বাংলাদেশের জার্সির স্বপ্ন দেখেন যুক্তরাষ্ট্রের এই ফুটবলার

0
148
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সঞ্জয় সরদার সান্দুল করিম। ছবি: সঞ্জয়ের ফেসবুক থেকে নেওয়া

লাজুক ও মায়াবী একটা মুখ। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বলতে দীর্ঘদেহী যে ব্যাপারটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, প্রথম দর্শনে তাঁকে দেখে একদমই সে রকম মনে হবে না। মাঝারি আকৃতির শরীরে অনুশীলনের ট্র্যাকে ফাঁকে পুরো সময়ে মজার ছলে সতীর্থদের জমিয়ে রাখছেন। পেছন থেকে এসে কখন কারও পা থেকে বল কেড়ে নিচ্ছেন, কখনো কারও মাথার চুল বিলিয়ে দিচ্ছেন। যেন আপন করে নিতে চাইছেন সবাইকে। শুধু খেলোয়াড় নয়, এই বাংলাদেশটাকেই আপন করে নেওয়ার মিশনে নেমেছেন সঞ্জয় সরদার সান্দুল করিম।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সঞ্জয় জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও শেকড়ের টানে ফিরে এসেছেন বাংলাদেশে। দুই মাস আগে আবেদন করে পেয়ে গেছেন নাগরিকত্বও। এবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে পুলিশ দলের হয়ে খেলতে দেখা যাবে ২২ বছর বয়সী এই উইঙ্গারকে। স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার। নামের পাশে ভারী খেলোয়াড়ি বৃত্তান্ত নেই। কলেজ দলের হয়ে খেলেছেন সেমি পেশাদার পর্যায়ে। তবে ঘরোয়া ফুটবলে বাংলাদেশ পুলিশ ক্লাবের হয়ে খেলার যোগ্যতা রাখেন বলেই তাঁর নাম নিবন্ধিত করেছেন পুলিশের সাইপ্রাসের কোচ নিকোলা ভিটরোবিচ।

সঞ্জয়ের বাবা এনায়েত করিমের দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে বসত গড়েছেন আমেরিকায়। সঞ্জয়ের মা আমেরিকান। বাবার সঙ্গে ১০ বছর আগে বাংলাদেশে প্রথমবার এসেছিলেন। ১২ বছর পরে এবার দ্বিতীয় যাত্রায় বাংলাদেশে এসে একেবারে নাগরিকত্ব নিয়ে শুরু করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ জয়ের মিশন। ফুটবলে ভালো পারফরম্যান্স করে জায়গা করে নিতে চান জাতীয় দলেও।

এর আগে শুনে নেওয়া যাক বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার গল্প। গতকাল আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন মাঠে দাঁড়িয়ে শোনালেন সেটা, ‘১২ বছর আগে প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলাম। এবার দ্বিতীয়বারের মতো আসা। বলতে পারেন আর ফিরতে চাই না। এখানে থাকলে মনে হয় পরিবারের সঙ্গেই তো আছি। আমার দাদা ও দাদিকে ভীষণ ভালোবাসি। তাদের মুখে গল্প শুনেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। বাবাও আমাকে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। বাংলাদেশে অনেক সমস্যা আছে। আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক খারাপ কিছুই শুনেছি। তবু আমি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য খুবই আগ্রহী ছিলাম। কারণ, বাংলাদেশ আমার বাবা, দাদা ও দাদির দেশ।’

একজন আমেরিকান পাসপোর্টধারীর কাছে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার গর্ব কেমন হতে পারে, তা সঞ্জয়কে না দেখলে বোঝার উপায় ছিল না। এখন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে তোলাই তাঁর স্বপ্ন, ‘মনে হচ্ছে বাংলাদেশে এসে আমার শক্তি বেড়ে গেছে। সুযোগ পেলেই দাদির বাসায় যাচ্ছি। মানুষগুলো আমাকে খুব ভালোবাসে। খুব আনন্দ পাচ্ছি। এখানে আসার আগেও নিয়মিত বাংলাদেশের খেলা দেখতাম। বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারলে দারুণ হবে। এখন এটাই আমার স্বপ্ন। পুলিশ দলের হয়ে খেলেই জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে চাই।

বাংলাদেশের বর্তমান অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া ডেনমার্ক থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। জামালের মতোই প্রবাসজীবন থেকে দেশের ফুটবলে আগমন ঘটেছে সঞ্জয়ের। একই সময়ে এসেছেন ফিনল্যান্ডপ্রবাসী ফুটবলার কাজী তারিক রায়হানও। জামাল যেন বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের সামনে খুলে দিয়েছেন জাতীয় দলের দরজা। জাতীয় দলের অধিনায়ক এখন তারিক, সঞ্জয়দের অনুপ্রেরণা। তাই তো জামালকে উদাহরণ টেনে দৃঢ় কণ্ঠে সঞ্জয় বলতে পারেন, ‘জামালও কিন্তু আমার মতো এভাবেই বাংলাদেশে এসেছিলেন। দেখুন, এখন তিনি বাংলাদেশের অধিনায়ক। এই দেশের প্রতি তিনি তাঁর ভালোবাসা দিয়েই তা অর্জন করে নিয়েছেন। আমিও সে রকম কিছু করে দেখাতে চাই।’

সঞ্জয়কে নিয়ে পুলিশের সাইপ্রাসের কোচ নিকোলা এখনই বড় কোনো স্বপ্ন দেখাতে চান না। তবে তাঁর মধ্যে সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়েছে ইউরোপিয়ান এই কোচের, ‘সঞ্জয় এখনই জাতীয় দলে খেলে ফেলবে, এটা বলছি না। ওকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে ওর মধ্যে সম্ভাবনা আছে। প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে।’

অনেক বছর বাদে ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আবার ফিরে এসেছে বাংলাদেশ পুলিশ। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ার লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে তারা। সে দলটির হয়ে বাংলাদেশ জয়ের মিশনে নেমেছেন ২২ বছরের এক তরুণ। স্বপ্ন পূরণে তাঁকে পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। সে পথ শেষ হবে কি না, তা দেখার জন্য ভবিষ্যতের অপেক্ষা। তবে বংশোদ্ভূত তরুণেরা বাংলাদেশের হাল ধরতে চান, এ জন্য একটা হাততালি তো তাঁদের প্রাপ্যই।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে