।

এবার তৃতীয় গোল্ডকাপও জিতবেন? জিতলে অন্যলোকে থেকেও হয়তো জোনাথনের উদ্‌যাপনে সবচেয়ে খুশি হবেন বাবা জিজিনিও। আগামী সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ফাইনালে জোনাথনও কি বাবার জন্য ঝাঁপাবেন না? আজ সেমিফাইনালে তো তা-ই করলেন!

আর্জেন্টিনার সাবেক ও বর্তমান মেক্সিকোর কোচ জেরার্দো মার্তিনো আজ ম্যাচের পর বলছিলেন জোনাথনের মানসিক শক্তির কথা, ‘জোনার (জোনাথন) ক্ষেত্রে যা হলো, প্রথমে খবরটা শুনেই সবাই খুব কষ্ট পাচ্ছিল। এরপর মাথায় এল যে জোনাথন খবরটা পেলে ওকে কীভাবে মানসিক শক্তি জোগাব! শুধু ও-ই জানে এই নির্মম মুহূর্তে ওর কেমন লাগছে।’

এমন অবস্থায়ও জোনাথন খেলার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিয়েছেন, সেটি জানিয়েছেন মার্তিনো, ‘মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর ও খেলার সিদ্ধান্ত নিল। কারণ, ওদের দুজনের কথা হচ্ছে, জিজিনিও চাইতেন যে জোনাথন যেন খেলে। ও যে সিদ্ধান্তই নিত না কেন, আমাদের সবার সমর্থন তাতে থাকত। এটা ওই দিনগুলোর একটি, যেদিন আপনার আবার এই অনুভূতি হবে যে ফুটবলই দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়, পরিবার সবার আগে।’

জোনাথন দস সান্তোস

জোনাথন দস সান্তোস 
রয়টার্স ফাইল ছবি

মেক্সিকো দলও একটা পরিবার হয়েই জোনাথনের শোকে সঙ্গী হয়েছে। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে অরবেলিন পিনেদার গোলে এগিয়ে যায় মেক্সিকো, গোলের পর পুরো দল দস সান্তোসকে ঘিরে রেখে আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখায়।

৫৭ মিনিটে কানাডাকে সমতায় ফেরান তাহোন বুকানন, এরপর দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের নবম মিনিটে এক্তর এরেরার গোলে নাটকীয়ভাবে জিতে যায় মেক্সিকো। সেই এরেরা ম্যাচ শেষে শ্রদ্ধা জানালেন জোনাথন-জিওভান্নির বাবা জিজিনিওকে, ‘প্রার্থনা করি, তিনি দারুণ শান্তিতে থাকুন, পরিবারটা শক্ত থাকুক। এখান থেকে আমরা হৃদয়ের গভীর থেকে আমাদের সমবেদনা জানাই।’

আগামী সোমবার ফাইনালে মেক্সিকোর প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র আজ প্রথম সেমিফাইনালে ‘অতিথি’ কাতারকে হারিয়েছে ১-০ গোলে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে